ঢাকা, বুধবার, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

জাতীয়

দৃশ্যমান হলো পদ্মাসেতুর ৩৯০০ মিটার 

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৯৫৪ ঘণ্টা, মার্চ ১০, ২০২০
দৃশ্যমান হলো পদ্মাসেতুর ৩৯০০ মিটার 

 মুন্সিগঞ্জ পদ্মাসেতু এলাকা থেকে: শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে পদ্মাসেতুর ২৬তম স্প্যান ‘৫-ডি’ সেতুর ২৮ ও ২৯ নম্বর পিলারের উপর বসানোর মাধ্যমে দৃশ্যমান হলো ৩ হাজার ৯০০ মিটার (৩.৯ কিলোমিটার)। 

দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীদের চেষ্টায় সফলভাবেই স্প্যানটি বসানো সম্ভব হয়েছে। আর ১৫টি স্প্যান বসিয়ে ২.২৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান বাকি পদ্মাসেতুতে।

 

একের পর এক স্প্যান বসিয়ে এভাবেই স্বপ্নের পদ্মাসেতু নির্মাণ হচ্ছে। ২৫তম স্প্যান বসানোর ১৮ দিনের মাথায় ২৬ তম স্প্যানটি বসানো সম্ভব হলো। ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল থেকে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে যাওয়ার এ স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে আর ১৫টি স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকাল ৯টা ১৩ মিনিটে স্প্যান বসানো শেষ হয়। মূল সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আবদুল কাদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।  

এর আগে, সোমবার (৯ মার্চ) সকাল সাড়ে ৮টায় ধূসর রঙের ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের তিন হাজার ১৪০ টন ওজনের স্প্যানটিকে সকাল সাড়ে ৯টায় তিন হাজার ৬০০ টন ধারণক্ষমতার ‘তিয়ান ই’ ভাসমান ক্রেন বহন করে নিয়ে আসে।  

প্রকৌশল সূত্রে জানা যায়, ভাসমান ক্রেনটি নোঙর করে পজিশনিং করে ইঞ্চি ইঞ্চি মেপে স্প্যানটিকে তোলা হয় পিলারের উচ্চতায়। এরপর দুই পিলারের বেয়ারিংয়ের ওপর রাখা হয় স্প্যানটিকে। খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আগে থেকেই বিশেষজ্ঞ প্যানেল দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হয়।  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী জানিয়েছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চীনা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ অনুপস্থিত। যার প্রভাবে কাজের গতি স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ২৬ তম স্প্যানটি অল্প সময়ের মধ্যে বসানোর কথা থাকলেও এসবের কারণে বেশি সময় নিয়ে বসানো হলো। ইতোমধ্যে পদ্মাসেতুর ৪২টি পিলারের মধ্যে ৪০টি পিলারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি দুইটি পিলারের কাজ শেষ হবে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে। চীন থেকে আসা দুইটি স্প্যানসহ মোট ৩৯টি স্প্যান এখন মাওয়ায় আর বাকি দুইটি আসার অপেক্ষায়।  

জানা যায়, পদ্মাসেতুতে প্রথম স্প্যান ‘৭-এ’ ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারে বসে ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। স্প্যান ‘৭-বি’ সেতুর ৩৮ ও ৩৯ নম্বর পিলারে বসে ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি। স্প্যান ‘৭-সি’ সেতুর ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিলারে বসে ২০১৮ সালের ১১ মার্চ। স্প্যান ‘৭-ই’ সেতুর ৪০ ও ৪১ নম্বর পিলারে বসে ২০১৮ সালের ১৩ মে। স্প্যান ‘৭-এফ’ সেতুর ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারে বসে ২০১৮ সালের ২৯ জুন। স্প্যান ‘১-এফ’ সেতুর ৪ ও ৫ নম্বর পিলারে অস্থায়ীভাবে বসানো হয় ২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর। স্প্যান ‘৬-এফ’ সেতুর ৩৬ ও ৩৭ নম্বর পিলারে বসে ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি। স্প্যান ‘৬-ই’ সেতুর ৩৫ ও ৩৬ নম্বর পিলারে বসে ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। স্প্যান ‘৬-ডি’ সেতুর ৩৪ ও ৩৫ নম্বর পিলারে বসে ২০১৯ সালের ২২ মার্চ। স্প্যান ‘৩-এ’ সেতুর ১৩ ও ১৪ নম্বর পিলারে বসে ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল। স্প্যান ‘৬-সি’ সেতুর ৩৩ ও ৩৪ নম্বর পিলারে বসে ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল। স্প্যান ‘৩-বি’ সেতুর ১৪ ও ১৫ নম্বর পিলারে বসে ২০১৯ সালের ২৫ মে। স্প্যান ‘৩-সি’ সেতুর ১৫ ও ১৬ নম্বর পিলারে বসে ২০১৯ সালের ২৯ জুন। স্প্যান ‘৪-এফ’ সেতুর ২৪ ও ২৫ নম্বর পিলারে বসে ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। স্প্যান ‘৪-ই’ সেতুর ২৩ ও ২৪ নম্বর পিলারে বসে ২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর এবং স্প্যান ‘৩-ডি’ সেতুর ১৬ ও ১৭ নম্বর পিলারের উপর বসে ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর। ২৬ নভেম্বর সেতুর ২২ ও ২৩ নম্বর পিলারে বসে স্প্যান ‘৪-ডি’। ১১ ডিসেম্বর ‘৩-ই’ স্প্যান বসে সেতুর ১৭ ও ১৮ নম্বর পিলারের উপর। ১৮ ডিসেম্বর ২১ ও ২২ নম্বর পিলারে উপর বসে স্প্যান ‘৪-সি’। ৩১ ডিসেম্বর ১৮ ও ১৯ নম্বর পিলারে বসে স্প্যান ‘৩-এফ’। ২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি ‘৬-বি’ স্প্যান বসে ৩২ ও ৩৩ নম্বর পিলারের উপর। ২৩ জানুয়ারি মাওয়া প্রান্তে ৫ ও ৬ নম্বর পিলারে বসে 'ওয়ান-ই' স্প্যান। ২ ফেব্রুয়ারি জাজিরা প্রান্তে ৩১ ও ৩২ নম্বর পিলারে বসে '৬-এ' স্প্যান। ১১ ফেব্রুয়ারি জাজিরা প্রান্তে '৫-এফ' স্প্যান বসে সেতুর ৩০  ও ৩১ নম্বর পিলারে। ২১ ফেব্রুয়ারি জাজিরা প্রান্তে সেতুর ২৯ ও ৩০ নম্বর পিলারে '৫-ই' স্প্যান বসানো হয়।  

প্রকৌশলী সূত্র জানিয়েছে, সেতুর ৫, ৬, ৭, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১,৪২ নম্বর পিলারে বসেছে ২৫টি স্প্যান। স্প্যান বসানো বাকি পিলারগুলো হলো-১, ২, ৩, ৪, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ২০, ২৬, ২৭, ২৮ নম্বর।

পুরো সেতুতে ২ হাজার ৯৩১টি রোডওয়ে স্ল্যাব বসানো হবে। আর রেলওয়ে স্ল্যাব বসানো হবে ২ হাজার ৯৫৯টি। পদ্মাসেতুতে ৪২টি পিলারের ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান।  

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হচ্ছে এ সেতুর কাঠামো।  

সেতুতে কাজের গতি বাড়াতে রোবটের ব্যবহার: পদ্মাসেতুতে করোনার প্রভাব মোকাবিলায় রোবট এসেছে। চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিকদের একটি বড় অংশ পদ্মাসেতুর কাজের সঙ্গে যুক্ত৷ বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে সেতুতেও। সেতুর কাজে নিয়োজিত চীনাদের একটি বড় অংশ আটকা পড়েছে চীনে। সেতুর কাজের গতিকে স্বাভাবিক রাখতে সেতুতে যোগ হয়েছে রোবট। মুন্সিগঞ্জের মাওয়া কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে স্প্যানের টুকরো জোড়া দেওয়ার জন্য ওয়েল্ডিংয়ের কাজে ব্যবহার হচ্ছে ৬টি রোবট৷ এসব রোবট আনা হয়েছে চীন থেকে, দীর্ঘদিন ধরে ট্রায়ালে থাকার পর সম্প্রতি কাজ করছে পুরোদমে।  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী জানান, ১৫-২০ জন শ্রমিকের কাজ করতে পারে এসব রোবট। স্প্যানের টুকরো জোড়া দেওয়ার জন্য ওয়েল্ডিংয়ের কাজে এসব ব্যবহার হচ্ছে। কম সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। তবে আরো রোবট আনা হবে কিনা সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ সময়: ০৯৫২ ঘণ্টা, মার্চ ১০, ২০২০
আরএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa