ঢাকা, সোমবার, ২ বৈশাখ ১৪৩১, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৫ শাওয়াল ১৪৪৫

জাতীয়

বিয়ের নামে প্রতারণায় নিঃস্ব প্রবাসী

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৫৫০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৯, ২০২২
বিয়ের নামে প্রতারণায় নিঃস্ব প্রবাসী

লালমনিরহাট: বিয়ের নামে প্রবাসীর ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে লালমনিরহাটের এক মাদরাসা শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। সোমবার (১৯ ডিসেম্বর) দুপুরে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন নিঃস্ব প্রবাসী কামরুজ্জামান।

ভুক্তভোগী কামরুজ্জামান আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বারঘড়িয়া গ্রামের মনির উদ্দিনের ছেলে। বর্তমানে আদিতমারী টিএন্ডটি পাড়ার বাসিন্দা। তিনি লিবিয়া প্রবাসী।

অভিযোগে জানা গেছে, জীবন গড়তে লিবিয়ায় পাড়ি জমান কামরুজ্জামান। ৫ বছর কাজ শেষে দেশে ফেরেন তিনি। একই উপজেলার সারপুকুর এগার মাথা এলাকার কলেজ পড়ুয়া আলেমা খাতুনকে গত ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারী বিয়ে করেন। স্বপ্ন পূরণে স্ত্রীকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও বিএড শেষ করান। এরই মাঝে তাদের সংসারে আব্দুল্লাহ বিন জামান নামে এক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। লালমনিরহাট নেছারীয়া মাদরাসার এবতেদায়ী শাখার সহকারী শিক্ষক পদে চাকুরীও নিয়ে দেন স্ত্রীকে। চাকরির পরে আচরণ পাল্টে ফেলেন আলেমা খাতুন।

নিজের নামে বাড়ি গাড়ি ও জমি রেজিস্ট্রির দাবি জানান। বৃদ্ধা শ্বাশুড়িকে বাড়ি থেকে সড়াতে বলেন। কিন্তু মাকে ছাড়তে রাজি না হওয়ায় কোলের সন্তান ফেলে প্রবাসী কামরুজ্জামানকে ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী তালাক প্রদান করেন আলেমা খাতুন। এরপর একমাত্র ছেলে সন্তানকে নিয়ে বড় একা হয়ে পড়েন প্রবাসী কামরুজ্জামান। ৫ বছরের সন্তানকে নিয়ে ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা শুরু করেন।

দীর্ঘ দেড় বছর মাদরাসার পাশে বিভিন্ন বাসায় ভাড়া থেকে চাকুরী চালিয়ে যান সহকারী শিক্ষক আলেমা খাতুন। এরপর নতুন কৌশল শুরু করেন। পুনরায় কামরুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করে বিয়ের প্রলোভন দেন। ৫ বছরের সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আলেমার প্রতারণার ফাঁদে পা দেন প্রবাসী কামরুজ্জামান।

গত ২০২১ সালের ১৬ আগস্ট আলেমা খাতুন তার মাদরাসার শিক্ষক ও নিকট আত্নীয় সাপ্টিবাড়ি ইউনিয়ন নিকাহ রেজিস্টার কাজী ফয়সাল আহমেদের বাসায় কামরুজ্জামানকে ডেকেন নেন। পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে নতুন করে বিবাহ রেজিস্ট্রি বহিতে এবং একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করেন তারা। এরপর ওই নিকাহ রেজিস্টারের বাসায় ছেলে সন্তানকে নিয়ে মাসিক দুই হাজার টাকায় ভাড়া থাকা শুরু করেন তারা।

ভালোবাসা দেখিয়ে স্বামীর কাছে পুনরায় গহণা কিনে নেন আলেমা খাতুন। এরপর স্বামী কামরুজ্জামানকে ব্যাংকে চাকুরী নিয়ে দেয়ার কথা বলে ৫ লাখ টাকাও গ্রহণ করেন তিনি। এর ৩ মাস পরে আবারও ছেলেকে তার বাবার গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে ভাড়া বাসার সকল আসবাবপত্র নিয়ে পালিয়ে যান আলেমা খাতুন। এরপর মাদরাসায় দেখা করতে গেলে স্বামীকে গালমন্দ করে তাড়িয়ে দেন।

খোঁজ খবর নিয়ে স্বামী কামরুজ্জমান জানতে পারেন পুনরায় করা বিয়ের তালাক না দিয়ে লালমনিরহাট পূবালি ব্যাংকের কর্মচারী রেজাউল ইসলামকে বিয়ে করে সংসার শুরু করেছেন তার স্ত্রী আলেমা খাতুন। তবে আলেমা খাতুন ও তার নতুন স্বামীর সাথে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে গিয়েও স্বাক্ষাত করতে পারেননি।

দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামা উঠাতে গেলে নিকাহ রেজিস্টার কাজী ফয়সাল এফিডেভিটের ফটোকপি দিয়ে বিদায় করেন। তখন তিনি বুঝতে পারেন টাকা হাতিয়ে নিতে নিকাহ রেজিস্টার ফয়সাল, ব্যাংকের কর্মচারী রেজাউলসহ পরিকল্পনা করে তার স্ত্রী আলেমা তার সাথে প্রতারণা করেছেন।

এ ঘটনায় সোমবার (১৯ ডিসেম্বর) জেলা প্রশাসক বরাবরে নিকাহ রেজিস্টার কাজী ফয়সাল আহমেদ, আলেমা ও তার প্রেমিক (বর্তমান স্বামী) রেজাউলের বিরুদ্ধে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেয়া অভিযোগ দায়ে করেন।

ভুক্তভোগী কামরুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, স্ত্রীকে শিক্ষিত করে চাকরি নিয়ে দিলে সন্তানসহ পরিবার ভাল চলবে। এ স্বপ্নে অনেক কষ্টে তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। কিন্তু স্ত্রী আমার সর্বস্ব লুট করে আমাকে সন্তানসহ পথে বসাবে ভাবতে পারিনি। কাজী ফয়সাল ও ব্যাংক কর্মচারী রেজাউলের পরিকল্পনায় তারা আমাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে পথে বসিয়েছে। তিনি ন্যায় বিচার দাবি করেন।

আলেমার খবর নিতে কর্মস্থল ও তার ভাড়া বাসায় গিয়েও স্বাক্ষাত করা সম্ভব হয়নি। তবে তার স্বামী দাবি করে পূবালি ব্যাংকের কর্মচারী রেজাউল বলেন, এর আগে আমারও দুই স্ত্রী ছিলেন। তাই সহকারী শিক্ষক তালাক প্রাপ্তা আলেমাকে জেনে শুনে বিয়ে করেছি। এখন যেসব ঝামেলা হচ্ছে এ সব করেছেন কাজী ফয়সাল। প্রতারণা করলে কাজী ফয়সাল করেছে। তবে বিয়ের বা তালাকের কোনো বৈধ কাগজ দেখাতে পারেননি তিনি।

সাপ্টিবাড়ি ইউনিয়ন নিকাহ রেজিস্টার ও রইসবাগ কেরামতিয়া দাখিল মাদরাসার সহকারী শিক্ষক কাজী ফয়সাল আহমেদ বলেন, আলেমা আমার ছাত্রী ও কলিগ। আমার কাছে এসেছিল বাসা ভাড়া নিতে। তালাক প্রাপ্ত ছিলেন বলেই তারা আবার এফিডেভিট মূলে বিয়ে করেছেন। সেখানে দুই মাস থেকে না বলেই চলে গেছেন। তবে পুনরায় বিয়ের জন্য ভলিয়ম বহিতে স্বাক্ষর নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

আলেমার কর্মস্থল লালমনিরহাট নেছারীয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মোসলেম উদ্দিন বলেন, আলেমার মাথায় একটু সমস্যা আছে আমরা জানি। সে তার পূর্বের স্বামীকে তালাক দিয়েছে শুনেছি। পরবর্তিতে আবার বিয়ে করে মাদরাসার পাশের বাসায় ভাড়া থাকেন। তবে প্রথম স্বামীকে দ্বিতীয়বার বিয়ে এবং সংসার করার বিষয়টি গোপন রেখেছিল। এমনটা হলে তার বর্তমান বিয়েটা বৈধ নয়। আমরা অভিযোগটি পেয়েছি। চারিত্রিক স্থলনের বিষয়টি নিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৫৪৯ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৯, ২০২২
এসএম
 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।