bangla news

বেড়া-সাঁথিয়ায় গণহত্যা : নিজামীই মূল হোতা

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১০-১১-০৬ ১:০৫:০১ পিএম

মুক্তিযুদ্ধে পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়ায় গণহত্যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশদাতা ছিলেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। শনিবার বিকেলে পাবনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য জানান।

পাবনা : মুক্তিযুদ্ধে পাবনার বেড়া ও সাঁথিয়ায় গণহত্যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশদাতা ছিলেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। শনিবার বিকেলে পাবনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য জানান।

বিকেল ৫টায় সাঁথিয়া উপজেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রেসব্রিফিং-এ প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, ‘আজ শনিবার সারাদিন আমরা সাঁথিয়া-বেড়া অঞ্চলের বিভিন্ন বধ্যভূমি, গণকবর, রাজাকার ক্যাম্প, রাজাকার টর্চার সেল, শহীদদের কবর পরিদর্শন করেছি। এ সময় স্থানীয় এলাকাবাসী, মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার, প্রত্যদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের স্যা নিয়েছি। এতে আমরা প্রাথমিকভাবে তথ্য প্রমাণ পেয়েছি যে, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সুবাহান, ইসাহাকের প্রত্য-পরো নির্দেশে এবং তাদের অর্থায়নে স্থানীয় সাত্তার, আসাদসহ অন্যান্য রাজাকারদের সহায়তায় এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী গণহত্যা, নির্যাতন, লুটপাট চালিয়েছে। আমরা আশা করছি আমাদের এই তদন্ত কাজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করবে।’

এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ী বধ্যভূমি পরিদর্শন ও তদন্ত শেষে শনিবার সকাল ১১টায় একই উপজেলার ধূলাউড়ি গ্রামের বধ্যভূমি পরদির্শনে যান। এই গ্রামের মজিবর ফকিরের বাড়ির আঙিনায় রয়েছে বধ্যভূমিটি। এলাকাবাসী এখানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলীসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী জানান, ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর ফজরের আজানের পর নিজামীর উপস্থিতিতে স্থানীয় সাত্তার রাজাকার ও তার সহকর্মীদের সহায়তায় পাকবাহিনী হামলা চালায়।

প্রত্যদর্শী খালিলুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, তিনি তখন ২২ বছরের যুবক। ওইদিন আজানের পর পরই তারা টের পান পাকবাহিনী গ্রামটিকে ঘিরে ফেলেছে। মুক্তিযোদ্ধারা যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল সেই বাড়ি থেকে তাদের ধরে এনে হত্যা করে। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, গুলি করে তাদের হত্যা করা হয় এবং এ সময় পুরো গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এখানে ৮ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ মোট ২১ জনকে হত্যা করা হয়।

৮০ বছরের নুরুল ইসলাম প্রামানিক বয়সের ভারে এখন ন্যুজ্ব। তবুও যেন সেদিনের কথা বলার সময় তারুণ্যের উজ্জ্বলতা তাকে ভর করে।

তিনি জানান, নিজ হাতে সেদিন তিনি অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে এখানে কবর দিয়েছেন।

এ সময় সাঁথিয়া উপজেলার বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জহুরুল হক বলেন, ‘এই উপজেলায় প্রায় ৫ শ’ রাজাকার ছিল। যারা সবাই নিজামীর আত্মীয়-স্বজন।’

তবে স্থানীয় অনেকেই অভিযোগ করেন, ভয়ে এবং হুমকীতে অনেক সাীকে আজ শনিবার তদন্ত দলের কাছে আসতে দেওয়া হয়নি। এ সময় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা তমান্ডের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন মুকুল বলেন, গত ২৯ অক্টোবর তদন্ত দলের কাছে স্যা দিতে উপস্থিত হওয়ার জন্য উপজেলা কমান্ড কার্যালয়ে সাধারণ মিটিং করা হয়েছে। কিন্তু আজ অনেক মুক্তিযোদ্ধা, আ’লীগের কিছু নেতা উপস্থিত হননি। আজ যদি এখানে টিআর, কাবিটা, কাবিখা বিভিন্ন প্রকল্প থাকতো তাহলে অনেককেই হাজির দেখা যেত। স্থানীয় জামায়াত কর্মীরা দলবেঁধে এলেও তারা আসেননি। এমনকি যার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের কবর সেই বাড়ির লোকই আজ এখানে উপস্থিত নেই।

এখানে উল্লেখ্য, জামায়াত কর্মীরা দলবেঁধে লাঠি নিয়ে সাংবাদিকদের ধাওয়া করার চেষ্টা করে। পরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতায় তারা পালিয়ে যায়।

পরে তদন্ত দল বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে করমজা গণকবর পরিদর্শণে যান। এই গ্রামের মৃত মমিন প্রামানিকের ছেলে ইলেকট্রনিক্স মেকার আমিনুল হক জানান, ৭১’ সালের ৮ মে ভোররাত ৩টার দিকে পাক বাহিনী এসে গ্রামের ৯ জন হিন্দু ও ১ জন মুসলমানকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে গণকবর দেয়। এছাড়া প্রায় ১ শ’টি বাড়িতে লুটপাট চালায়। এই গণহত্যায় পাক বাহিনীকে সহায়তা করে করমজা পূর্বপাড়া গ্রামের ডা. সিরাজ উদ্দিনের ছেলে। সে সময়ের আল বদরের কমান্ডার বর্তমান জামায়াতের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ক্রিসেন্ট হাউজিং এর মালিক রফিক উন নবী বাবলু, রাজাকার আফজাল, আসাদসহ অন্যান্যরা। আর এদের নির্দেশদাতা ছিলেন মাও. নিজামী ও স্থানীয় মৃত আব্দুর রহিম।

এরপর তদন্ত দল ৩টা ৪০ মিনিটে বেড়া উপজেলার পাইকরহাটি পশ্চিমপাড়া ডাববাগান নামক স্থানে গণকবর পরিদর্শনে গেলে মুক্তিযোদ্ধা আবু বকর সিদ্দিক ও কাজী আজম জানান, ৭১’ সালের ১৯ এপ্রিল আর্মিরা নগরবাড়ি ঘাট থেকে এখানে এসে প্রায় ৩ শ’ বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেয়। এ সময় সম্মুখযুদ্ধে ১৭ জন শহীদ হয়। তাদের লাশ এখানে গণকবর দেয়। পরে তদন্ত দল শহীদনগর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য পরিদর্শণ করেন এবং বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে রাজাকার ক্যাম্প পরিদর্শণ করে তদন্ত কাজ শেষ করেন।

বাংলাদেশ সময় : ২২৪৯ ঘণ্টা, নভেম্বর ০৬, ২০১০

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2010-11-06 13:05:01