ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২১ মে ২০১৯
bangla news

নুসরাতের জানাজায়ও রুহুল আমিনের আচরণ ছিলো ‘রহস্যজনক’

সোলায়মান হাজারী ডালিম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৯-০৪-২১ ১০:৩৩:৫৪ এএম
নুসরাতের বাড়িতে পরিদর্শনে আসছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান ও ফেনী জেলা প্রশাসন। এসময় সঙ্গে ছিলেন রুহুল আমিন। ছবি: বাংলানিউজ

নুসরাতের বাড়িতে পরিদর্শনে আসছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান ও ফেনী জেলা প্রশাসন। এসময় সঙ্গে ছিলেন রুহুল আমিন। ছবি: বাংলানিউজ

ফেনী: আগুনে পুড়িয়ে ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় প্রথম থেকেই অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার পাশাপাশি অভিযোগের তীর ছিলো স্থানীয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি (সদ্য বিলুপ্ত) রুহুল আমিনের দিকে।  

তবে স্থানীয়দের এসব অভিযোগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বীরদর্পে নুসরাতের জানাজায় অংশ নেন রুহুল আমিন। সেদিন জানাজায় তাকে দেখে অবাক হয়েছিলেন স্থানীয়রা। 

তারা বলেন, জানাজায় অংশ নিলেও রুহুল আমিনের আচরণ ছিলো বেশ সন্দেহজনক। ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে ধরা পড়ে তার রহস্যজনক চাহনিও! এ নিয়ে সমালোচনামুখর ছিলেন তারা। 

বিষয়টি হয়তো ধরা পড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার ও ফেনী ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের চোখেও। সেদিন বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘আসামিরা খুব বেশি দূরে নয়, এ জানাজার মাঠেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন। নুসরাত হত্যাকাণ্ডের আসামিরা যদি ৪০ হাত মাটির নিচেও থাকে, তাদের সেখান থেকে বের করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’ 

এ বক্তব্যের পর রুহুল আমিনের দিকে অভিযোগের তীর আরো ঘনীভূত হতে থাকে। গত শুক্রবার (২০ এপ্রিল) রুহুল আমিনকে গ্রেফতারের পর শনিবার (২১ এপ্রিল) পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। 

এরপর ফেনীর সচেতন মহল এবং সোনাগাজীর স্থানীয়দের ধারণা আরও পাকাপোক্ত হয় যে, নুসরাত হত্যায় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের ইন্ধনের বিষয়টি। কেননা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার খুঁটির জোরে ছিলেন এ রুহুল আমিন। 

জানা যায়, শুধু জানাজায় অংশগ্রহণই নয়, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা যখন নুসরাতের বাড়িতে তার পরিবারকে দেখতে যান, সেদিনও ছিলেন রুহুল আমিন। করেন কবর জিয়ারত। নুসরাতের বাড়িতে যান ফেনী জেলা আ'লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীসহ দলের নেতা-কর্মীরা। এসময় সঙ্গে ছিলেন রুহুল আমিনও। ছবি: বাংলানিউজ নুসরাতের বাড়িতে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীসহ দলের নেতা-কর্মীরা যেদিন যান ওই সময়ও সঙ্গে ছিলেন রুহুল আমিন। এমনকি নিজেকে আড়াল করতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নানের সঙ্গেও নুসরাতের বাড়িতে যান তিনি। এসময় ফেনী জেলা প্রশাসনের কর্মকতারাও ছিলেন। 

স্থানীয়রা বলছেন, রুহুল আমিন এ ধরনের ‘চাতুর্য’ করে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, তিনি এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু শেষ রক্ষে আর হয়নি। তার দিকে সন্দেহের তীর পাকাপোক্ত হয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনেরও (পিবিআই)। এক পর্যায়ে গ্রেফতার হন রুহুল আমিন। 

বর্তমানে পাঁচদিনের রিমান্ডে রয়েছেন তিনি। এ হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া এজাহারের আসামি নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে উঠে আসে রুহুল আমিনের নাম। 

কিলিং অপারেশনের পর কিলাররা যখন রুহুল আমিনকে ফোন করেন, তখন রুহুল আমিন বলেন, আমি জানি তোমরা চলে যাও। 

নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, গত ২৭ মার্চ তার বোন নুসরাত শ্লীলতাহানির অভিযোগ নিয়ে যাওয়ার পর সিরাজ উদদৌলা তার মাকে গালিগালাজ করেছিলেন। সে সময় মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি রুহুল আমিনও উপস্থিত ছিলেন। তিনি থাকাবস্থায় অধ্যক্ষ এমন আচরণ করছিলেন। তার নির্লিপ্ততায় তখনও আমরা অবাক হয়েছিলাম।  

একই কথা নুসরাতের ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানেরও। তিনি বলেন, গত ২৭ মার্চের ঘটনার পর মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটি বিচারে দ্রুত পদক্ষেপ নিলে, আমার বোনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু হতো না। তাৎক্ষণিকভাবে যদি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে ঘটনা এতো মর্মান্তিক পরিণতিতে যেতো না। এ বক্তব্যেও অভিযোগের তীর রুহুল আমিনের দিকে ছিলো। নুসরাতের কবর জিয়ারত করতে যান জেলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। সেখানেও দেখা যাচ্ছে রুহুল আমিনকে। ছবি: বাংলানিউজ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিরাজ উদদৌলার সঙ্গে রুহুল আমিনের ঘনিষ্ঠতার কথা সোনাগাজীর মানুষের মুখে মুখে। সিরাজই রুহুল আমিনকে কমিটিতে নেন। তবে নুসরাতের ঘটনা আলোচিত হতে থাকলে ভোল পাল্টিয়ে সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেন রুহুল আমিন। 

তার দিকে অভিযোগের ব্যাপারে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে তিনি বলেন, সাংবাদিকরা আমার বিরুদ্ধে লেখাতে আমার উপকার হয়েছে। আগে আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারতাম না। এখন আমি মিডিয়ার সামনে গুছিয়ে অনেকক্ষণ কথা বলতে পারছি।

এ বক্তব্যে তার দাম্ভিকতাও প্রকাশ পেয়েছে বলেও মনে করছে স্থানীয়রা।

জানা যায়, অধ্যক্ষ সিরাজ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর খোলস পাল্টে হয়েছেন আওয়ামী লীগের সমর্থক। সুবিধা পেতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। 

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে ধরা পড়লেও এর আগেও সিরাজের বিরুদ্ধে ওঠা এমন অনেক অভিযোগ ধামাচাপা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন। তার ভরসায় সিরাজের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা নুসরাতের পরিবারকে হুমকি-ধমকি দিয়ে সফল না হয়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়।  

সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রুহুল আমিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। কিন্তু তিনিই এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আবার ওই মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটিরও সহ সভাপতি।

রুহুল আমিনের প্রতিবেশীসহ স্থানীয়রা জানান, শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় দেশে কিছু করতে না পারেননি তিনি। একসময় পেটের তাগিদে সৌদি আরব চলে যান। সেখানে ট্যাক্সি চালিয়ে অর্থ উপার্জন করতেন। কোনো রকমে চলতো তার সংসার। তবে এখন তিনি কোটিপতি। 

দেশে ফিরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এরশাদের জাতীয় পার্টির হাত ধরে। অল্পদিনে তিনি দল পরিবর্তন করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ ভাগিয়ে নেন। 

একপর্যায়ে সভাপতির অনুপস্থিতিতে বাগিয়ে নেন দলের উপজেলার শীর্ষ পদ। চাঁদাবাজি, বালু মহালের নিয়ন্ত্রণসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। 

বিভিন্ন সময়ে দলের নেতা-কর্মীরাও তার রোষানলের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। আগে তার রোষানলের ভয়ে কথা না বললেও নুসরাত হত্যার ঘটনায় রুহুল আমিন গ্রেফতার হওয়ার পর মুখ খুলতে শুরু করেছেন স্থানীয়রা। উঠে আসছে তার অপকর্মের ইতিহাস।

সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ফয়জুল কবির বাংলানিউজকে বলেন, ‘কাগজে-কলমে আমিই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আমি তো রিজাইন করিনি। আমাকে বাদ দিয়ে কোনো চিঠিও দেয়া হয়নি। সাবেক সংসদ সদস্য রহিম উল্লাহকে সিনিয়র সহ-সভাপতি করা হয়েছিলো। এরপর তার ও জেলা কমিটির লোকজনের দাপটে প্রথমে আমি সক্রিয় হতে পারিনি। পরে রুহুল আমিন কিভাবে সভাপতি হয়েছেন তা আমার জানা নেই।’

রুহুল আমিনের ব্যাপারে দলের সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রহমান বিকম বলেন, ‘নুসরাত হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর মুকছুদ আলমকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রুহুল আমিনের ব্যাপারেও অনেকে বলছেন। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এদিকে, রুহুল আমিনকে গ্রেফতার এবং রিমান্ডের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নুসরাতের পরিবার, স্বজন ও গ্রামের লোকজন। এমন প্রভাবশালী নেতাকে গ্রেফতার করায় এ হত্যাকাণ্ডের সুবিচার পাবেন বলেও আশাবাদীও তারা।

নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, বোনের হত্যার সুবিচার পাবো বলে আমরা আশাবাদী।

এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি (প্রধানমন্ত্রী) প্রমাণ করেছেন অপরাধী যে দলেরই হোক না, কোনো ছাড় নেই। অপরাধী যতো শক্তিশালী হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে।

গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যায় নুসরাত জাহান রাফি। সহপাঠী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে-এমন খবরে নুসরাত মাদ্রাসা ভবনের ছাদে যান। 

সেখানে মুখোশপরা চার/পাঁচজন নুসরাতকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে করা মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করেন। অস্বীকৃতি জানালে নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায় তারা। 

এ ঘটনায় ৮ এপ্রিল রাতে কারাগারে বন্দি বহিস্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন নুসরাতের বড়ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। 

এখন পর্যন্ত নুসরাত হত্যায় এজাহারভুক্ত আট আসামিসহ মোট ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন সাতজন। ১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১০২৭ ঘণ্টা, এপ্রিল ২১, ২০১৯ 
এসএইচডি/আরবি/এমএ

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন :   ফেনী
        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14