ঢাকা, সোমবার, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭, ১০ আগস্ট ২০২০, ১৯ জিলহজ ১৪৪১

জাতীয়

মাদকাসক্ত বন্দি নিয়ে বিপাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, মাসে গড়ে ১ জনের মৃত্যু

হাজেরা শিউলি, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮১৭ ঘণ্টা, মে ৩, ২০১১
মাদকাসক্ত বন্দি নিয়ে বিপাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, মাসে গড়ে ১ জনের মৃত্যু

চট্টগ্রাম: মাদকাসক্ত বন্দিদের নিয়ে বিপাকে পড়েছে কারা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এই কারাগারে গ্রেপ্তার এক হাজার মাদকাসক্ত বন্দি রয়েছে।

 

কিন্তু কারাগারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় চরম মাদকাসক্ত অনেক বন্দি অবধারিতভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। প্রতি মাসে গড়ে এক জন বন্দির মৃত্যু হচ্ছে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।

কর্তৃপক্ষ জানায়, এক সপ্তাহের মধ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে মাদক মামলার দুই বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এরা হচ্ছেন মোবারক আলী (৬৫) ও মোহাম্মদ ইসলাম (৪০)। কারা হাসপাতালে চিকিৎসার পরও অবস্থার অবনতি ঘটলে এই দুই বন্দীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে (চমেক) পাঠানো হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যায়।
 
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেলার রফিকুল কাদের বাংলানিউজকে জানান, কারাগারে সাড়ে চার হাজার বন্দির মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই মাদকাসক্ত। এদের মধ্যে অনেকেই মাদকাসক্তির পাশাপাশি গুরুতর জখম নিয়ে আসে।
 
তিনি আরো বলেন, কারা হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক এবং মাদকাসক্তদের জন্য বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় মাদকাসক্তদের নিবিড় ও সার্বক্ষনিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে ড্রাগ উইথড্রাল সিনড্রমে আক্রান্ত চরম মাদকাসক্ত রোগীদের মধ্যে প্রতি মাসে গড়ে এক জনের মৃত্যু হচ্ছে। এসব রোগীদের চমেক-এ পাঠানো হলেও সেখানেও তারা পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাচ্ছেনা।

কারাগারের বন্দিদের রেজিস্টার খাতার হিসাবে দেখা গেছে প্রতি ছয় জনের মধ্যে দুই থেকে তিন জনই মাদক সংক্রান্ত মামলার আসামি এবং অধিকাংশই মাদকাসক্ত।

হাসপাতালের ১০টি ওয়ার্ডের মধ্যে একটি ওয়ার্ডে মাদকাসক্ত বন্দিদের আলাদাভাবে রাখা হলেও অনেক সময় তাদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কারা হাসপাতালে সংকুলান হয়না। বর্তমানে কারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একশ’ বন্দির মধ্যে ৪০ জনই মাদকাসক্ত বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

জেলার রফিকুল কাদের জানান, জেল কোড অনুযায়ী কোনো বন্দিকে বাইরে পাঠাতে হলে তার জন্য ন্যুনতম দুই জন কারারক্ষী দিতে হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত কারারক্ষী না থাকায় সব গুরুতর বন্দিদের চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে পাঠানো যায়না। বর্তমানে চমেক-এ চিকিৎসাধীন আট বন্দির জন্য ৪৮ জন কারারক্ষী নিয়োজিত রয়েছে। এই সংকট নিরসনে চমেকে কারাবন্দিদের একটি প্রিজন এনেক্স ওয়ার্ড করার জন্য একাধিকবার বলা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
 
এদিকে চট্টগ্রাম ছাড়াও বিভাগের অন্যান্য কারাগার ফেনী, লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজার, নোয়াখালীসহ তিন পার্বত্য জেলার গুরুতর অসুস্থ বন্দিদেরও এখানে পাঠানো হয়। ফলে তাদের দায়-দায়িত্বও চট্টগ্রাম কারাগারকে বহন করতে হয়।

কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেড় হাজার বন্দির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সাড়ে চার হাজার বন্দির জন্য মাত্র দুইশ’ কারারক্ষী রয়েছে। এই জনবল দিয়ে কারাগারের নিরাপত্তাসহ, আসামিদের আনা নেওয়া এবং চমেক-এ চিকিৎসাধীন বন্দিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়।  

এই বন্দিদের চিকিৎসার জন্য বন্দি ভবনের একটি অংশকে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মাত্র দুই জন চিকিৎসক, দুই জন নার্সের তত্ত্বাবধানে এবং ২২ জন কয়েদীর সহায়তায় চলছে বন্দিদের চিকিৎসা কার্যক্রম।
 
এ প্রসঙ্গে কারা চিকিৎসক আখতারুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, কারাগারে মাদকাসক্ত বন্দিরা আসলে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে, ওষুধ দিতে হবে এমন বিধান কারাগারের চিকিৎসার কাঠামোতে নেই। মাদসকাক্তদের জন্য সরকারিভাবে কোনো ওষুধের সরবরাহও নেই। অনেক কষ্ট করে নিজ উদ্যোগে অনেক সময় নিজেদের টাকায় ওষুধ কিনে আমরা মাদকাসক্তদের চিকিৎসা করছি। এদের চিকিৎসা দেওয়া অনেক ঝুঁকির ব্যাপার। ফলে আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্বেও চরম মাদকাসক্ত বন্দিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

জেলার রফিকুল কাদের জানান, মাদকাসক্ত এসব বন্দিদের নেশার জগত থেকে ফিরিয়ে আনতে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কয়েকটি  কারণে পুলিশ বা আইনি হেফাজতে আসামিদের মৃত্যু হয়। সেগুলো হচ্ছে বার্ধক্য, জটিল রোগ, গ্রেপ্তারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর জখম এবং গ্রেপ্তার পরবর্তী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়া।

কর্মকর্তারা জানান, এসব মৃত্যুর ঝুঁকি এড়াতে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের কারাগারে পাঠানোর আগে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া এবং মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় এদের ক্ষেত্রে জামিন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় করা উচিত।

বাংলাদেশ সময়: ১৭৫৪ ঘণ্টা, মে ৩, ২০১১

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa