ঢাকা, সোমবার, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২০ মে ২০২৪, ১১ জিলকদ ১৪৪৫

জাতীয়

প্রতিরোধের মার্চ-১

শহর থেকে গ্রামে যুদ্ধের প্রস্তুতি

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১২৫২ ঘণ্টা, মার্চ ৯, ২০১৯
শহর থেকে গ্রামে যুদ্ধের প্রস্তুতি মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ‘বিজয় মোড়’। ছবি: অনিক খান

১৯৭১। গৌরব ও প্রতিরোধের মার্চ। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন বঙ্গবন্ধু। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ময়মনসিংহ প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। ২৭ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল-ময়মনসিংহ ছিলো হানাদারমুক্ত এবং স্বাধীন। তারপর ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ শত্রুসেনা মুক্ত হয়। মাঝে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের ২৩১ দিন। ছোট-বড় অনেকগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয় ময়মনসিংহের রণাঙ্গনে। কোনো যুদ্ধে হানাদাররা চূড়ান্ত বিজয় পায়নি।

একাত্তরে ময়মনসিংহ ছিলো অপরাজেয়। যুদ্ধের সময়ে ময়মনসিংহের ইতিবৃত্ত নিয়ে ৫ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন লিখেছেন বাংলানিউজের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান

পড়ুন ধারাবাহিক প্রতিবেদনটির প্রথম কিস্তি। ছবি তুলেছেন ডিস্ট্রিক্ট ফটো করেসপন্ডেন্ট অনিক খান।

রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ময়মনসিংহ। ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ময়মনসিংহ রক্ত দিয়েছে। শহীদ হন আলমগীর মনসুর মিন্টু। সেই থেকে উত্তাল ময়মনসিংহ পুড়ছিলো দ্রোহের আগুনে। ’৭০ এর নির্বাচনেও ময়মনসিংহে ভোটযুদ্ধে ব্যাপক মেরুকরণ হয়। কিন্তু তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খাঁ ছিলেন নান্দাইলের।

আসনটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রফিক উদ্দিন ভূইয়া জয়ী হতে পারেননি। কিন্তু ময়মনসিংহ অঞ্চলজুড়েই স্বাধীনতার সপক্ষে সংগ্রাম দানা বেঁধেছিলো। একাত্তরের মার্চে ময়মনসিংহ ছিলো আন্দোলনমুখর, অগ্নিগর্ভ। যে সংগ্রামের আগুন শুধু রাজনীতি সচেতন শহর ময়মনসিংহে সীমাবদ্ধ ছিলো না। তা ছড়িয়ে পড়েছিলো বৃহত্তর ময়মনসিংহের গ্রামাঞ্চলে।

ছাত্র-জনতার মাঝে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের কর্মসূচি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিলো। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাজধানীর আন্দোলন কর্মসূচি অনুসরণ করছিলেন। যুগপৎ দেশব্যাপী কর্মসূচি চলছিলো। দেশের মানুষ তাকিয়েছিলো ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভার দিকে।

ওই সময় স্লোগান ওঠে ‘চলো চলো ঢাকা চলো’। ময়মনসিংহ থেকে ট্রেনে-বাসে করে বিপুল সংখ্যক লোক রেসকোর্সের জনসমুদ্রে হাজির হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রত্যক্ষদর্শী ময়মনসিংহের অসংখ্য নেতারা জীবদ্দশায় সেদিনের স্মৃতিকথা বলে গেছেন। রেসকোর্স ময়দান থেকে ফেরত নেতা-কর্মীরা উপলব্ধি করেন- যুদ্ধ অনিবার্য।

৭ মার্চের পর তাই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। শুরু হয় তরুণ ও যুবকদের মধ্যে মেরুকরণ। বাঁচতে হলে লড়াই করতে হবে। যুদ্ধ হবে। বিনাযুদ্ধে স্বাধীনতা আসবে না।

ময়মনসিংহ শহরে মুক্তিবাহিনীর জন্য যুবকদের সংগঠিত করা শুরু হলো। শুধু যুবকরা নয়, ছাত্র নয়, সব বয়সী মানুষজনকেই যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে হবে। এমন মূল্যবোধ থেকেই প্রতিদিন বিকেল হলেই বিভিন্ন স্কুল কলেজের মাঠে দলে দলে সমবেতন হতেন সর্বস্তরের মানুষ।

লাইন করে, গ্রুপ করে যুবক, মাঝ বয়সী, তরুণ ও বৃদ্ধরা আলাদা আলাদা দাঁড়াতেন। তারা শারীরিক কসরত করবেন। কুচকাওয়াজ করতেন। ক্রোলিং করতেন। এই সময়ে কারো হাতে লাঠি, কারো হাতে রামদা, বর্শা, কোচ থাকতো।  

বঙ্গবন্ধুর কথা মতো ‘যার যা আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত’ থাকা। যুদ্ধকালীন সবার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। নিজ তাগিদে সবাই এসে ট্রেনিং নিতেন। তাদের এই কাজ দেখভাল করতেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা।

ময়মনসিংহ শহরে একাধিক স্কুলের মাঠে প্রতিদিন হাজার হাজার লোক ট্রেনিং নিতেন। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিছিল হতো। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।

ময়মনসিংহ শহরের গুলকিবাড়িতে জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রফিক উদ্দিন ভূইয়ার বাড়িতে কন্ট্রোলরুম খোলা হয়। জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ প্রতিদিন বৈঠকে মিলিত হতেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি জেলাব্যাপী নেওয়া হচ্ছিলো।

এদিকে শহর ছিলো থমথমে। শহরের খাগডহরে ইপিআর ক্যাম্প অভিমুখে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ মিছিল হতো। বীর জনতা স্বাধীনতাপাগল হয়ে ওঠে। জনগণ জেনে গিয়েছিলো- দেশের পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে পরিণতি একটাই, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। আর একটি নতুন দেশের অভ্যুদয়ে রক্ত লাগবেই।

পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করতে মুক্তিযুদ্ধ হবে সর্বাত্মক সশস্ত্র। যুদ্ধ কতদিন চলবে তা অনিশ্চিত। সুতরাং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি শুধু রাজনৈতিক ছিলো না, শুধু রাজপথের প্রস্তুতি নয়, ঘরে ঘরে মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে।

একাত্তরের মার্চে ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও রণপ্রস্তুতি নেওয়া হয়। গ্রামের মানুষ কাঠের বন্দুক বানিয়েছে। বড় বড় রামদা, বর্শা, হলঙ্গা বানানোর হিড়িক পড়ে যায়। রাত জেগে পাহারা চালু করা হয়।

অথচ তখনো যুদ্ধের শঙ্কা ছিলো সম্ভাবনামাত্র। কিন্তু দেশের মানুষ মার্চের দিনগুলোতে যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই বোঝেনি।

তখন দেশের মানুষ অপেক্ষায় ছিলো, ৭ কোটি মানুষ তাকিয়ে ছিলো একজন নেতার দিকে। বঙ্গবন্ধু কী নির্দেশ দেবেন সেটিই সবার লক্ষ্য। সেই নির্দেশ যে হবে মুক্তিযুদ্ধ সেই ব্যাপারে কারো মধ্যে সন্দেহ ছিলো না।

আওয়ামী লীগের সমর্থন বিগত নির্বাচনের মাধ্যমেই নিরঙ্কুশ হয়ে গিয়েছিলো। নৌকায় ভোট দেওয়ার মধ্যে দিয়েই মানুষ একাত্ম হয়েছিলো।
মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ‘বিজয় মোড়’।  ছবি: অনিক খান
৭ মার্চের ভাষণের পর সাধারণ মানুষও আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সমবেত হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ মানেই বাঙালি। বাঙালিত্ব হয়ে ওঠে এই ভূ-খণ্ডের মানুষের আত্মপরিচয়। পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রতি বিদ্বেষ, ধিক্কার-জনমানুষের সেন্টিমেন্টকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়।

আর সরকারপন্থি মুসলিম লীগাররা এই সময় হতচকিত হয়ে পড়ে। জনগণের জাগরণের মুখে তারা ঘাপটি মারে। প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রাখা, বাঙালির জাগরণ রুখে দিতে চলে তাদের ষড়যন্ত্র। কিন্তু মুক্তিপাগল জনগণ তাদের শত্রু নির্ধারণ করে; যাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ হবে।  

ময়মনসিংহ শহরে বসবাসরত পশ্চিম পাকিস্তানি নাগরিক, উর্দুভাষী, বিহারিরা বাঙালিদের যুদ্ধ প্রস্তুতি দেখে স্নায়ুবিক চাপের মুখে পড়ে।  

তবে বাঙালির বিদ্বেষ উর্দুভাষী ও তাদের দোসরদের হিংসাত্মক করে তোলে। এই অবস্থায় ২৬ মার্চের আগে ময়মনসিংহ হয়ে পড়ে বিস্ফোরণমুখ। যেকোন সময় রক্তপাতের আশঙ্কার মধ্যে দিন যাচ্ছিলো।

২৫ মার্চ কালরাত্রিতে রাজধানীতে পাক হানাদাররা ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যাযজ্ঞ চালায়। ২৬ মার্চ সেই খবর ময়মনসিংহে ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে ভীতিকর অবস্থা অন্যদিকে প্রতিরক্ষার সর্বোচ্চ প্রস্তুতির মধ্যে চাপা উত্তেজনা ও ক্ষোভ। একই অবস্থা ২৭ মার্চ। শহরে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ হয়।  

স্থানীয় খাগডহর ইপিআর ক্যাম্প ঘেরাও কর্মসূচি। ২৭ মার্চ রাত ১২টা। খাগডহর ইপিআররা পাকিস্তানি ইপিআরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ সূচনা করে। রাতভর চলে সেই যুদ্ধ। সকাল ৮টার পর খাগডহর যুদ্ধে বাঙালিরা বিজয়ী হয়।  

বাংলাদেশ সময়: ০৭৫০ ঘণ্টা, মার্চ ০৯, ২০১৯
এমএএএম/এমজেএফ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।