bangla news

অপরাধ প্রমাণের আগেই কারাগারে ২২ বছর পার!

খাদেমুল ইসলাম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০২০-০১-১৪ ১০:৩৮:৫৭ পিএম
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

ঢাকা: দোষী না নির্দোষ তা জানার আগেই কারাগারে ২২ বছর পেরিয়ে গেছে। রাজধানীর লালবাগের কাচ ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ চাকলাদার ওরফে ঢাকাইয়া আজিজকে গুমের পর হত্যা করা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। সেই মামলার দুই আসামি জামাই ফারুক ও ইদ্রিস প্রায় ২২ বছর কারান্তরীণ। 

দুই দশক আগে অভিযোগপত্র দাখিলের পর মামলার অভিযোগ গঠন হয়েছিল। সেই অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে আসামিরা হাইকোর্টে গেলে মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন স্থগিতাদেশের কারণে মামলার বিচার কাজ বন্ধ থাকে। স্থগিতাদেশ ওঠে গেলে ২০১৭ সালে শুরু হয় মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ। 

এই মামলায় অভিযোগপত্রে থাকা ১৯ সাক্ষীর মধ্যে ৬ জন এবং আসামিদের মধ্যে একজন রাজসাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেন। সাক্ষ্যগ্রহণের পর মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) এই মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। এরপর ঢাকার নয় নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান রায়ের জন্য আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি দিন ঠিক করেন। 

মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ সকাল ৭টায় আজিজ চাকলাদার ওরফে ঢাকাইয়া আজিজ লালবাগ রোডের বাসা থেকে খুলনা যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছিলেন। আজিজকে খুঁজে না পেয়ে ছোট ভাই মো. বাচ্চু মিয়া লালবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। 

তবে জিডির ১২ দিন পর ১৭ মার্চ বাচ্চু একটি অপহরণ মামলা করেন। যেখানে মাকসুদ এবং আনুল্লাহ নামে দুজনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, মাকসুদ এবং আমানুল্লাহর সঙ্গে ভাঙা কাচের ব্যবসা করতেন আব্দুল আজিজ চাকলাদার। তারা দুজন আজিজের কাছে ব্যবসায়িক কারণে ২৫ হাজার টাকা পেতেন। এই টাকা লেনদেনকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও ঝগড়া হয়। এ কারণে মাকসুদ ও আমানুল্লাহ তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। 

এই মামলার তদন্ত চলাকালে রূপসা নদী থেকে একটি মাথার খুলি ও হাড্ডি উদ্ধার করা হয়। খালিশপুর থানার অন্য একটি মামলার জব্দ তালিকা থেকে প্রাপ্ত ওই মাথার খুলি ও হাড্ডি ঢাকাইয়া আজিজের বলে তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন। 

তবে এই মামলায় কারাগারে থাকা দুই আসামি জামাই ফারুক ও ইদ্রিসের আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো বাংলানিউজকে বলেন, ঢাকাইয়া আজিজের কোনো মরদেহ উদ্ধার করা যায়নি। উদ্ধার হওয়া মাথার খুলি ও হাড্ডির কোনো সুরতহাল, ময়নাতদন্ত বা ডিএনএ টেস্ট না করেই সেটিকে আজিজের বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, আমরা তদন্ত কর্মকর্তাকে সাক্ষ্যের সময় জেরা করেছিলাম, ১৯৯৮-৯৯ সালে রূপসা নদীতে কয়টি নৌকাডুবি হয়েছে বা তাতে কেউ হতাহত হয়েছে কি না সেগুলো কি নোট নিয়েছিলেন? তিনি তা বলতে পারেননি। 

২০০০ সালের ৪ এপ্রিল লালবাগ থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আব্দুর রাকিব খান (বর্তমানে ময়মনসিংহের ত্রিশাল সার্কেলের সহকারি পুলিশ সুপার) অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে মোট সাতজনকে আসামি করা হলেও প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে থাকা দুই আসামি মাকসুদ ও আমানুল্লাহকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। 

যে সাত আসামির নামে অভিযোগপত্র দেয়া হয় তারা হলেন— খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদার, লস্কর মোহাম্মদ লিয়াকত, মো. নূরে আলম, ইদ্রিস জামাই, জয়নাল, জামাই ফারুক ও মো. রুস্তম আলী। 

এর মধ্যে কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের অন্য মামলায় ২০০৪ সালের ১০ মে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আসামি লস্কর মো. লিয়াকত বিচার চলাকালে মারা যাওয়ায় তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। আসামি নূরে আলমকে রাষ্ট্রপক্ষ রাজসাক্ষী হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে। দুই আসামি জামাই ফারুক ও ইদ্রিস ২২ বছর ধরে এই মামলায় কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন। অপর দুই আসামি জয়নাল ও রুস্তম আলী পলাতক।  

২০০০ সালেই এই মামলার অভিযোগ গঠন হয়। অভিযোগ গঠনের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যান আসামিরা। এরপর হাইকোর্ট মামলার বিচার কার্যক্রমের উপর স্থগিতাদেশ দেন। ২০১৭ সালে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ ওঠে গেলে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। অভিযোগপত্রে থাকা ১৯ সাক্ষীর মধ্যে ৬ জন এবং রাজসাক্ষী হিসেবে নূরে আলম আদালতে সাক্ষ্য দেন। এরপর মঙ্গলবার উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন আদালত। 

রাজসাক্ষীর বরাতে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। 

তবে আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো আশা করছেন, তার দুই আসামি জামাই ফারুক ও ইদ্রিস খালাস পাবেন। কারণ রাজসাক্ষীর (আসামি নূরে আলম) এর জবানবন্দির উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করছেন। অথচ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে বা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে জামাই ফারুক বা ইদ্রিসের নাম বলেননি নূরে আলম। 

এই আইনজীবীর আশা অনুযায়ী আসামিরা খালাস পেলে, বিনা কারণে হাজতে থাকা দুই আসামির জীবন থেকে হারিয়ে যাবে ২২টি বছর। এমনকি যদি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও পান তবু তাদের শাস্তির মেয়াদ প্রায় পেরিয়ে যাবে বলে জানান এই আইনজীবী।

বাংলাদেশ সময়: ১০৩৭ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৪, ২০২০
কেআই/ইউবি 

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2020-01-14 22:38:57