bangla news

নুসরাত ট্র্যাজেডি: নৃশংস অগ্নিসন্ত্রাসের এক বছর

সোলায়মান হাজারী ডালিম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০২০-০৪-০৬ ৮:৪২:২৭ এএম
নুসরাতের কবর ইনসেটে নুসরাত। 

নুসরাতের কবর ইনসেটে নুসরাত। 

ফেনী: গেল বছরের (২০১৯) আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে এ ঘটনা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গত বছরের ৬ এপ্রিল নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাদে নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। একজন মানুষের শরীরের ৮০ শতাংশের বেশি পুড়ে যাওয়ার পরও বেঁচে থাকার যে কষ্ট তা সে সময় মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। সেই আলোচিত নৃশংস অগ্নিসন্ত্রাসের এক বছর আজ। একটি বছর পেরিয়ে গেলেও নুসরাতের পরিবারের কান্না এখনো থামেনি। শেষ হয়নি অপেক্ষার প্রহর, তারা চেয়ে আছে কবে দেখবে আসামিদের ফাঁসির কার্যকর। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছিলেন নুসরাতের মা শিরিন আখতার। ওইদিনই অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তার অনুগত কিছু সাবেক ও বর্তমান ছাত্র জনমত গঠন করে সিরাজকে জেল থেকে বের করে আনার জন্য।

তারা ৩ এপ্রিল সিরাজের সঙ্গে কারাগারে পরামর্শ করে এসে ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে খুন করার পরিকল্পনা নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ এপ্রিল নুসরাত মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে খুনিরা পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে নুসরাতকে হত্যার চেষ্টা চালায়। ঘটনাস্থল থেকে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় সেখান থেকে নুসরাতকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল মামলা দায়ের করেন। কয়েকদিন নির্মম যন্ত্রণা নিয়ে ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।

এই মামলায় ২৮ মে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর নির্ধারণ করেন। মামলাটিতে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক গ্রহণ করা হয়।

২৪ অক্টোবর রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে একলাখ টাকা করে জরিমানা দণ্ডেও দণ্ডিত করেন।

আসামিরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)।

২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার সব ধরনের কার্যক্রম হাইকোর্টে পৌঁছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলে মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য মামলার ধরে কার্যক্রম উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। সে অনুসারে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক (মামলার সব নথি) ছাপানো শেষ করা হয়েছিল। পরে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতি কাছে উপস্থাপন করা হয়। আপিল বিভাগ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য বেঞ্চ নির্ধারণ করেছেন প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি সৌমেন্দ্র সরকারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এ মামলার শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু জানান, আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলার পর খুব দ্রুত সময়ে পেপারবুক তৈরি হয়েছে। আশা করছি, করোনা পরিস্থিতির উত্তরণ ও সাধারণ ছুটি শেষ হলে হাইকোর্টের আপিল বিভাগের শুনানির কাজও শুরু হয়ে যাবে। মামলাটির নিষ্পত্তির বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে। আমরা আশা করছি, দ্রুত সময়ে বাকি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং সব আসামির ফাঁসি কার্যকর হবে।

মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, আমরা প্রথমে ধন্যবাদ জানাতে চাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি চেয়েছেন বলেই এত দ্রুত সময়ে আমারা নিম্ন আদালত থেকে সুবিচার পেয়েছি। আদালত সব আসামিকে ফাঁসি দিয়েছে। আমারা জানতে পেরেছি মামলাটি উচ্চ আদালত থেকে নিষ্পত্তির বিষয়েও সর্বোচ্ছ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আশা করি, সেখানেও আমরা সুবিচার পাবো, সব আসামির ফাঁসি কার্যকর হবে।

নোমান বলেন, আসামিদের ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দৃষ্টান্তস্থাপন হবে। আর কোনো ভাইয়ের-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয় সেজন্য আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। সর্বোপরি আদালত যে রায় দেয় আমরা তা মাথা পেতে নেবো।
নোমান বলেন, আসামিপক্ষের লোকজন আমাদের সরাসরি থ্রেট না দিলেও ‘বিভিন্ন পক্ষ থেকে আমরা শুনি- ‘পুলিশ কতদিন বাড়ি পাহারা দিয়ে রাখবে?’।

মেয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে নুসরাতের মা শিরিন আক্তারের চোখে পানি এসে যায়,

‘তিনি বলেন, মাইয়াগা (মেয়েটা) অ্যাঁর (আমার) বুকের ধন আছিলো (ছিলো), ঘর আলো করি রাইখতো (রাখতো)।

 নুসরাতের মা আরো বলেন, এক বছর হয়ে গেলেও এখনো দু’চোখ এক করলেই ভেসে ওঠে মেয়ের মুখখানি। ‘আমরা উচ্চ আদালতের দিকে চেয়ে আছি, আশা করছি উচ্চ আদালতও আসামিদের ফাঁসির রায় বহাল রাখবে। আমরা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিকেও সে দাবি জানাচ্ছি। 

নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান বলেন, তাদের বাড়িতে এখনো নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। দুই শিফটে সকালে তিনজন এবং রাতের বেলায় আরো তিনজন পুলিশ সদস্য তাদের বাড়ির সামনে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে।

সোনাগাজী প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ আবদুল হান্নান বলেন, ‘নুসরাত হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের লোকজন বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবার ও স্বজনদের হুমকি ধমকি দিয়ে আসছে। হত্যাকাণ্ডের পর সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিল লিটন এ মামলাটিতে তথাকথিত মামলা বলে গালি দিয়েছিল, বলেছিল আসামিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কাউন্সিল লিটন এখন আবার বেপোরোয়া হয়ে উঠেছেন যেসব সাংবাদিক নুসরাতের পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করেছেন তাদের হত্যার হুমকি দিয়ে আসছেন তিনি।

এদিকে এ মামলাটি নিয়ে বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ফেনীর সচেতন মহল।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ফেনী জেলা ইউনিটের সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব বলেন, কোনো হত্যাকাণ্ডই কাম্য নয়। তবে এই একটি হত্যাকাণ্ড যেটির বিচারের দাবিতে ফেনীর সর্বস্তরের মানুষ এক কাতারে এসেছিলো।

উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী ফাওজিয়া আবিদা বলেন, এ হত্যাকাণ্ডটি আমাদের ভীত করেছিল, আবার প্রতিবাদী হতেও উৎসাহিত করেছে এবং প্রতিবাদী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ০৮৩৯ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৬, ২০২০
এসএইচডি/এএটি

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন :   ফেনী
        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2020-04-06 08:42:27