ঢাকা, বুধবার, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ সফর ১৪৪২

জাতীয়

ধর্ষকের বিচার না হলে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত কিশোরীর

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০৫৪ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২০
ধর্ষকের বিচার না হলে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত কিশোরীর

শরীয়তপুর: ‘এক জানোয়ার আমার এতিম নাতিনের ইজ্জত কেড়ে নিয়েছে। মান ইজ্জত বিসর্জন দিয়ে বিচার পাওয়ার আশায় মামলা করেছি।

ধর্ষক জামিনে এসে মামলা তুলে নিতে আমাদের হুমকি দিচ্ছে। ক্ষমতা ও টাকার জোরে তারা নাকি মেডিকেল রিপোর্ট তাদের পক্ষে নিয়েছে। এলাকায় বলে বেড়াচ্ছে, এ মামলায় নাকি তার কিছুই হবে না। উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা দিবে এবং আমাদের এলাকাছাড়া করবে বলছে। এ ঘটনা এলাকায় সবার মধ্যে জানাজানি হয়ে গেছে। ইজ্জত সম্মান সব গেছে। এখন আমার নাতিনের ভবিষ্যত কী হবে? কে বিয়ে করবে আমার নাতিনরে? আমরা এর ন্যায় বিচার চাই। ধর্ষকের ফাঁসি চাই। আমরা অসহায় গরীব মানুষ। কে শুনবে আমাদের কথা?’

একবুক কষ্ট নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন শরীয়তপুরে ধর্ষণের শিকার এক কিশোরীর দাদী।

মামলা ও ভিকটিমের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শরীয়তপুর সদর উপজেলার ধানুকা এলাকার ইসহাক বেপারীর ছেলে ফার্নিচার ব্যবসায়ী আয়নাল বেপারী (২৪) ওই এলাকার লাভলী বেগম (৪৫) নামে এক নারীর সহায়তায় একই এলাকার ১৪ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে। লাভলী বেগমের বাড়ির পাশে আয়নালের ফার্নিচারের কারখানা থাকায় লাভলীর বাড়িতে আয়নালের যাতায়াত ছিল। এক সময় লাভলী বেগমের প্রতিবেশী ওই কিশোরীর প্রতি কুনজর পড়ে আয়নাল বেপারীর।  

খারাপ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য আয়নাল বেপারী লাভলী বেগমের মাধ্যমে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে ওই কিশোরীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। নাবালিকা ওই কিশোরী তাদের পাতানো ফাঁদে পড়ে যায়। গত ৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টার দিকে লাভলী বেগম ওই কিশোরীকে ডেকে তার ঘরে নিয়ে যায়। আয়নাল বেপারী আগে থেকেই লাভলীর ঘরে অবস্থান করছিল। ঘরে নিয়ে লাভলী বেগম ওই কিশোরীকে আয়নালের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করতে বলে। তাহলে নাকি সে ওদের বিয়ে পড়িয়ে দেবে। একথার পর আয়নাল বেপারী লাভলী বেগমের বসতঘরের একটি রুমে নিয়ে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করে।  

কিশোরী এ ঘটনা কাউকে না বলে নিজের মধ্যে গোপন রাখে। পরের দিন বিকেলে ওই কিশোরী ওষুধ কেনার জন্য এলাকার বাবুল ডাক্তারের বাড়ি যায়। ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে হবি সরদারের নির্মানাধীন ভবন বাড়ির নিকট পৌঁছালে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা আয়নাল বেপারী পিছন থেকে এসে কিশোরীর মুখ চেপে ওই ভবনের একটি ফাকা রুমে নিয়ে যায়। সেখানে আবারও ওই কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায় আয়নাল।  

কিশোরী সারারাত সেখানেই অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকে। পরদিন ভোরবেলা জ্ঞান ফিরে পেয়ে বাড়ি এসে ঘটনা দাদা-দাদীকে জানায়। ঘটনা শুনে ওইদিনই কিশোরীর দাদা বাদি হয়ে আয়নাল ও লাভলী বেগমকে আসামী করে পালং মডেল থানায় ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। মামলার একদিন পর আসামী আয়নালকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠায় পুলিশ। মামলা তদন্ত করে পুলিশ আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট দাখিল করে। কিছুদিন পূর্বে আসামি জামিনে ছাড়া পান। বর্তমানে মামলাটি জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।  

কিশোরী মেয়েটির পরিবারের কোন জায়গা, সম্পত্তি ও ঘরবাড়ি না থাকায় তারা ওই এলাকায় অন্যের পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ একটি কাঁচা টিনের ঘরে বসবাস করেন। মা মারা যাওয়ায় বাবা আরেকটি বিয়ে করে নিজের মতো করে সংসার করছেন। কিশোরী মেয়েটি তার দাদা-দাদীর কাছে থাকে। বৃদ্ধ দাদা রিক্সা চালিয়ে যা উপার্জন করেন তাই দিয়ে তাদের সংসার চলে।  

মামলার বাদি কিশোরীর দাদা বলেন, ‘মান ইজ্জতের কথা চিন্তা না করে ধর্ষকের বিচার চেয়ে মামলা করেছিলাম। ঘটনা এলাকার সবাই জানে। লজ্জায় সমাজে মুখ দেখাতে পারি না। ইজ্জত কেড়ে নিয়ে আমার নাতিনের এতো বড় সর্বনাশ করার পরেও আসামিরা আমাদের উল্টো হুমকি দিচ্ছে। ডাক্তারি পরীক্ষায় নাকি ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। তারা উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা দিবে বলছে। তাহলে আমরা কি এর বিচার পাব না? গরীব বলে কি আমাদের কোন ইজ্জত সম্মান নেই? আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই। ’

ঘটনার পর থেকে ধর্ষণের শিকার কিশোরী মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। সবসময় সে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হয় না এবং এলাকার কারো সাথে দেখা সাক্ষাত ও কথাবার্তা বলে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কিশোরী বলেন, ওই ঘটনার পর থেকে আমি মরে গেছি। সমাজে আমার কোন ইজ্জত সম্মান নাই। যে আমার ইজ্জত কেড়ে নিয়েছে আমি তার ফাঁসি চাই। ধর্ষকের বিচার না হলে আত্মহত্যা করা ছাড়া আমার কোন উপায় থাকবে না।

বাংলাদেশ সময়: ২০৫০, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২০
এমকেআর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa