ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০, ০১ মার্চ ২০২৪, ১৯ শাবান ১৪৪৫

জাতীয়

পুরোনো প্রযুক্তির ইকুইপমেন্ট দিয়ে ফাইভ-জি প্রকল্প বাতিলের দাবি

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০০১৪ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩, ২০২৩
পুরোনো প্রযুক্তির ইকুইপমেন্ট দিয়ে ফাইভ-জি প্রকল্প বাতিলের দাবি

ঢাকা: পুরোনো প্রযুক্তির ইকুইপমেন্ট দিয়ে ফাইভ-জি বাস্তবায়ন করা সম্ভব না জানিয়ে অনিয়ম ও প্রকল্প এ বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন।

শনিবার (০২ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ।

মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন বাজার বিশ্লেষক ও ভোক্তা প্রতিনিধি কাজী আব্দুল হান্নান, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরামের সভাপতি কবীর চৌধুরী তন্ময়, জাতীয় তরুণ সংঘের সভাপতি ফজলুল হক, গ্রীণ পার্টির সভাপতি রাজু আহমেদ খান, সংগঠনের কেন্দ্রীয় সদস্য এড. শাহেদা বেগম, ডা. আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।

বাজার বিশ্লেষক ও ভোক্তা প্রতিনিধি কাজী আব্দুল হান্নান বলেন, যে সি ব্যান্ড ইকুইপমেন্ট দিয়ে ডিডাব্লিউডিএম কিনতে যাচ্ছে বিটিসিএল তা বিটিসিএল ক্রয় করেছে ২০১৬ সালে। আর তখন বিবেচনায় ছিল থ্রিজি। বর্তমানে ফাইভ-জি বিবেচনায় নিয়ে কোনভাবেই সি ব্যান্ড কিনতে পারে না। সি ব্যান্ড এর ডিডাব্লিউডিএম নেটওয়ার্ক বর্তমানে বিটিসিএলে থাকতে আরেকটা সেইম টেরনোলজির ডিডাব্লিউডিএম কেনা শুধুই সরকারের আর্থিক অপচয়।

মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলার জন্য চাই দ্রুতগতির ফাইভ-জি। যেই প্রকল্প জনগণের অর্থে করা হচ্ছে সেই প্রকল্প দিয়ে যদি ফাইভ-জি না চলে তাহলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ২০১৬ সালে জনগণের পকেট থেকে যে ইকুইপমেন্ট কেনা হয়েছে সেই ইকুইপমেন্ট ব্যবহারের জন্য আবার জনগণের পকেট থেকে অর্থ নিয়ে কেউ লুটপাট করবে তা আমরা কোনভাবেই হতে দিতে পারি না।

প্রকল্পের সার্বিক ত্রুটির দিক তুলে তিনি আরও বলেন, বিটিসিএল জানুয়ারি ২০২২ হতে ডিসেম্বর ২০২৪ মেয়াদে সমগ্র দেশে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা থাকলেও এখনও ভেন্ডর নিয়োগ দিতে পারেনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। অথচ প্রকল্পের হয় শুরুতেই ইকুইপমেন্ট ক্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। যা দেশের শীর্ষ স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেরা লাভবানের উদ্দেশ্যে কমদামি ইকুইপমেন্ট ক্রয়সহ কারিগরি বিনির্দেশ সঠিকভাবে প্রস্তুত না করায় এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে যাচ্ছে এবং বরাদ্দকৃত টাকা লুটপাট হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। যেহেতু এই প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশব্যপী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ট্রান্সমিশন নেরওয়ার্ক স্থাপন করা হবে তাই কাজের ব্যাপকতা বিবেচনায় কাজের মান রক্ষার্থে সার্ভে, ডিজাইন, সুপারভিশন ও মনিটরিং কাজের জন্য ডিপিপিতে পরামর্শকের প্রস্তাব করা হয়েছে এবং পাঁচ জন অভিজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমেই প্রকল্পের নেটওয়ার্ক এর জন্য সার্ভে, নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার, কারগরি বিনির্দেশ প্রস্তুতসহ আনুষাঙ্গিক বিষয়ে কাজ করানোর কথা। পরামর্শক নিয়োগ না করে তাড়াহুড়া করে একটি বিশেষ কোম্পানির প্রস্তুত করা নিম্নমানের ও পুরানো প্রযুক্তি দিয়ে কারিগরি বিনির্দেশ দিয়ে দরপত্র আহ্বান করেছেন।

এক্ষেত্রে নিয়মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দরপত্র আহ্বান করার আগে প্রকল্প পরিচালক পাঁচজন পরামর্শক নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমেই প্রকল্পের নেটওয়ার্ক এর জন্য সার্ভে, নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার, কারগরি বিনির্দেশ প্রস্তুত করে তা উপস্থাপন করলে বিটিসিএল এর সংস্থা প্রদান একটি কমিটি করে কমিটির প্রতিবেদন এর প্রেক্ষিতে বিটিসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তা অনুমোদন করেন। তবে এই কমিটি কোন সার্ভে বা নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার ডিজাইন করেননি। এই কমিটিও যদি সার্ভে করতেন তাহলেও সমস্যা হতো না। আবার প্রকল্প পরিচালক বুয়েট এর সমীক্ষা রিপোর্টকে এখানে রক্ষা কবচ বানানোর চেষ্টা করতে চাচ্ছেন। তিনি বলার চেষ্টা করছেন যে, বুয়েট এর সমীক্ষা রিপোর্ট এর উপর ভিত্তি করে তিনি কারিগরি বিনির্দেশ প্রস্তুত করেছেন। বুয়েট তাদের সমীক্ষা রিপোর্টে প্রদান করেছেন ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল। পরবর্তী সময়ে যখন পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় কয়েকটা বিষয়ের ব্যাখ্যা বুয়েট এর কাছে চাওয়া হলে বুয়েট ওই বছরের ৯ অক্টোবর বিটিসিএল বরাবর একটি লিখিত ব্যাখ্যা পাঠায়; যাহা ডিপিপি’র ৪৩ পাতায় আছে। সেখানে বুয়েট উল্লেখ করে যে, ডিপিপি প্রণয়নের প্রাক্কালে বুয়েট সার্ভে করার সময় বিটিসিএল এরজেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিটিসিএল এর ব্যান্ডউইথ এর বর্তমান চাহিদা এবং গত কয়েক বছর কিভাবে এই চাহিদা বেড়েছে এ সম্পর্কে বিটিসিএল এর কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই ধরণের কোন তথ্য বিটিসিএল সরবরাহ করতে পারেনি। তাই এক্ষেত্রে প্রাপ্ত চাহিদা ও ঐ এলাকার প্রকৃত চাহিদার মধ্যে পার্থক্য থাকায় দরপত্র প্রস্তুতের পূর্বে পরামর্শকদের মাধ্যমে সার্ভে করলে সঠিক চাহিদা নিরুপণ করা যেত এবং ২০৩০ সালের জন্য যুগোপযোগী ত্রুটিহীন ইকুইপমেন্ট কেনা সম্ভব হতো।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই বিটিসিএল কর্তৃক সারাদেশে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা প্রদানের জন্য অপটিক্যাল ফাইবারলাইন বসানো হয়েছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেটের চাহিদাপূরণে আমাদের বর্তমান অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। তাই সরকার ফাইভ-জির উপযোগী করণে অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশননেটওয়ার্ক নামক প্রকল্প হাতে নেয়, যার আওতায় ২০৩০ সালনাগাদ দেশের ইন্টারনেট চাহিদা মেটানোর উপযোগী অবকাঠামো তৈরি করা হবে।

বুয়েট কর্তৃক বিটিসিএলে প্রদত্ত ২০২১ সালের ৯ অক্টোবর রিপোর্টের চতুর্থ পাতায় ২০২১ সাল পর্যন্ত বিটিসিএলের ট্রান্সমিশন ক্যাপাসিটি ৭৭০ জিবিপিএস। তখন বিটিসিএল যে ডিডাব্লিউডিএম ক্রয় করে তা কেনা হয় ২০১৫ সালে এবং বিবেচনায় ছিল থ্রিজি। আবার বুয়েট এর একই রিপোর্টে আছে ২০৩০ সালে বিটিসিএলের ট্রান্সমিশন ক্যাপাসিটি লাগবে ৫৩৭০ জিবিপিএস এর। যদিও বিটিআরসির গত বছরের ১ আগস্ট প্রক্ষেপণ পত্র মোতাবেক বিটিসিএল এর ট্রান্সমিশন ক্যাপাসিটি লাগবে ৯০০০ জিবিপিএস এর। আর বর্তমানে বিবেচনায় নিতে হবে ফাইভজি।

তিনি আরও বলেন, এখন আমরা যদি পুনরায় আবার একই ব্যান্ডের ইকুইপমেন্ট ক্রয় করলে এখানে রাষ্ট্রের টাকার অপচয় হবে এবং প্রকল্প কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে নিম্নমানের পুরোনো প্রযুক্তি দিয়ে ২০৩০ সালে দেশের ফাইভ-জি অবকাঠামো ভেঙ্গে পড়ার সম্ভাবনা আছে। আর তখন দেশের সামাজিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সারাদেশ তো দূরের কথা; ঢাকার গুলশানেও তখন ২০৩০ সালে এইসব পুরোনো প্রযুক্তি দিয়ে এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইন্টারনেট সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হবে না।

বক্তারা বলেন, আগামী দিনে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই প্রকল্প বাতিল করে আগামীতে নতুন সরকার গঠনের পর বিশেষজ্ঞ কমিটি ও স্টেক হোল্ডারদের পরামর্শ এবং বিধি মোতাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করার অনুরোধ করেন।

বাংলাদেশ সময়: ০০১৩ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০৩, ২০২৩
এমআইএইচ/জেএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।