ঢাকা, শুক্রবার, ৬ কার্তিক ১৪২৮, ২২ অক্টোবর ২০২১, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মনোকথা

মানসিক রোগ: সাদামাটা কথা

ডা. সৃজনী আহমেদ | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১১৫২ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৩
মানসিক রোগ: সাদামাটা কথা

শরীর এবং মনের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। বলা যায় একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত।

শারীরিক রোগের মতো মনেরও রয়েছে নানা রোগ। কখনো কখনো মিলিতভাবেও শারীরিক এবং মানসিক রোগ একই ব্যক্তির জীবনে যথেষ্ট খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। আবার কিছু শারীরিক রোগ মানসিক রোগ জিইয়ে রাখতে সাহায্য করে। কখনো আবার দেখা যায় শারীরিক বিভিন্ন উপসর্গ আসলে মানসিক কোনো রোগের লক্ষণ।

মানসিক রোগ সম্পর্কে এখনো সচেতন নই আমরা। রয়েছে যথেষ্ট পরিমান ভুল ধারণা, সেই সঙ্গে কুসংস্কার আর প্রচলিত অন্ধ বিশ্বাসতো আছেই।

প্রচলিত কিছু ধারণার বশবর্তী হয়ে মানসিক রোগ কে Stigmatized  বা খারাপভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলস্বরূপ মানসিক রোগের প্রতিরোধ কার্যক্রম, চিকিৎসা, গবেষণা প্রত্যেকটি ক্ষেত্র বাধার সম্মুখিন হচ্ছে। এ কারণেই মানসিক রোগ সম্পর্কিত ধারণার ব্যাপারে সাদামাটা কিছু কথা জেনে রাখা ভাল।

মোটা দাগে দেখলে মানসিক রোগকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটি ভাগ হচ্ছে Neurosis  যেখানে ব্যক্তির স্বাভাবিক আবেগগুলোই বেশি মাত্রায় প্রকাশিত হয় এবং তার স্বাভাবিক জীবনযাপনকে উল্লেখযোগ্য অথবা আশঙ্কাজনকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। আরেকটি ভাগ হচ্ছে Psychosis  যেখানে ব্যক্তির সঙ্গে বাস্তবজগতের দূরত্ব তৈরি হয় এবং তার আচার-আচরণে ব্যাপক মাত্রায় অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে রোগীর এমন কিছু বিশ্বাস, অনুভূতি জাগ্রত হয় যা তার সম্পর্কিত অন্য মানুষদের হয় না।

রোগের এ দুইটি ধরনই কষ্টকর। তবে উভয়েই চিকিৎসাযোগ্য। সাধারণত মানসিক রোগ বলতে দ্বিতীয় ভাগটিকেই আমরা চিন্তা করি। প্রথম ভাগটিতে যেহেতু বাস্তব অনুভূতিগুলোরই অতিমাত্রায় বহিঃপ্রকাশ, তাই ব্যক্তি নিজে এবং তার পরিবার –আত্মীয়-বন্ধু কেউই মানসিক রোগ হিসেবে সমস্যাগুলোকে মেনে নিতে পারেন না বা মেনে নিলেও যথাযথ চিকিৎসার ব্যাপারে খুব একটা আশাবাদী থাকেন না। অথচ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে মানসিক রোগীদের মোট পরিমাণের বেশির ভাগ অংশ এই neurotic রোগগুলোতে ভুগছেন।

