ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ কার্তিক ১৪২৮, ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মনোকথা

দুর্যোগ ও মানুষ: সাইকোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট (অনুসন্ধান)

ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩০২ ঘণ্টা, আগস্ট ১৮, ২০১৩
দুর্যোগ ও মানুষ: সাইকোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট (অনুসন্ধান)

কোনো একটি দুর্যোগের পর দ্রুত সেখানকার অবস্থা বুঝে নেওয়া এবং সেই সঙ্গে আক্রান্ত মানুষগুলোর মানসিক দিকগুলোর দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে এবং ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির ক্ষতিকর দিকগুলো দ্রুত চিহ্নিত করার জন্য তৎক্ষণাৎ যে বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া দরকার, সেগুলো হচ্ছে-

   - কোথায় দ্রুত কাজ করতে হবে তা নির্ণয় করা
   - কোথায় দীর্ঘ মেয়াদি সহায়তার প্রয়োজন হবে, সেটি নিরূপণ করা
   - কী ধরনের সাহায্য প্রয়োজন হবে সে ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ব্যবস্থা করা
   - কাদের এবং কোন কোন বিষয়গুলোকে পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখতে হবে সেসব নির্ধারণ করা।



তবে এটাও সত্য যে, প্রতিটি মানুষকে আলাদা ভাবে খেয়াল করা সম্ভব নয়। তাই বিশেষ কিছু বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যেমন-

বিশেষ বিশেষ গ্রুপ: বিশেষ বিশেষ গ্রুপ বা গোষ্ঠীর ওপর আলাদাভাবে খেয়াল রাখা যেতে পারে। বৃদ্ধ, শিশু, প্রতিবন্ধী, রিলিফ ওয়ার্কার, কিংবা যারা অনেক সময় ধরে আটকা পরে ছিল অথবা যাদের ছেলেমেয়ে মারা গেছে এমনভাবেও বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

বিশেষ কিছু আচরণের ওপর ভিত্তি করে: যাদের আচরণে অসঙ্গতি দেখা যায়, যেমন- শিশুরা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, বড়রা কাজে যাওয়া বা কাজ করা থামিয়ে দিয়েছে, বারবার বিভিন্ন শারীরিক অসুবিধার কথা বলছে, কিংবা যাদের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা দেখা যায়, যারা ঘটনাটি থেকে কোনোভাবেই বের হতে পারছে না বা বারবার ফ্ল্যাশব্যাক হচ্ছে। মোটকথা পূর্বের জীবনধারার সঙ্গে যাদের বর্তমান জীবনধারার হেরফের হচ্ছে, তাদের আলাদা করে খেয়াল করা।

স্ক্রিনিং টেস্ট করা
বিজ্ঞানসম্মত কিছু প্রশ্নপত্র আছে, যেসবের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক অসুবিধা নির্ধারণ করা সম্ভব। বিভিন্ন শ্রেণীর ওপর ভিত্তি করে করা এসব আলাদা আলাদা প্রশ্নপত্রকে স্ক্রিনিং টেস্ট বা স্ক্রিনিং ইন্সট্রুমেন্ট বলা হয়।

কেস বর্ণনা ও উদ্বুদ্ধ করা: বিভিন্ন সহায়তা সংগঠন বা সমাজের সচেতন মহলের প্রচার সমাবেশ, লিফলেট, ঘোষণা, রেডিও টিভি, প্রবন্ধ, আর্টিকেল, পত্রিকা, পোস্টারসহ নানা ধরনের প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার জন্য সংশ্লিষ্টের সহায়তা চাইতে পারেন।  

Coping with trauma বা মানিয়ে নেওয়ার পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে: আক্রান্ত ব্যক্তি মানসিক চাপকে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কেউ কেউ স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অবলম্বন করলেও কারো মাঝে অগ্রহণযোগ্য পদ্ধতিও অবলম্বন করতে দেখা যায়। গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির মধ্যে ভাগ্য বা সৃষ্টিকর্তার ওপর নির্ভর করা, দুর্ঘটনাকে কর্মফল হিসেবে দেখা, জীবনের স্বাভাবিক একটি পরিণতি হিসেবে দেখা, পরিবার-সমাজ কিংবা ধর্মে আশ্রয় খোঁজা, নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে পুনরায় নিজেকে ফিরে পাওয়া, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অন্যতম।

আর অগ্রহণযোগ্য পদ্ধতিগুলো হলো- মানসিক চাপের বিষয়গুলো বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা হিসেবে প্রকাশ করা, সমস্যাগুলো অস্বীকার করা বা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা। অনেকে আবার একেবারে চুপ হয়ে যান, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কেউ কেউ এতটাই বিরক্ত থাকেন যে এক জায়গার সমস্যাকে অন্য জায়গায় প্রকাশ করেন। নিজেকে এমনভাবে দোষারোপ করেন যে সব কিছুর জন্য তিনি নিজেই দায়ী। কারও মাঝে আবার চিন্তার অসঙ্গতি পর্যন্ত দেখা যেতে পারে। নেশা করা বা নিজের ওপর অত্যাচার করাও এসবের মধ্যে পড়ে।

শারীরিক সমস্যা না মানসিক সমস্যা:
কখনো কখনো দুর্যোগের সময় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন শারীরিক অসুবিধার ফলে সৃষ্ট মানসিক সমস্যাকে সরাসরি মানসিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করার মতো ভুলও হতে পারে। যেমন কেউ যদি মাথায় আঘাত পেয়ে থাকেন বা কোনো বিষাক্ততা বা ইনফেকশনে আক্রান্ত হন কিংবা নিউট্রিশনাল ডেফিসিয়েন্সি হয় তবে সেক্ষেত্রে কিছু মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু এসব সমস্যাকে শুধুমাত্র মানসিক সমস্যা মনে করলে অবশ্যই বিরাট ভুল হয়ে যাবে।

বারবার মনে করিয়ে দেওয়া, কতটুকু প্রয়োজন:
দুর্যোগ পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণও কখনো কখনো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একজন ক্ষত্রিগ্রস্ত মানুষকে বারবার বিষয়গুলো মনে করিয়ে দেওয়াও ক্ষতির কারণ হতে পারে। কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার পর যখন নিজেকে থিতিয়ে নেওয়ার সময় হয় বা চেষ্টা করে, তখন বিষয়গুলো নতুন ক্ষতের সৃষ্টি করে। অনেক সময় তা আসল আঘাতের চেয়ে বড় আঘাত হিসেবে আসতে পারে। এসব এসেসমেন্টের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়ম মেনেই তা করতে হয়, যারা এক্সপার্ট একমাত্র তাদেরই এসব কাজ করা উচিৎ।

পরীক্ষাকারীর প্রস্তুতি:
যারা এ ধরনের ইনটারভিউ বা এসেসমেন্ট করতে যাবেন তাদেরও বিশেষ প্রস্তুতি থাকা দরকার। কেননা, কখনো কখনো তারা নিজেরাই ভয়াবহতায় গল্প শুনে বা দেখে বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। যাকে বলা হয়ে থাকে “secondary traumatization.”  এক্ষেত্রে আক্রান্ত মানুষের মতো তারাও বিভিন্ন সমস্যা অনুভব করতে পারেন।

ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব
সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

বাংলাদেশ সময়: ১৩০০ ঘণ্টা, আগস্ট ১৮, ২০১৩
সম্পাদনা: এসএটি/এডিবি/ [email protected]

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa