[x]
[x]
ঢাকা, শনিবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
bangla news

ভাতিজাদের দিয়ে অর্থপাচার চেষ্টার অভিযোগ ফালুর বিরুদ্ধে!

রহমান মাসুদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৮-০৯-১২ ১০:১৮:৫১ পিএম
অবৈধ অর্থপাচারের অভিযোগে তদন্ত চলছে মোসাদ্দেক আলী ফালুর বিরুদ্ধে

অবৈধ অর্থপাচারের অভিযোগে তদন্ত চলছে মোসাদ্দেক আলী ফালুর বিরুদ্ধে

ঢাকা: দেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে আট মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬৫ কোটি টাকা) পাচারের অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ডাকে সাড়া দেননি তিনি। তবে দুবাইয়ে বসে দুই ভাতিজার মাধ্যমে দেশে থাকা দুদকের তদন্তাধীন সম্পত্তি অবৈধভাবে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারের চেষ্টা করছিলেন। আর এ কাজে সহায়তা করছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গোয়েন্দা ইউনিট এই অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই দুষ্টুচক্রের বিরুদ্ধে তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। একইসঙ্গে অর্থপাচারে সহযোগিতার অভিযোগে সেই দুই ভাতিজাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের বিদেশ গমনের ওপর দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞাও।

যাকে নিয়ে এতো কাণ্ড, তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালু। তাকে সহায়তাকারী দুই ভাতিজা হলেন রোজা প্রোপার্টিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাঈম উদ্দিন আহম্মেদ ও একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আশফাক উদ্দিন আহম্মেদ। বুধবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। সেই সূত্র থেকেই ফালুর অর্থপাচারের এই চেষ্টার খবরটি জানা যায়।

সূত্র বলছে, দুবাই অবস্থান করে বাংলাদেশে থাকা তার ‘অবৈধ সম্পদের’ মধ্যে পাঁচটি ফ্ল্যাট, একাধিক বাড়ি ও জমি দুই ভাতিজার নামে লিখে দেওয়ার চেষ্টা করেন ফালু। বিষয়টি অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। গত মঙ্গলবার (১১ সেপ্টেম্বর) কমিশনের অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তের পর দুদকের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়েছে। 

দুদকের একাধিক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বাংলানিউজকে জানান, মোসাদ্দেক আলী ফালু তার দুই ভাতিজা আশফাক উদ্দিন ও নাঈম উদ্দিনের নামে ওই সব সম্পত্তি ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দলিল করেছেন। দুদকে অভিযোগ আসে, ফালু দুর্নীতির মাধ্যমে এসব সম্পত্তি অবৈধভাবে অর্জন করেছেন এবং তা রাষ্ট্রের অনুকূলে রাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি তার দলিলের মাধ্যমে দুইজনকে দিয়ে দিয়েছেন। 

প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্য মতে, এসব দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে ‘অবৈধভাবে লাভবান’ হয়ে দুবাই থেকে ফালুকে সহযোগিতা করেছেন সেখানে নিযুক্ত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের ভাইস কনস্যুলার মো. মেহেদুল ইসলাম ও বাংলাদেশ থেকে সহকারী পররাষ্ট্র সচিব মো. মাসুদ পারভেজ।

এ বিষয়ে দুদক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা চাওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে জানিয়ে দুদকের ওই কর্মকর্তারা বলেন, শিগগির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে এই ব্যাখ্যা দিতে বলা হবে।

দুদকে আসা অভিযোগে আরও বলা হয়, মোসাদ্দেক আলী ফালু তেজগাঁও, ধানমন্ডি, উত্তরা এবং গুলশান সাব-রেজিস্ট্রার এলাকায় থাকা তার পাঁচটি ফ্ল্যাট ও এসব ফ্ল্যাটের পার্কিংয়ের স্থানসহ অন্যান্য সম্পত্তি রোজা প্রোপার্টিজের দুই পরিচালক নাঈম উদ্দিন ও আশফাক উদ্দিনকে দলিল করে দিয়েছেন। এছাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকায় বাড়ির ভূমি ২ দশমিক ৫২০২ কাঠা; তেজগাঁও মোজার ৬৬০ অযুতাংশ বাড়ি ভূমি; উত্তরখান মোজার ৩৪ শতাংশ ভিটি ভূমি ও এসব ভূমির ওপর ৬৪টি দোকান এবং জোয়ার সাহারা মৌজার ২৪৭ দশকিম ৫০ অযুতাংশ ভিটি ভূমি ফালু দলিল করে দিয়ে দিয়েছেন। 

দুদক সূত্র বলছে, অফশোর কোম্পানি খুলে আট মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগ পেয়ে গত ১৪ আগস্ট ফালুকে প্রথম দফায় তলব করে দুদক। সেসময় তিনিসহ মোট নয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়। তখন ফালু তার প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি সচিবের মাধ্যমে এক মাসের সময় চেয়ে আবেদন করেন। দুদক তাকে ৫ সেপ্টেম্বর হাজির হতে নির্দেশ দেয়। তবে ৫ সেপ্টেম্বরও হাজির হননি বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক রাজনৈতিক সচিব ফালু। 

তবে দুবাইয়ে অবস্থানরত বিএনপির পদত্যাগী এ ভাইস চেয়ারম্যান আইনজীবীর মাধ্যমে সময় চেয়ে আবেদন করেন।

ফালু ছাড়াও তলব করা হয়েছিল আর এ কে পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামার উজজামান, পরিচালক শায়লিন জামান আকবর, রোজা প্রোপার্টিজের পরিচালক আশফাক উদ্দিন আহম্মেদ, আর এ কে কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের পরিচালক মো. আমির হোসাইন ও এম এ মালেক, আর এ কে পাওয়ার লিমিটেডের পরিচালক মো. মাকসুদুল ইসলাম, আর এ কে সিরামিকসের স্বতন্ত্র পরিচালক ফাহিমুল হক এবং স্টার সিরামিকসের পরিচালক প্রতিমা সরকার।

এদের মধ্যে ফালু ছাড়াও তলবে হাজির হননি শায়লিন জামান আকবর, মাকসুদুল ইসলাম এবং প্রতিমা সরকার। তারাও সময় চেয়ে দুদকে আবেদন করেছেন। তবে অভিযুক্ত অন্য পাঁচজন দুদকে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জবাব দিয়েছেন।

এর আগে, গত ২ আগস্ট মোসাদ্দেক আলী ফালুসহ নয়জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশকে চিঠি পাঠায় দুদক।  যদিও তার আগেই দুবাইয়ে চলে গেছেন ফালু।

ওই চিঠিতে বলা হয়, এই নয়জনের বিরুদ্ধে আট মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের প্রায় ৬৫ কোটি টাকা দুবাইয়ে পাচার করে অফশোর কোম্পানি খুলে বিনিয়োগ, দুবাইয়ে আরও শত কোটি টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানেও এর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তাই তারা যাতে দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে না পারেন, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দুদকের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।

দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি দল এ অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে। দলের আরেক সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদার রাজনৈতিক সচিব ছিলেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। সে সময় ঢাকার একটি আসন থেকে উপ-নির্বাচনে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

পরে তাকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদে নিয়ে আসেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ২০১৬ সালে বিএনপির নতুন কমিটিতে ফালুকে উপদেষ্টা থেকে ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। তবে ক’দিন পর তিনি পদত্যাগ করেন।

এরপর থেকে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ফালু। সিকিউরিটিজ, আবাসন, অ্যাগ্রো, আমদানি রপ্তানি ব্যবসায় জড়িত এই ব্যবসায়ী একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার বিরুদ্ধে এর আগেও বেশ কয়েকটি মামলা করেছে দুদক।

বাংলাদেশ সময়: ২২১৮ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮
আরএম/এইচএ/

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa