ঢাকা, রবিবার, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২৬ মে ২০২৪, ১৭ জিলকদ ১৪৪৫

জাতীয়

ইউটিউবে ভিডিও দেখে এটিএম বুথ লুটের পরিকল্পনা করে আরিফুল

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৪৩০ ঘণ্টা, এপ্রিল ২২, ২০২৪
ইউটিউবে ভিডিও দেখে এটিএম বুথ লুটের পরিকল্পনা করে আরিফুল গ্রেপ্তার আরিফুল

ঢাকা: ইউটিউবে ভিডিও দেখে এটিএম বুথ ভেঙে টাকা লুট করার পরিকল্পনা করে মো. আরিফুল ইসলাম (২৭)। আর সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গুলশান থানাধীন শাহজাদপুর প্রগতি সরণির মাইশা চৌধুরী টাওয়ারে অবস্থিত মধুমতি ব্যাংকের এটিএম বুথের সিকিউরিটি গার্ডকে হত্যা করে সে।

এরপর এটিএম বুথের ভেতরে থাকা টাকা বের করতে সরঞ্জামাদি দিয়ে চেষ্টা করেও ভাঙতে পারেনি। পরে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

এ ঘটনায় মামলার প্রেক্ষিতে ঘটনার চারদিন পর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত করে শাহজাদপুরের কালাচাঁদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা (ডিবি) বিভাগের গুলশান বিভাগের গুলশান জোনাল টিম। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতি, এটিএম বুথ ভাঙার কাজে ব্যবহৃত হাতুড়ি, ছেনি, শাবল বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার করা হয়।

সোমবার (২২ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।  

তিনি বলেন, গত ১০ এপ্রিল ভোর অনুমান ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে গুলশান থানাধীন শাহজাদপুর প্রগতি সরণির মাইশা চৌধুরী টাওয়ারে অবস্থিত মধুমতি ব্যাংকের এটিএম বুথে কর্মরত সিকিউরিটি গার্ড হাসান মাহমুদকে (৬০) কুপিয়ে হত্যা করে অজ্ঞাত আসামিরা। পরে নিহতের ভাই মাহফুজুর রহমান রুমেল গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।  

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের জন্য থানা পুলিশ, সিআইডি এবং অন্যান্য সংস্থার পাশাপাশি ডিবি গুলশান জোনাল টিম মামলাটির ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তকালীন তথ্য প্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ, আসামির ব্যবহৃত মোবাইল ও পরিহিত পোশাক এবং গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে হত্যাকারী শনাক্ত করা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে আসামি আরিফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গত ১০-১২ বৎসর ধরে বিভিন্ন অফিস ও বাসা বাড়ির আসবাবপত্র পরিবহনের কাজ করত। ২-৩ বছর আগে সে তার বন্ধু বান্ধবের পরামর্শে ওই ব্যবসার পাশাপাশি ইট, বালি, পাথর সরবরাহের ব্যবসা শুরু করে। ব্যবসায় লোকসান হওয়ার কারণে সে ১৪-১৫ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সে তার একটি কিডনি বিক্রির চেষ্টা করে মিরপুর এলাকায় লিফলেট ছাড়ে। কিন্তু কিডনি বিক্রি করতে না পারায় এবং পাওনাদারদের দেনা পরিশোধ করতে না পারায় পাওনাদাররা তার বাসায় গিয়ে তাকে খুঁজতে থাকে। পাওনাদারদের চাপে ও ভয়ে সে গত ৩-৪ মাস ধরে পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাজধানীর মিরপুর-১ সহ বিভিন্ন জায়গায় আত্নগোপন করে থাকে এবং কীভাবে টাকা পরিশোধ করা যাবে সে চিন্তা ভাবনা ও পরিকল্পনা করতে থাকে এবং সে ধারাবাহিকতায় সে এটিএম বুথ লুট করার উদ্দেশে অত্যন্ত পাশবিক কায়দায় নির্মমভাবে বুথের সিকিউরিটি গার্ডকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে গলায় কুপিয়ে হত্যা করে।

যেভাবে এটিএম বুথ লুটের পরিকল্পনা করে হাসান

হারুন-অর-রশীদ বলেন, ইউটিউবের মাধ্যমে ব্যাংক/এটিম বুথ ডাকাতির দৃশ্য দেখতে পেয়ে খুন করে হলেও এটিম বুথের টাকা লুট করার পরিকল্পনা করে আরিফুল। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীন বাংলা সুপার মার্কেট থেকে আসামি হাতুড়ি, ছেনি, মিরপুর পল্লবী মিল্লাত ক্যাম্প মোড় থেকে চাপাতি, শাবল, চাকু ও মিরপুরপুর স্টেডিয়ামের ফুটপাত থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের একটি জার্সি ক্রয় করে এবং লোক সমাগম কম/নিরিবিলি এমন এটিএম বুথের অবস্থান খুঁজতে থাকে। গুলশান থানাধীন শাহজাদপুর, ৩০/বি, মাইশা চৌধুরী টাওয়ার, মধুমতি ব্যাংক, প্রগতী সরণি শাখার এটিএম বুথ লোক সমাগম কম/নিরিবিলি মনে হওয়ায় সে ওই এটিএম বুথ লুটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।  

ঘটনাস্থল রেকি করে যেভাবে

হারুণ-অর-রশীদ বলেন, আরিফুল ইসলাম গত ১০ এপ্রিল ২০১৪  থাই ইন্টারন্যাশনাল লেখা নীল রঙের একটি ব্যাগে করে চাপাতি, এটিএম বুথ ভাঙার কাজে ব্যবহৃত হাতুড়ি, ছেনি, শাবলসহ বিভিন্ন মালামাল পুমা  ব্র্যান্ডের জলপাই রঙের টি-শার্ট পরিধান করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাঘুরি করে রাত ১২ টা ২০ মিনিটে তুরাগ বাস যোগে ঘটনাস্থলের বিপরীতে পাশে এসে ঘটনাস্থল রেকি করে। পরে রাস্তার ডিভাইডার পার হয়ে ঘটনাস্থলের সামনে দিয়ে পুনরায় রামপুরার দিকে যায়। আনুমানিক ৩টা ৪৯ মিনিটে তার পরিহিত পুমা ব্র্যান্ডের জলপাই রঙের টি-শার্টের ওপরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জার্সি পরিধান করে পুনরায় ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘোরাঘুরি ও অবস্থান করতে থাকে। প্রায় দেড়ঘন্টা ধরে পর্যবেক্ষণ করে সে আনুমানিক ৫টা ১৩ মিনিটে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করাকালীন এটিএম বুথের নিরাপত্তা কর্মী ভুক্তভোগী হাসান মাহমুদের বাধার সম্মুখীন হওয়ায় সে তাকে (ভুক্তভোগী) চাপাতি দিয়ে গলায় কুপিয়ে হত্যা করে হাতুড়ি, হেমার, চেনি, শাবল, চাপাতি দিয়ে এটিম বুথ ভাঙার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে প্রায় ১০-১২ মিনিট চেষ্টা করে এটিএম বুথ ভাঙতে ব্যর্থ হয়ে সে ঘটনায় ব্যবহৃত হাতুড়ি, হেমার, ছেনি, শাবল, চাপাতি,  ব্যাগ ইত্যাদি ঘটনাস্থলে রেখে ছোট চাকু নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

ঘটনার পরপরই সে ঘটনাস্থল এর বিপরীতে শাহজাদপুর বাঁশতলায় অবস্থান করে এবং আনুমানিক ৫টা ৩১ মিনিটে মিরপুরগামী অছিম পরিবহন (ঢাকা মেট্রো-ব-১৩-১২৭৩) বাসে উঠে তার টি-শার্টের উপরে পরিহিত বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জার্সিটি খুলে ওই বাসের সিটের নিচে রেখে মিরপুরের দিকে চলে যায়। বাসের ড্রাইভার ও হেলপার জার্সিটি পেয়ে কালশী রাস্তার মাথায় ডিভাইডারের ওপর রেখে দেয়।  

তিনি বলেন, ঘটনার পরপরই মামলাটির ছায়া তদন্তকালীন ওই জার্সিটি বাসের ড্রাইভার ও হেলপারের দেখানো মতে কালশী রাস্তার মাথায় ডিভাইডারের উপর থেকে জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।  

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে হারুন-অর-রশীদ বলেন, হত্যাকাণ্ডের ৪ দিন পরই তদন্ত করে আসামি আরিফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পরে সে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্বীকার করে৷ সে ঋণে জর্জরিত হয়ে দীর্ঘদিন পরিবার ছাড়া ছিল। পরে ইউটিউবে এটিএম বুথ লুটের ভিডিও দেখে সে পরিকল্পনা করে।  

বাংলাদেশ সময়: ১৪৩০ ঘণ্টা, এপ্রিল ২২, ২০২৪
এসজেএ/জেএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।