ঢাকা, রবিবার, ১০ চৈত্র ১৪২৫, ২৪ মার্চ ২০১৯
bangla news

৭১ এর আজকের দিনে কমলগঞ্জ সীমান্তে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, পাঠ্যপুস্তকে লেখা ‘শ্রীমঙ্গল’

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১০-১০-২৮ ১:১৯:১৭ এএম

আজ বৃহস্পতিবার (২৮ অক্টোবর) বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমানের ৩৯তম শাহাদাত বার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিন ভোর রাতে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের ধলই সীমান্তে পাকি (পাকিস্তানি) হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন তিনি।

ঝিনাইদহ ও কমলগঞ্জ থেকে: আজ বৃহস্পতিবার (২৮ অক্টোবর) বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমানের ৩৯তম শাহাদাত বার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিন ভোর রাতে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের ধলই সীমান্তে পাকি (পাকিস্তানি) হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন তিনি।

প্রিয় মাতৃভূমির জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসাবে জাতি এই শহীদকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে সন্মানিত করেছে। কমলগঞ্জের ধলই সীমান্তে এ বীরের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধের সামনে এসে শ্রদ্ধাবনত হয়ে পড়েন যে কোনও দেশপ্রেমিক।

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সিপাহী হামিদুর রহমান।
 
তার ভাই ফজলুর রহমান জানান, ১৯৪৫ সালে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ভারতের ২৪ পরগোনা জেলার চাপড়া থানার ডুমুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর হামিদের পিতা আক্কাচ আলী মণ্ডল ও মাতা কায়ছুন নেছা ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কোর্দ্দখালিশপুর গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রয়ারি যুবক হামিদুর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে ভর্তি হন।

এরপর মাতৃভূমিকে হানাদার মুক্ত করতে বঙ্গবন্ধুম শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে আরও হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার মত সেনা সদস্য হামিদও ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীনতা যুদ্ধে।

১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর হামিদ মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই রণাঙ্গনে পাকি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে জানা যায়, সেদিন ভোর রাতে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাকি সেনাদের ওপর চতুর্দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। বাংলার অমিত তেজী দামাল ছেলেদের অব্যর্থ আক্রমণে পাকি সেনাদের ক্যাম্পে আগুন ধরে যায়।

এসময় প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ ও পাকিবাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন বিষ্ফোরণে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হন। চরম এ সংকট মূহুর্তে সিপাহী হামিদুর রহমান মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যেও হামাগুড়ি দিয়ে শত্র“ অবস্থানের ৫০ গজের মধ্যে ঢুকে পড়েন। গর্জে উঠে তার হাতের লাইট মেশিনগান(এলএমজি)। তাঁর এ অচিন্ত্যনীয় দুঃসাহসিক তৎপরতায় শত্র“দলের অধিনায়কসহ বেশ কয়েকজন হানাদার মূহুর্তেই প্রাণ হারায়। কিন্তু হঠাৎ শত্র“দের একটি বুলেট কপালে বিদ্ধ হয় তার। কিছুণের মধ্যে কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তের তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্পের (বর্তমান বিডিআর ফাঁড়ি) সামনের মাটি দেশপ্রেমিক শ্রেষ্ঠ এক সন্তানের তাজা রক্তে লাল হয়ে যায়। মৃত্যুর  কোলে ঢলে পড়েন সিপাহী হামিদুর রহমান।

ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসা গ্রামের একটি মসজিদের পাশে সে সময় বাঙালি জাতির গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমানকে দাফন করা হয়। ৩৬ বছর পর ২০০৭ সালের ১১ ডিসেম্বর তাঁর দেহাবশেষ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে ঢাকায় এনে শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ দিন পর ১৯৯২ সালে বিডিআরের উদ্যোগে সর্বপ্রথম কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই সীমান্ত চৌকির পাশে নির্মাণ করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিফলক। ২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ১০ শতাংশ জায়গার ওপর সাড়ে ১৪ ল টাকা ব্যয়ে গণপূর্ত বিভাগ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্ম্মাণ করে। একই সঙ্গে কমলগঞ্জ পৌরসভার ভানুগাছ- মাধবপুর সড়কটিকে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়।

তবে জাতীয় শিাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড অনুমোদিত চতুর্থ শ্রেণীর ‘আমার বাংলা বই’ এর ৭১নং পৃষ্ঠায় ছাপা ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান’ পাঠের প্রথম অংশে উল্লেখ করা হয়েছে হামিদুরের শহীদ হওয়ার স্থান ‘সিলেটের সীমান্ত এলাকা’। বাস্তবে ধলই সীমান্ত মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার অধীন।

কিন্তু এই ভুল সংশোধন করার ব্যাপারে সরকারীভাবে এখনও কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের অনেক সহযোদ্ধা এখনও বেঁচে আছেন। কমলগঞ্জের বাসিন্দা এসব মুক্তিযোদ্ধা  বলেন, এখন নতুন পাঠ্য পুস্তক মুদ্রণের কাজ চলছে। যদি এখনই এই ভুল সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয় তাহলে ২০১১ সালের পাঠ্যপুস্তকে সঠিক তথ্য জানতে পারবে নতুন প্রজন্ম।

এ ব্যাপারে উপজেলা  প্রাথমিক শিা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বাংলানিউজকে বলেন, উপজেলা শিা অফিস ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর জাতীয় শিাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড সচিব বরাবর চতুর্থ শ্রেণীর বইয়ে হামিদুর রহমান পাঠে শ্রীমঙ্গলের স্থলে কমলগঞ্জ উল্লেখ করার জন্য লিখিতভাবে চিঠি দেওয়ার পরও এ ভ্যাপারে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এদিকে আজকের দিনে বীর বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে তার গ্রামের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরন করে থাকেন। মানুষের ফুলেল শুভেচ্ছা আর ভালবাসায় সিক্ত হবে সেখানে স্থাপিত বীরের প্রতিকৃতি।
 
অপরদিকে সরকার বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে তার নিজ গ্রাম কোর্দ্দখালিশপুরকে হামিদনগর নামকরণ করলেও তা আজো গেজেট আকার প্রকাশ করা হয়নি। তবে হামিদুর রহমানের নামে তার এলাকায় প্রতিষ্ঠিত কলেজটি এমপিও ভুক্তিসহ কলেজ মাঠে ৫৭ লাখ টাকা ব্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি যাদুঘর কাম লাইব্রেরী।

খালিশপুর হামিদুর রহমান কলেজের অধ্য রফিউদ্দীন জানান, দিবসটি পালনে সরকারী কোনও কর্মসুচি না থাকলেও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান কলেজের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও মিলাদ মহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

অপরদিকে দিনটিকে কমলগঞ্জে যথাযথভাবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সকাল ১১টায় কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, বিডিআর, কমলগঞ্জ প্রেসকাবসহ স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন শহীদের প্রথম মাজারে পুষ্পমাল্য অর্পণ, আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিলসহ নানা কর্মসূচী পালন করবে।
 
বাংলাদেশ সময়: ১১১৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ২৮, ২০১০

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14