বাংলাদেশে ২০০৬ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী Psychotic disorder এ ভুগছেন মোট মানসিক রোগীর শতকরা ১ দশমিক ১ ভাগ। Neurotic disorder এ ভুগছেন মানসিক রোগীদের ৮ দশমিক ৪ অংশ।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ভয় আমাদের একটা স্বাভাবিক অনুভূতি। বিবর্তনের ধারায় আমাদের বেঁচে থাকার অংশ হিসেবেই ভয় অনুভূতিটা সবার মধ্যেই কম বেশি বিদ্যমান। কিন্তু এই ভয়টা যদি হয়ে যায় অতিমাত্রায় এবং জীবনযাপনে যথেষ্ট বিঘ্ন ঘটায় তখন বিষয়টাকে একটা মানসিক সমস্যা Anxiety Disorder  এর তালিকায় বিবেচনা করা হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কারো উচ্চতা ভীতি এতটাই বেশি যে, কর্মক্ষেত্রের স্থান পরিবর্তন করে যদি অফিস এক তলা বা দুই তলা থেকে ১০ তলায় নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে হয়ত ৪০ বছর বয়সেও চাকরিটা ছেড়ে দিতে পিছপা হবেন না।

আবার সাময়িকভাবে বিষণ্ন হওয়া বা মন খারাপ করাও একটা স্বাভাবিক আবেগ। কিন্তু যখন বিষয়টা এমন পর্যায়ে যায় যে ব্যক্তি কোনো যথাযথ কারণ ছাড়া সারাদিন মন খারাপ করে থাকে, কাজকর্মে কোনো উৎসাহ পায় না, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, ওজনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে, খাওয়ার রুচি অস্বাভাবিক কম বা বেশি হয়ে যায়, ভুলে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, মনোযোগহীনতায় ভোগে, সামাজিক পরিবেশ এড়িয়ে চলে, অস্বাভাবিক অপরাধবোধ দেখা দেয়, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কেবলই হতাশাজনক চিন্তা আসে, মৃত্যুর ইচ্ছা আসে অথবা আত্মহত্যার পরিকল্পনা বা চেষ্টা করে। এই লক্ষণগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বা সবগুলো উপস্থিত থাকলে এবং তা নির্দিষ্ট সময় ধরে উপস্থিত থেকে ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ব্যাহত  করলে তখন তা  Major  Depressive Disorder কে নির্দেশ করবে।

এ সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে কার্যকরী চিকিৎসা রয়েছে। শ‍ুধু তাই নয়, এই দুইটি সমস্যার মতো এমন আরো অনেক সমস্যা আছে যেগুলো সমাধ‍ানের বিজ্ঞান সম্মত চিকিৎসা রয়েছে। সুতরাং সমস্যাগুলোকে ভুল ধারনার বশবর্তী হয়ে এড়িয়ে গেলে, বা ‘এগুলো নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যাবে’ ভেবে চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ করা থেকে বিরত থাকলে নিজের ক্ষতিই বেশি হবে। অনেক সময় এই সমস্যাগুলো কোনো শারীরিক রোগের লক্ষণও হতে পারে যা চিকিৎসকের কাছে প্রকাশ করা হলে যথাযথ রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।
 
আরেকটি বিষয় লক্ষনীয় যে, শরীর এবং মনের গভীর সম্পর্ক থাকায় বহু মানসিক রোগেরই শারীরিক লক্ষণ হিসেবে বহিঃপ্রকাশ ঘটে। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশের ক্ষেত্রে যেখানে আর্থ-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবে মনের সমস্যার চেয়ে শারীরিক সমস্যার প্রাধান্য বেশি সেখানে লক্ষণগুলোর শারীরিক বহিঃপ্রকাশ ঘটলে তা অন্যদের দৃষ্টিতে পড়ে।

যেমন স্কুল পড়ুয়া ১২ বছরের একজন কিশোর বা কিশোরী তার অভিজ্ঞতায় দেখে আসছে যে মাথাব্যথার কথা বললে পড়ালেখা থেকে সাময়িক ছুটি পাওয়া যায় বা তার মা-বাবা তার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী হন। পরবর্তীতে আরো বেশি বয়সে বড় ধরনের মানসিক চাপে বিপর্যস্ত হলে এই মাথা ব্যথার লক্ষণের মাধ্যমেই সেই ব্যক্তি মানসিক চাপ, হতাশা বা উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

বিষয়টির সহজবেধ্যতার জন্য আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, আমাদের সবারই হয়তো এই রকম অভিজ্ঞতা আছে যে ভীতিকর পরিস্থিতিতে গলা শুকিয়ে আসে বা তীব্র পানির পিপাসা লাগে, মাথার ভিতরটা ফাঁকা লাগে, মাথা ঘুরতে থাকার অনুভুতি হয়, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে, বুক ধড়ফড় করে বা হৃদস্পন্দন টের পাওয়া যায়, ঘাম হয়, মাংসপেশীর কাঁপুনি হয়, অজ্ঞান হয়ে আসার মতো অনুভুতি হয়। এই লক্ষণগুলো কারো যদি প্রায়ই এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে হতে থাকে তাহলে অবশ্যই বিষয়টা তার জন্য অত্যন্ত সমস্যাজনক।

যথাযথ ইতিহাস, শারীরিক এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেল, যে ওই ব্যক্তির সমস্যাটি আসলে উদ্বিগ্নতাজনিত মানসিক রোগ বা Anxiety Disorder. এই ব্যক্তির চিকিৎসা প্রদানকারী তার রোগটি নির্ণয় করলেন এবং রোগীকে তার রোগের বিষয়ে বিষয়ে যথাযত চিকিৎসা দিতে চাইলেন। কিন্তু রোগী যদি মানসিক রোগের ব্যাপারে প্রচলিত ভুল ধারণার দ্বারা চালিত হন সে ক্ষেত্রে তার কাছে ব্যাপারটা আরো ভীতিকর হয়ে যাবে, কারণ তখন তার বাড়তি আশঙ্কা যোগ হবে যেমন – ‘১. আমি পাগল! ২. কেউ জানতে পারলে আমার কি হবে? আমাকেতো দুর্বল মনের ভাববে ৩. আমার শরীরে কি বড় কোনো রোগ আছে যেটা ডাক্তার আসলে ধরতে পারছেন না? বড় কোনো রোগ না থাকলে এই সমস্যাগুলো আমার কেন হচ্ছে? ৪. চিকিৎসায় কি হবে?’

এই চিন্তাগুলো তার উদ্বিগ্নতা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়িয়ে দেবে। চিকিৎসকের প্রতিও তৈরি হবে আস্থাহীনতা। পুরো ব্যাপারটিই ব্যক্তির জীবনযাপনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অথচ এই লক্ষণগুলো মানসিক রোগের কারণে হচ্ছে এটা জানা থাকলে, ভয়ের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে  ধারণা থাকলে এবং মানসিক রোগকে পাগল আখ্যায়িত করে ঋণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার মনোবৃত্তি না থাকলে বিষয়টি রোগীর জন্য মোকাবেলা করা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ হবে।
 
আমাদের দেশে আর্থসামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক রোগ দিন দিন বেড়েই চলছে। তাই এর প্রতিরোধ, যথাযথ চিকিৎসার চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অপরদিকে স্বাস্থ্যসেবারও রয়েছে যথেষ্ট অপ্রতুলতা। এর পাশাপাশি মানসিক রোগ সংশ্লিষ্ট খাত যথেষ্ট অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে। এ কারণে মানসিক রোগ সম্পর্কে যথাযথ কিছু ধারণা অযথা হয়রানি থেকে যেমন অনেককে বাঁচাতে পারবে তেমন অনেক সমস্যা দ্রুত নির্ণয় করে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়াও সম্ভব হবে। কারণ মানসিক রোগের চিকিৎসা শুধু ওষুধের মাধ্যমে নয় বরং মনোসামাজিক ভাবেও করতে হয়। তাই সবার সচেতনতা এখানে একান্ত কাম্য।    

ডা. সৃজনী আহমেদ
এম ডি, ফেজ এ মনোরোগবিদ্যা বিভাগ
বি এস এম এম ইউ
[email protected]

বাংলাদেশ সময়: ১১৩০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৮ , ২০১৩
এসএটি/এসআরএস- [email protected]

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa