ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ ফাল্গুন ১৪৩০, ০৫ মার্চ ২০২৪, ২৩ শাবান ১৪৪৫

জাতীয়

গ্রেপ্তারের তোয়াক্কা করে না পাচার চক্র, সীমান্তে থাকে ওঁৎ পেতে

মিরাজ মাহবুব ইফতি, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২৩৫৯ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৪
গ্রেপ্তারের তোয়াক্কা করে না পাচার চক্র, সীমান্তে থাকে ওঁৎ পেতে

ঢাকা: রজনী (ছদ্মনাম), গত শনিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে পাচার হতে যাচ্ছিলেন এ তরুণী। সুযোগ বুঝে কল করেন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে।

পরে আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে উদ্ধার করেন। তার সঙ্গে ছিলেন আরও দুই ভুক্তভোগী।

আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীগুলো বলছে, দেশে বিভিন্ন সময় দফায় দফায় অপহরণকারী ও মানব পাচারকারীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে। কিন্তু এরপরও চক্রের অন্যান্য সদস্যরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে এ অপকর্ম জারি রেখেছে। গ্রেপ্তারের তোয়াক্কা না করে চক্রগুলো সীমান্তের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ওঁৎ পেতে থাকে। এসব বিষয়ে অবশ্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সদস্যরা।

রজনীকে পাচারের চেষ্টার ঘটনাসহ বেশ কয়েকটি ঘটনা সাম্প্রতিক এক গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে। রজনীর বিষয়টি সম্পর্কে কথা হয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার সাত্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় এমন কল আসছে। সেগুলো আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখি।

তিনি জানান, রজনীসহ উদ্ধার তিন নারী রাজধানীর ডেমরায় তারা বসবাস করেন। মুন্নী নামে অপর এক নারীর মাধ্যমে তারা তিনজন গত ৭ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুর থানাধীন সীমান্তবর্তী যাদবপুর ইউনিয়নের জলুলী গ্রামে যান। সেখানকার একটি বাড়িতে তাদের তিনদিন বন্দি রাখা হয়। সুযোগ বুঝে রজনী ৯৯৯ নম্বরে কল করে তাদের উদ্ধার সহায়তার আহ্বান করেন। কোনো সময় ক্ষেপণ না করে তাদের উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা হয়।

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, পাচারকারীদের ফাঁদে কোনোভাবেই পা দেওয়া যাবে না। এসব বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশের সহযোগিতা নিতে হবে। তাহলেই এসব ঘটনা কমে আসবে। এর আগে, গত ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীর উত্তরা থেকে শেরপুর যাওয়ার পথে অপহরণ হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান হিমেল। এক মাস তাকে আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার হুমকি দিয়ে কয়েক কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করছিল একটি পাচার ও অপহরণ চক্র।

গত ২৪ জানুয়ারি আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী তৎপরতায় সুনামগঞ্জের তাহিপুরের দুর্গম পাহাড় থেকে হিমেলকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় অপহরণ চক্রের মূলহোতাসহ ১২জনকে।

হিমেল অপহরণের ঘটনায় তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, এ অপহরণের মূল পরিকল্পনায় ছিলেন তার ব্যক্তিগত গাড়ি চালক ছামিদুল ইসলাম। ছামিদুল যখন গাড়ি চালাতেন তখন তার ভেতরে লোভ জেগে ওঠে বাড়ি-গাড়ির। হিমেলের অনেক টাকা। তার মতো অর্থ হবে ভেবেই অপহরণের পরিকল্পনা সজ্জিত হয় ছামিদুলের মনে। শুধু এ দুটি ঘটনাই নয়, বিভিন্ন অপহরণ চক্রের সঙ্গে গাড়ি চালকদের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

আরেকটি ঘটনা সাতক্ষীরা জেলার। কলারোয়া থানা এলাকার ভারতীয় সীমান্তের জিরো পয়েন্ট লাগোয়া গ্রাম কেরাগাছি। এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হামিদ। তার দুই ছেলে আনারুল ও কবির হোসেনের নেতৃত্বে একটি মানব পাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরে কিশোরী, তরুণী ও শিশুদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্ত দিয়ে পাচার করে আসছিল। চক্রের মাস্টারমাইন্ড আনারুল; তার অন্যতম সহযোগী আপন বড়ভাই কবির হোসেন।

আনারুল এলাকায় গরুর খামারের আড়ালে মানব পাচার চক্রটি চালিয়ে আসছিলেন। আর কবির গাড়িচালক বেশে চক্রের সংগ্রহ করা নারী ও শিশুদের পাচার করতেন। সম্প্রতি ওই সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কবির হোসেনকে। এরপরই বেরিয়ে আসে চাকরির বিজ্ঞাপনের আড়ালে তাদের অপহরণ ও মানব পাচার চক্রের গোপন পরিচয়। এই চক্রটি অন্তত দেড়শ জনের বেশি নারী ও শিশুকে পাচার করেছে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, অপরাধী চক্রগুলো বিদেশে নেওয়ার কথা বলে নানা ধরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতি বছর হাজারো নারী ও শিশুদের বাংলাদেশ থেকে পাচার করছে। তারা সীমান্তের পার্শ্ববর্তী দেশকে কাজে লাগিয়ে এসব অপরাধ করছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সীমান্তের পার্শ্ববর্তী দেশের দালাল চক্র। এ ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কিছু গাফিলতিও রয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একটি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ‘আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতির’ বিষয়টি অস্বীকার করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা সব ধরনের অবৈধ কাজ বন্ধের জন্য কাজ করছি। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে থাকি। তাছাড়া মানব পাচারের প্রবণতা অনেক কমে গেছে‌। হয়তো বর্তমানে সীমান্তের পার্শ্ববর্তী এলাকায় কিছু সমস্যার কারণে এটার আলোচনা বেশি হচ্ছে।

আরেকটি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ ও মানব পাচারের চাঞ্চল্যকর কয়েকটি ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালে পার্শ্ববর্তী সীমান্ত দিয়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষকে অপহরণ ও পাচার করা হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৫০ শতাধিক ব্যক্তিকে পার্শ্ববর্তী সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয়েছে।  

গোয়েন্দারা বলছেন, যশোর সীমান্ত, টাঙ্গুয়ার হাওর, কলমাকান্তা, দূর্গাপুর, মেঘালয়, মিয়ানমার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, শাহপরীর দ্বীপ, দমদমিয়া, লেদা, রঙ্গিখালী, উলুচামারী, মৌলভীবাজার, নোয়াখালীয়াপাড়া, শাপলাপুর, সাতঘরিয়াপাড়া, উখিয়াসহ প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি পয়েন্ট ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। এসব সীমান্ত এলাকাগুলোয় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে। এসব সীমান্তে অপহরণকারী ও চোরাকারবারিদের নিয়মিত যাতায়াত হচ্ছে। তাদের সহায়তা করছে ব্যক্তিগত গাড়ির চালক ও অন্যান্য কাছের লোকজন। ঘর কিংবা সীমান্ত তো বটেই অনলাইনেও নিজেদের অপকর্ম পরিচালনা করছে অপহরণ ও মানব পাচারকারীরা।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, সহজে কোনো ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করা যায় না। কাছের লোকজন এটা পারে। যখন কোনো বড়লোকের সন্তান বা পরিবারের সন্তানকে অপহরণ করতে চায় তখন তারা গাড়ি চালকদের ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে।

এ সময় অপহরণের ঘটনায় ভুক্তভোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান হিমেলের উদাহরণ টানেন তিনি। ডিবি প্রধান হারুন বলেন, হিমেলের ক্ষেত্রেও অপহরণ চক্রটি গাড়ি চালক সামিদুলকে টার্গেট করেছিল। আর সামিদুলেরও টার্গেট ছিল বড় লোক হওয়ার। তাই তারা সহজে তাকে ব্যবহার করতে পেরেছে।

ডিবি প্রধান আরও বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর, কলমাকান্তা, দূর্গাপুর, মেঘালয়ের মতো এলাকায় আমরা যেতে পারি না। কিন্তু সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য এসব জায়গাগুলোতেই গড়ে উঠেছে। চোরাকারবারিদের নিয়মিত যাতায়াত হচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এখানে দুই দেশের সিম কার্ড অবাধে বিক্রি হয়। এছাড়া বিভিন্ন পণ্য অবাধে ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। এসব অঞ্চলে আমরা এখন নিয়মিত নজর রাখছি। যারা বর্ডার এলাকায় কাজ করছে তাদেরও সতর্ক থেকে কাজ করতে আহ্বান জানান তিনি।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলানিউজকে বলেন, এ ধরনের অপরাধীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি- কেউ কেউ গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করেন, কেউ দোকানের কর্মচারী, কেউ আবার কোনো ব্যক্তির গাড়ি চালকের পেশার আড়ালে এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। অপরাধীরা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেই অপরাধ করে। তাই কাউকে বিশ্বাস করার আগে তার সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করতে হবে।

ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে তিনিও বলেন, কাছের লোক, বাসার নিরাপত্তাকর্মীদেরও এসব কাজে সংশ্লিষ্টতা থাকে। হিমেলসহ যারা অপরহণ হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রেও এমনটা জানা গেছে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছে।

এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের সঙ্গে। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের কাছের লোকজন অনেক সময় বেইমানি করে। যে কারণে মানুষের প্রতি মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। হিমেলের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমন হয়েছে। তার ব্যক্তিগত গাড়ি চালক সামিদুল যে ঘটনাটি ঘটিয়েছে, সেটা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না।

তিনি বলেন, সম্প্রতি আমাদের দেশের সীমান্তে কিছু অস্থিরতা দেখা গেছে। ঠিক এই সময়ে অপহরণকারী ও পাচারকারীরা ওঁৎ পেতে আছে। তারা যেকোনো সময় কাউকে টার্গেট করে নিতে পারে। তাই আমাদের আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সবগুলো ইউনিটকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে। অপহরণ ও পাচারকারীদের ফাঁদে যাতে কেউ পা না দেয় সে জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে এ অপকাণ্ড রোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ সময়: ২৩৫৯ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৪
এমএমআই/এমজে

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।