ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯
bangla news

২১ আগস্ট: পেপারবুক তৈরির পরই আপিল শুনানির উদ্যোগ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৯-০৮-২১ ১:৪১:৫৬ এএম
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ফাইল ছবি

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ফাইল ছবি

ঢাকা: ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানির জন্য পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত, রায়সহ বই) তৈরির কাজ চলছে। আর এ পেপারবুক তৈরি হলে দ্রুত শুনানির জন্য আবেদন করবে রাষ্ট্রপক্ষ।

গত বছরের ১০ অক্টোবর ওই ঘটনায় বিচারিক আদালত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে অপর ১১ আসামিকে।

পরে ২৭ নভেম্বর এ মামলার বিচারিক আদালতের রায় প্রয়োজনীয় নথিসহ হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় এসে পৌঁছে।

আইনজীবীরা জানান, ফৌজদারি মামলায় বিচারিক আদালত যখন আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেন তখন ওই দণ্ড কার্যকরের জন্য হাইকোর্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক মামলার সব নথি হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেন। যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত। ওই নথি আসার পর হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করে। পেপারবুক প্রস্তুত হলে মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।

মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বাংলানিউজকে বলেন, পেপারবুকটা তৈরি হওয়ার পরই আমরা দ্রুত শুনানির জন্য একটা পদক্ষেপ নেবো।

যেসব আসামির দণ্ড কম হয়েছে, তাদের বিষয়ে আপিল করা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদের কার্যালয় (অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস) কোনো আপিল করেনি।

কবে নাগাদ শুনানি হতে পারে এ বিষয়ে মাহবুবে আলম বলেন, এটা (শুনানি) এই মুহুত্বে নির্দিষ্ট করে সময় বলে দেওয়া সম্ভব না। তবে পেপারবুক তৈরি হয়ে গেলে আমি এটার পদক্ষেপ নেবো। পেপারবুক তৈরি হলে আমরা শুনানির জন্য আদালতের কাছে প্রার্থনা করতে পারি।

তারেক রহমানের বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, একটা হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সব আসামির একই রকম সাজা নাও হতে পারে। কাজেই আদালত কোনো যুক্তিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়নি, সেটা না দেখেতো বলা সম্ভব নয়। 

পেপারবুক তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, একজন ডেপুটি রেজিস্ট্রারের তত্ত্বাবধানে দু’জন মুদ্রাক্ষরিক টাইপ করার কাজ শুরু করেছেন।

বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- লুৎফুজ্জামান বাবর, আব্দুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, হুজির সাবেক আমির ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টির আহ্বায়ক মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, কাশ্মীরি জঙ্গি আব্দুল মাজেদ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা, মাওলানা শওকত ওসমান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহম্মেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন, রফিকুল ইসলাম, উজ্জল, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুর রহিম, হানিফ পরিবহনের মালিক বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হানিফ।

পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩০২/১২০খ/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে তাদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন আদালত।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, বিএনপি নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হুজি সদস্য হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির আহমেদ, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম মাওলাদার, আরিফুল ইসলাম, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন, মো. খলিল ওরফে খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম বদর, ইকবাল ওরফে ইকবাল হোসেন, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই, রাতুল আহমেদ ওরফে রাতুল বাবু।

তাদের দণ্ডবিধির ৩০২/১২০খ/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এছাড়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) আশরাফুল হুদা ও শহিদুল হক, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অবসরপ্রাপ্ত) সাইফুল ইসলাম ডিউক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার, ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এটিএম আমিন, ডিএমপির সাবেক উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, আরেক সাবেক উপ-কমিশনার (পূর্ব) ওবায়দুর রহমান খান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোদা বক্স চৌধুরী, সিআইডির সাবেক বিশেষ সুপার রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ, সাবেক এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমানকে দুই বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরেকটি ধারায় খোদা বক্স চৌধুরী, রুহুল আমিন, আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমানকে তিন বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে কারাদণ্ড দেন আদালত।

পরে ১৩ জানুয়ারি দণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি আসামিদের ৪৪টি জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট।

ওইদিন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে থাকা তৎকালীন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ইউসুফ মাহমুদ মোর্শেদ বলেছিলেন, কারাবন্দি আসামিরা জেল আপিল করেছেন। এরমধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড পাওয়া আসামিরা রয়েছেন। তাদের জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে অর্থদণ্ড স্থগিত করেছেন। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতের নথি তলব করেছেন।

এছাড়া ২১ জানুয়ারি দুই বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক দুই আইজিপি শহুদুল হক ও আশরাফুল হুদার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে তাদের জামিন দেন হাইকোর্ট।

ঘটনা ও বিচারপ্রক্রিয়া
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাটি চালানো হয়। অল্পের জন্য ওই হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তবে হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক, সাবেক রাষ্ট্রপতি (প্রয়াত) জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন দলের তিন শতাধিক নেতা-কর্মী। ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন।

তদন্ত শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ১১ জুন দেওয়া অভিযোগপত্রে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন ও হুজি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। 
তখন জানা যায়, শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে হামলার ছক করা হয়েছিল। পাকিস্তান থেকে এসেছিল হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। দুই বছর তদন্তের পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এর ফলে এ মামলায় মোট আসামির সংখ্যা হয় ৫২।

সম্পূরক অভিযোগপত্রে যে ৩০ জনকে আসামি করা হয় তারা হলেন- তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও তৎকালীন মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, আবদুর রহিম, মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এটিএম আমিন, আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক, খোদা বকস, ওবায়দুর রহমান খান, খান সাঈদ হাসান, মাওলানা শেখ ফরিদ, মাওলানা আবদুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মাওলানা আবদুর রউফ, সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, আরিফুর রহমান, মাওলানা আবদুস সালাম, আবদুল মাজেদ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা, রুহুল আমিন, মুন্সী আতিকুর রহমান, আবদুর রশিদ, মোহাম্মদ হানিফ, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই ও বাবু ওরফে রাতুল বাবু।

মোট ৫২ আসামির মধ্যে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও মুফতি হান্নান এবং তার সহযোগী শাহেদুল ইসলাম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড অন্য মামলায় কার্যকর হয়। তিন জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় এ মামলার আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯ জনে। 

এই ৪৯ জনের মধ্যে ৩১ জনকে কারাগারে। পলাতক রয়েছেন বাকি ১৮ জন, তারা হলেন- তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, এটিএম আমিন, সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, খান সাঈদ হাসান, ওবায়দুর রহমান, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই, রাতুল বাবু, মোহাম্মদ হানিফ, আবদুল মালেক ওরফে, শওকত ওসমান, মাওলানা তাজউদ্দিন, ইকবাল হোসেন, মাওলানা আবু বকর, খলিলুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম।

আদালত রায়ে দণ্ডিতদের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ দিয়ে পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার আদেশ দেন।

বাংলাদেশ সময়: ০১৪০ ঘণ্টা, আগস্ট ২১, ২০১৯ 
ইএস/এসআরএস

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন :   ২১ আগস্ট
        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2019-08-21 01:41:56