bangla news

বিল পাসের সময় তীব্র বিরোধিতার মুখে অর্থমন্ত্রী

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০২০-০২-০৫ ৮:০২:২৪ পিএম
সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ফাইল ফটো

সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ফাইল ফটো

জাতীয় সংসদ ভবন থেকে: বিরোধী দল জাতীয় পার্টির তীব্র বিরোধিতা ও বিএনপির সদস্যদের (এমপি) ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে সংসদে ‘স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানশিয়াল কর্পোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাসমূহের তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান বিল-২০২০’ বিল পাস হয়েছে।

বুধবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিলটি পাসের জন্য অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উপস্থাপন করলে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। 

জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সদস্যরা বিলটি প্রত্যাহারের দাবিও জানান। সম্প্রতি সময়ে কোনো বিল পাসের সময় এ ধরনের তীব্র বিরোধিতা দেখা যায়নি। 

বিরোধিতাকারী সংসদ সদস্যরা এই বিলটিকে ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে বিলের উপর নিজেদের দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাবগুলোও প্রত্যাহার করে নেন।

পরে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিল পাসের আগে সংসদে উপস্থিত বিএনপির তিন এমপি অধিবেশন কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন। বিলের তীব্র বিরোধিতাকারী জাতীয় পার্টির সদস্যরা ওয়াকআউট না করলেও বিলটি কণ্ঠভোটে দিলে তারা না ভোট দেন। 

এ সময় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভোটে বিলটি পাস হয়। 

সংসদে এ বিল নিয়ে আলোচনার সময় জাতীয় পার্টির এমপি মুজিবুল হক চুন্নুসহ একাধিক সংসদ সদস্য অর্থমন্ত্রীকে ব্যবসায়ী বলে আখ্যায়িত করেন। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং নিজে বিশ্বের সেরা অর্থমন্ত্রীর খেতাব পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। 

বিলে বলা হয়েছে, এসব সংস্থা চালাতে যে খরচ হয় এবং নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরে যে অর্থ লাগে, তা তাদের নিজস্ব তহবিলে জমা রাখা হবে। এছাড়া আপদকালীন ব্যয় নির্বাহের জন্য পরিচালন ব্যয়ের আরও ২৫ শতাংশ অর্থ এসব সংস্থা সংরক্ষণ করতে পারবে। ওই সংস্থার কর্মীদের পেনশন বা প্রভিডেন্ড ফান্ডের অর্থও তারা সংরক্ষণ করবে।

বিলটি উত্থাপনের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত/আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, পাবলিক নন-ফাইন্যানশিয়াল কর্পোরেশনসহ অন্যান্য স্ব-শাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নিজস্ব আইন ও বিধি অনুযায়ী আয়-ব্যয় ও বছর শেষে তাদের হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। ব্যাংকে রক্ষিত হিসাবসমূহের স্থিতি হতে দেখা যায়, বর্ণিত প্রতিষ্ঠানসমূহের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমে আছে।

বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, অর্থমন্ত্রী শিক্ষিত লোক। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট আমরা জানি। উনার সময়ে পুঁজিবাজারে ১০ হাজার ইনডেক্স ওঠেছিল। যখন উনি পরিকল্পনামন্ত্রী, তখনই তিনি বলেছিলেন, ৪ হাজার হওয়ার কথা, কীভাবে ১০ হাজার হলো। 

‘উনি জানতেন না। ব্যাংকের মালিক সমিতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রী বসেন। কিভাবে হয় এটা? নিরঙ্কুশ সংখ্যগরিষ্ঠের ক্ষমতা দেখাবেন না। নিরঙ্কুশ সংখ্যগরিষ্ঠ অনেক দল অনেক দেশ ধ্বংস হয়ে গেছে।’

জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ী হলে যা হয় তাই হয়েছে। বাজেট করার সময় চিন্তা করে নাই? রাজস্ব ঘাটতি সম্পর্কে চিন্তা করে নাই? ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি। আগের বছরের চেয়ে ৪৫ ভাগ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছিলো। করেছে মাত্র ৭ শতাংশ। এনবিআরের ব্যর্থতার কারণে এই বিল সমর্থন করতে পারছি না। 

