ঢাকা, বুধবার, ১২ কার্তিক ১৪২৭, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

জাতীয়

ভাঙন থামছে না তিস্তাপাড়ে 

খোরশেদ আলম সাগর, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৭৪৫ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০
ভাঙন থামছে না তিস্তাপাড়ে 

লালমনিরহাট: তীব্র ভাঙনে দিশেহারা লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ের মানুষ। গত চার দিনে তিস্তার পেটে বিলীন একটি গ্রামের শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি, ঈদগাঁ মাঠ ও ফসলি জমি।

হুমকির মুখে রয়েছে বিদ্যালয়সহ আরো নানান স্থাপনা।  

জানা গেছে, চলতি বছর জুন থেকে থেমে থেমে বন্যার কবলে পড়ে তিস্তা নদীর বাম তীরের লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলা। বন্যার পানি কমতে শুরু করলে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। আগস্টের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত বড় বন্যা না হলেও তিস্তার পানি প্রবাহ ওঠানামা করছে। পানি কমলে ভাঙন শুরু হয়। তিস্তার ভাঙনে বাম তীরে ৫টি উপজেলায় প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে প্রিয় বসতভিটা, ঈদগাঁ মাঠ, রাস্তা ঘাট, ব্রিজ, স্থাপনা ও ফসলি জমি। মাঝে মধ্যে ভাঙন তীব্র থেকে তীব্র আকার ধারণ করে। চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে প্রিয় বসতভিটা ও আসবাবপত্র। ঘরবাড়ি সরানোর মতো সুযোগও পাচ্ছে না কেউ কেউ।  

জেলার ৫টি উপজেলায় ভাঙন দেখা দিলেও কয়েকদিন ধরে তীব্র ভাঙনের মুখে পড়ে আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রাম। গত পাঁচ দিনে গ্রামটির শতাধিক বসতভিটা ও ঐতিহ্যবাহী আহলে হাদিস ঈদগাঁ মাঠ বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে গোবর্ধন ইসমাইল পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাঙন অব্যাহত থাকলে দুই একদিনের মধ্যে গ্রামটির একমাত্র বিদ্যালয়টিও ভেঙে যাবে বলে শঙ্কিত এলাকাবাসী।

দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যর্থ হলে শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ (ওয়াবদা বাঁধ) বিলীন হয়ে যেতে পারে। সিংঙ্গিমারী, পাসাইটারী গ্রামটি বিলীন হওয়ায় তিস্তা নদীর পানি এখন ধাক্কা দিচ্ছে ওয়াপদা বাঁধে। ফলে বাঁধটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ বাঁধটি বিলীন হলে শত শত একর জমি অনাবাদি হয়ে পড়বে। একইসঙ্গে ভাঙনের মুখে পড়বে কয়েক হাজার পরিবার ও সরকারি বেসরকারি বেশ কিছু স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান। তিস্তা নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় সামান্যতে বন্যা আর ভাঙনের মুখে পড়ে তিস্তাপাড়ের মানুষ। তাই তিস্তা নদী খনন করে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে নদীপাড়ের মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জরুরি বরাদ্দ থেকে জিও ব্যাগের পাইলিং বাঁধের কাজ করা হলেও তার মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে নদীপাড়ের মানুষদের। নদীর তীরে বোমা মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে জিও ব্যাগে ভরে নদীতে ফেলা হচ্ছে। সপ্তাহ না যেতেই সেই জিও ব্যাগ গড়িয়ে পড়ে বোমা মেশিনের গর্তে গিয়ে ভরাট হচ্ছে। একইসঙ্গে নদী পাড়ে বোমা মেশিন বসানোর কারণে নদী ভাঙনও বেড়েছে কয়েকগুণ। যেখানে বোমা মেশিন বসানো হচ্ছে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই স্থানে ভাঙন দেখা দিচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

..ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রামের আবু বক্কর ও মনসুর আলী বাংলানিউজকে বলেন, চোখের সামনেই সবকিছু ভেসে গেল। ঘরগুলো টিন খুলে সরানো সম্ভব হলেও অনেক আসবাবপত্র তিস্তায় ভেসে গেছে। টিন খুলে রাস্তায় রেখেছি। জমি নেই বাড়ি করার। কোথায় যাবো আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।  

একই এলাকার শাহ আলম, সোলেমান আলী গোলজার বাংলানিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শুনছি নদীর বাঁধ দেবে সরকার। সেই বাঁধ তো দূরের কথা নেতাদেরও দেখা যাচ্ছে না। হামরা নদীতে ভাসি যাচ্ছি মেম্বর, চেয়ারম্যান ও এমপি-মন্ত্রীদের দেখা নাই। আগে নদী ভাঙাদের টিন ও টাকা দিত। এবার সেই টিনও নাই। হামরা ত্রাণ চাই না, নদী খনন করে স্থায়ী বাঁধ চাই।  

বসতভিটা হারিয়ে শত শত পরিবার রাস্তার ধারে খোলা আকাশে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সরকারিভাবে তাদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা করা হয়নি। গত মাসে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বরাদ্দ চেয়ে তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত এসব পরিবারকে পুনর্বাসনের বরাদ্দ আসেনি। যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরাদ্দ এলে বিতরণ করা হবে বলে জেলা ত্রাণ শাখা নিশ্চিত করেছে।  

লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বাংলানিউজকে বলেন, জেলার ৫টি উপজেলায় ৭৫৯টি পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারকে পুনর্বাসন করতে টিন ও টাকা বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ এলে তা বিতরণ করা হবে। প্রতিনিয়তই নদীর পাড় ভাঙছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাও প্রতিদিন বাড়ছে বলে জানান তিনি।  

বাংলাদেশ সময়: ০৭৪৫ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০
আরএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa