bangla news

নিজামীর নির্দেশে পাবনায় গণহত্যা

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১০-১১-০৫ ১:৪৬:৩৭ এএম

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা শুক্রবার দুপুরে ঈশ্বরদীর পাকশীতে গিয়ে তদন্ত কাজ করেছেন। প্রথমে তারা যান রেলওয়ে কলোনীতে। সেখানে ডা. রফিক আহমেদ ও তার তিন পুত্র এবং সহকর্মীদের কবরস্থান জিয়ারতের মধ্য দিয়ে পাকশীতে তদন্ত কাজ শুরু হয়।

ঈশ্বরদী (পাবনা): আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা শুক্রবার দুপুরে ঈশ্বরদীর পাকশীতে গিয়ে তদন্ত কাজ করেছেন। প্রথমে তারা যান রেলওয়ে কলোনীতে। সেখানে ডা. রফিক আহমেদ ও তার তিন পুত্র এবং সহকর্মীদের কবরস্থান জিয়ারতের মধ্য দিয়ে পাকশীতে তদন্ত কাজ শুরু হয়।

পাকশীর পাকুড়িয়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শামসুল ইসলামসহ অন্যরা তদন্ত দলের কাছে ১৯৭১ সালের পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের বর্ননা করতে গিয়ে বলেন, ‘স্থানীয় চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপিঠ হাইস্কুলপাড়া গ্রামের মৃত নবীর উদ্দিনের তিন ছেলে আব্দুল লতিফ, আনোয়ারুল ইসলাম আতু এবং নান্নুকে ৭১’র ১২ এপ্রিল বাড়ি থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর স্থানীয় দোসর বিহারী রমজানের নেতৃত্বে ধরে নিয়ে হাইস্কুল মাঠে প্রকাশ্যে হত্যা করে। পরে তাদের লাশ হাইস্কুলের পাশে (বর্তমানে বাবুপাড়া) মাটি চাপা দেয়।’

অধ্যাপক শামসুল ইসলাম তদন্ত দলের কাছে সেদিনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুস সোবাহান, ইসাহাকের প্রত্য ও পরো মদদ ছিল বলে দাবি করেন।

স্থানীয়রা জানান, হাসপাতালের চিকিৎসক রফিক আহমেদ ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল ৫২ বছর। তিনি ভেবেছিলেন, যতই যুদ্ধ বাধুক না কেন তাকে কেউ কখনও হত্যা করবেনা। কারণ এখানকার সবাই তাকে এবং তার ছেলেদের ভালবাসেন।

১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনী পাকশীতে প্রবেশ করে। ১২ এপ্রিল স্থানীয় বাঙালি এবং বিহারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে অনেকেই ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনত্র চলে যান। কিন্তু ভালবাসা এবং বিশ্বাসের কারণেই ডা. রফিক বাড়ি ছেড়ে যাননি। এমনকি ছেলেদেরকেও পাঠাননি নিরাপদ আশ্রয়ে।

এস এম নুরুল ইসলাম নামে একজন স্থানীয় বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমি যাওয়ার সময়েও ডাক্তারকে বলেছিলাম চলেন, এখানে থেকে মরতে হবে। কিন্তু তিনি আমার হাত ধরে বলেছিলেন, আমাকে কেউ মারবেনা। আমি চলে গেলে অসুস্থ্য মানুষকে কে দেখবে?’

১৩ এপ্রিল ডা. রফিক আহমেদ এবং তার বড় ছেলে আজম জিয়াউদ্দিন দুলাল (২২), মেজ ছেলে আজম সাইফুদ্দিন মামুন (১৮) এবং ছোট ছেলে আজম রইচউদ্দিন শামীমকে (১৬) হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

ডা. রফিককে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসার কারণে প্রতিবেশী আমিনুল হককেও (৪৯) হত্যা করা হয়।

পাকশী থেকে বিকেলে তদন্ত দল ঈশ্বরদীর বাঘইল শহীদ পাড়ায় যান। সেখানে ১৮ জনের একটি গণকবর পরিদর্শন করেন। এসময় তারা এলাকাবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।

তদন্ত দল ২০ জনের স্যা গ্রহণ করেছেন বলে বাংলানিউজকে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক খাঁন পিপিএম।

তদন্ত শেষে প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং শহীদ পরিবারের সদস্য, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে, স্যা নিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সাবেক শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, পাবনা সদরের সাবেক এমপি মাওলানা আব্দুস সোবাহান, সাবেক মন্ত্রী মাওলানা ইসাহাকের প্রত্য ও পরো সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী পাকশীর ডা. রফিকসহ তার পরিবারের পাঁচ সদস্য, আব্দুল লতিফ, আনোয়ারুল ইসলাম, নান্নুসহ আরও অনেককেই হত্যা করার প্রাথমিক তথ্য প্রমাণ পেয়েছি।’
তদন্ত দল শনিবার সাঁথিয়া উপজেলার ধুলাউড়ি ও করমজার বধ্যভূমি, গণকবর, আলবদর, রাজাকার ক্যাম্প ও নির্যাতন কেন্দ্র চিহ্নিতকরণ, পরিদর্শন ও স্যা গ্রহণ করবেন।

এর আগে সকাল ৮টায় ১৪ মিনিটে পাবনা সার্কিট হাউজ থেকে তারা ঈশ্বরদী উপজেলায় যান। সেখানে এলাকার বিভিন্ন বধ্যভূমি, গণকবর পরিদর্শন শুরু করে তদন্ত দল।

তদন্ত দলের সদস্যরা ঈশ্বরদীতে এসে প্রথমেই যান বর্তমান প্রেসকাব ও রেল জংশনের কাছাকাছি কয়লা ডিপোতে। মুক্তিযুদ্ধকালে এখানে স্থানীয় ১৮ জনসহ নাম না জানা আরও অন্তত ৫০-৬০ জনকে রাজাকার বাহিনীর সহায়তায় হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা।

শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানান, মূলত জামায়াত আমীর নিজামীর প্রত্য নেতৃত্বে ও মদদে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।  

পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে শহীদ হওয়া মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে তহলুর আলম তদন্ত দলকে জানান, মোয়াজ্জেম হোসেনসহ তার পরিবারের আরও কয়েকজনকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী।

তহলুর জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হানাদারদের হাত থেকে বাঁচতে স্থানীয় জামে মসজিদে এসে অনেকে আশ্রয় নেন এলাকাবাসীর অনেকে। তাদের বিশ্বাস ছিল মসজিদে আশ্রয় নেওয়ায় তাদেরকে হত্যা করা হবে না। কিন্তু সেই মসজিদ থেকেও তাদেরকে বের করে হত্যা করে লাশ কয়লার খনিতে ফেলে রাখা হয়।

তিনি আরও জানান, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দু’দিন পরপর এসে কয়লার ডিপোর গর্ত থেকে লাশগুলো নিয়ে যেত।

রাজাকারদের সহায়তায় এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। স্থানীয় রাজাকার কমান্ডার খোদা বক্স খান ও ইসমাইল মাওলানা ছাড়াও অন্যান্য রাজাকারদের মধ্যে ছিল আলম, সিদ্দিক, সাইফুল ও আরও কয়েকজন। ১৯৮৮ সালের ৩ অক্টোবর রাজাকার কমান্ডার খোদাবক্স মারা যান। বাকিরা এখনও বেঁচে আছেন। এদের মধ্যে রাজাকার কমান্ডার ইসমাইল মাওলানা একটি মাদ্রাসায় শিকতা করছেন।

এখান থেকে তদন্ত টিম যান রেলওয়ের লোকেশেড-এ। এখানে পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকাররা প্রায় ৫০ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে।

শামসুল হক নামে শহীদ পরিবারের একজন সদস্য জানান, তার বাবা আখের উদ্দিন আহমেদকে লোকেশেডে জবাই করে হত্যা করা হয়।

এলাহী পরামানিক নামে আরেকজন জানান, তার বাবা হারেজউদ্দিন পরামানিককেও এখানে জবাই করে হত্যা করা হয়।

শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানান, এখানে হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্বে ছিল মাওলানা আব্দুস সোবহান।

তারা আরও জানান, জামায়াত আমীর মতিউর রহমান নিজামীর দু’দিন পরপর এসে নির্দেশনা দিয়ে যেতেন কাকে কাকে হত্যা করা হবে। মূলত নিজামীর প্রত্য নেতৃত্বে ও মদদে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।  

তদন্ত দলের নেতৃত্বে আছেন প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান। অন্য সদস্যরা হলেন, প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী, আব্দুর রহমান হাওলাদার, আলতাফ উদ্দিন ও তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক খান।

বাংলাদেশ সময়: ১৬৫৫ ঘণ্টা, নভেম্বর ০৫, ২০১০

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2010-11-05 01:46:37