‘আমি একজন অ্যাডভোকেট। এটা বললে কী অপরাধ হবে? উনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। কিন্তু উনার মূল পরিচয় একজন ব্যবসায়ী। এটাতে আহত হওয়ার কারণ নেই। আমরা আশা করেছিলাম, সাকসেসফুল বিজনেসম্যান। অর্থনীতিতে ভালো করবেন। কতদূর ভালো করেছেন উনি চিন্তা করবেন। ব্যাংকের মালিক ডিরেক্টররা ঋণ নিয়ে বসে আছেন। এটা কী দেশ? টাকা পাচার হয় উনি ব্যবস্থা নেয় না। বিভিন্ন সংস্থার টাকা খরচ করছেন। আগামী বছর ট্যাক্স না পেলে কী করবেন? ২০১৭ সালে আমাকে বেস্ট লেবার মিনিস্টারের অ্যাওয়ার্ড দিয়েছিলো। কেন যে দিয়েছিলো তা আমি জানি না।’

বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, এটা একটা কালো আইন। আইন করে সমস্ত টাকা তুলে নেবে। উন্নয়ন-অর্থ দরকার আছে। কিন্তু সামর্থ্য কতটুকু? এই টাকাগুলো ব্যাংকে জমা আছে। টাকা নেওয়া হলে ব্যাংকগুলো মারাত্মক বিশৃঙ্খলায় পড়বে। ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ নেই। শেয়ার বাজার ধ্বংস করে ফেলেছি।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, বিলটি পাস হলে অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে যাবে। রাজস্ব বোর্ড অটোমেশন করতে দিচ্ছে না। টাকা চুরি করছেন। ট্যাক্স নিচ্ছেন না, নিচ্ছেন ঘুষ। এটাকে সহজ করছেন না। টাকার মালিক জনগণ। জনগণের গচ্ছিত টাকা। পাচার হওয়া টাকা উদ্ধার করেন। জনগণের পকেটে হাত দিয়ে ফেলেছেন। ব্যাংকিং খাত ভেঙে পড়েছে। সেদিকে নজর দিন। 

সংসদে জাতীয় পার্টির শামীম হায়দার পাটোয়ারী এ বিলটিকে জনবিরোধী আইন, ডিসগাস্টিং আইন আখ্যায়িত করেন। 

এরপর জাতীয় পার্টি ও বিএনপিকে দোষারোপ করে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, এত বক্তৃতা শুনতে ভালো লাগে নাই। আপনারা একসময় দায়িত্বে ছিলেন। কী কাজ করেছেন? পৃথিবীতে কোথায় কী হচ্ছে জানা দরকার। বাংলাদেশ অন্য দেশের কাছে দৃষ্টান্ত। আপনারা বলছেন, ব্যাংক, শেয়ার বাজার সব খালি করে ফেলেছি। আপনাদের সময় পুঁজিবাজার কী ছিলো? 

‘আপনাদের সময় ইনডেক্স কী ছিলো? এবার সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। অর্থনীতিতে ওঠানামা থাকে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কার টাকায় তৈরী হয়েছে?  সরকারের টাকায়। জনগণের টাকায়। তৈরীর সময় যদি সরকার টাকা দেয়ৃ। তবে লাভের সময় ইচ্ছামতো বোনাস নেবে, বিদেশে ঘুরবে তা হয় না।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য এক। পিছিয়ে পড়ে থাকা মানুষকে মূল স্রোতে নিয়ে আসা। যত বড় ব্যবসায়ী তত বেশি ট্যাক্স দিচ্ছে। আইন সেভাবেই সাজানো। এ ধরনের আইন নতুন নয়। রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন দশম সংসদে পাস হয়েছে। সেখানে এ ধরনের কথা বলা হয়েছে। একাদশ সংসদে উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইনে একই ধরণের কথা বলা হয়েছে। সরকারের কোষাগারে অর্থ জমা না পড়েল শৃঙ্খলা আসবে না। বিদেশে ঢাকা পাচার হচ্ছে তবে, যেভাবে সুনির্দিষ্ট করে সংখ্যা বলা হচ্ছে সেটা মোটেও ঠিক নয়।  

পাস হওয়া এই বিলে মোট ৬১টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো-জাতীয় কারিকুলাম এবং টেক্সটবুক বোর্ড, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, ‘ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল, দিনাজপুর উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড), পল্লী উন্নয়ন একাডেমি-বগুড়া, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষা ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক), জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সেরিকালচার বোর্ড, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশন (বিটিএমসি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশন এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জুট মিল কর্পোরেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি), বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ চা বোর্ড, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), চট্টগ্রাম ওয়াসা, ঢাকা ওয়াসা, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড,  পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন।

বাংলাদেশ সময়: ২০০০ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২০
এসকে/এমএ

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন :   সংসদ অধিবেশন
        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
db 2020-02-05 20:02:24