ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়া থেকে মফিজুল সাদিক

কৃষিক্ষেতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশি শ্রমিক!

মফিজুল সাদিক, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩৩৫ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৫
কৃষিক্ষেতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাংলাদেশি শ্রমিক! ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

Mofizul_sadikক্যামেরুন হাইল্যান্ড(মালয়েশিয়া) থেকে: সবজি, ফল ও ফুলের ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত ক্যামেরুন হাইল্যান্ড। আর এসব কৃষিপণ্য উৎপাদনে প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রমিকই বাংলাদেশের।

মালয়েশিয়ার কৃষি বিপ্লবে সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশের কৃষক। তাদের হাতের স্পর্শে উৎপাদিত হচ্ছে এসব কৃষি পণ্য।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে বসবাসরত শ্রমিকরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন। এর প্রধান কারণ সারাদিন কৃষি জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করা এবং সু-চিকিৎসা না পাওয়া।
 
স্বাস্থ্যঝুঁকি
ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে সব মিলিয়ে প্রায় ২২ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন। অধিকাংশই কৃষি জমিতে কাজ করেন। সবজি, ফল ও ফুল
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত বন্ধুর ভূমিতে উৎপাদিত হচ্ছে। এসব জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করার ফলে প্রতিনিয়তই নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। কিন্তু ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে উন্নতমানের চিকিৎসা সেবা না থাকায় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন তারা।  
 
নরসিংদী জেলা রায়পুরার আজিজুল হক। তিনি প্রায় ৮ বছর ধরে ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে কৃষি কাজে জড়িত। সবজি ক্ষেতে কীটনাশক প্রয়োগ করাই তার প্রধান কাজ।
 
আজিজুল বাংলানিউজকে বলেন, ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে বাঁধাকপি থেকে শুরু করে কত যে সবজি লাগিয়েছি এক মাত্র আল্লাহ জানেন। আমার হাতে লাগানো একটি চারাও মরেনি। এসব চারায় আবার প্রতিনিয়ত বিষ প্রয়োগ করতে হয়। এতে করে শরীরের রং পাল্টে গেছে।
 
তিনি বলেন, জমিতে বিষ প্রয়োগ করে সারা দিন একই কাজ করতে হয়। এতে মাঝে মধ্যে আমাদের নানা সমস্যা হয়। কিন্তু ক্যামেরুনে ভালো কোনো হাসপাতাল নেই। একটি হাসপাতাল আছে, সেখানে গেলেই ৫০(বাংলাদেশি মুদ্রায় এক হাজার টাকা) রিঙ্গিত ভিজিট নেয়।
 
অতিরিক্ত ভিজিটের কারণেই ক্যামেরুন হাইল্যান্ড এর টানাহ রাটায় হাজ্জা কুলসুম হসপিটাল নামে ওই হাসপাতালে অনেক শ্রমিক চিকিৎসা নিতে চান না।
 
অনেক শ্রমিকের দাবি, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মেডিক্যাল টিম ক্যামেরুন হাইল্যান্ডের শ্রমিকদের যদি বছরে একবার চিকিৎসা দিয়ে যেতো, তবে তাদের জন্য অনেক ভালো হতো।
 
টাঙ্গাইলের সাখাওয়াত হোসেন প্রায় ১২ বছর মালয়েশিয়ার ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে কাজ করেন।
 
বাংলানিউজকে তিনি বলেন, জমিতে বিষ দেয়ায় শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখানে একটি মাত্র হাসপাতাল। চিকিৎসা নিতে গেলেই ৫০ রিঙ্গিত দিয়ে টিকিট কাটতে হবে। অন্যান্য খরচ দিয়ে অনেক সময় দেড়শ’ রিঙ্গিত চলে যায়। এজন্য ভিজিট খরচার ভয়ে চিকিৎসা নিতে পারি না।
 
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বছরে একবার আমাদের জন্য চিকিৎসা সেবা দিলে ভালো হতো। মালয়েশিয়াতে থাকলেও কুয়ালালামপুরে বছরে একবার যাওয়া হয় কিনা সন্দেহ আছে। কারণ আমাদের এখান থেকে কুয়ালালামপুর গেলে প্রায় দুই দিন কাজ বন্ধ করতে হয়।
    
পুলিশের হয়রানি
ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে প্রতিনিয়তই পুলিশের হয়রানির শিকার হন শ্রমিকরা। কারণে-অকারণে ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে তল্লাশি চালায় পুলিশ। তিন মাস আগে মুন্সীগঞ্জের রাকিব নামে একজন শ্রমিক পুলিশের ভয়ে তিন তলা থেকে লাফ দিয়ে মারা গেছেন।
 
স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালয়েশিয়া সরকার ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে ৩ হাজার একর ভূমিতে কৃষি কাজের অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু স্থানীয় মালয় ও চায়নিজরা আরও বেশি জমি দখলে নিয়ে চাষাবাদ করছে। এসব অবৈধ জমিতে কাজ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশের বৈধ শ্রমিকরা।
 
মালয় ও চায়নিজদের দখল থেকে জমি উদ্ধারে পুলিশ প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করে। বাংলাদেশি শ্রমিকদের সামনে পেলে নির্যাতন করে।

অন্যদিকে অবৈধ জমি সরকার দখলে নিলে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মক্ষেত্র হারাবে। এতে করে উভয় সংকটে পড়েছেন ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে কর্মরত শ্রমিকরা।
 
বগুড়া সারিয়াকান্দির মাহাতাব উদ্দিন। তিনি ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে চায়নিজ মালিক লি টানের সবজি বাগানে কৃষি কাজ করেন। মালয়েশিয়া সরকার লি টানকে ৫ একর জমিতে সবজি চাষের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু তিনি অতিরিক্ত আরো কয়েক একর জমিতে সবজি চাষ করছেন।
 
বাংলানিউজকে মাহাতাব বলেন, মালিক(লি টান) চায়না ও সিঙ্গাপুরে পড়ে থাকেন। আমি জমি দেখাশুনা করি। অনেক সময় পুলিশ ব্লক(অভিযান) দিলে আমাকে হয়রানির শিকার হতে হয়।
 
তিনি আরও বলেন, এই জমি মালয় সরকার উদ্ধার করলে আমরাও বেকার হয়ে যাবো। ’
 
ভিসা জটিলতায় শ্রমিক
ক্যামেরুন হাইল্যান্ডে অনেক শ্রমিক ভিসা জটিলতায় পড়েছেন। অনেকের পাসপোর্টে চারবার পর্যন্ত ভিসা লেগেছে। এর পরে সেই সব ভিসায় মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে লাল সিল মেরে দেয়া হয়েছে। এসব ভিসার মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত। যে সব শ্রমিকের ভিসায় লাল সিল মারা হয়েছে তাদের দাবি আরও একবার যেন ভিসা লাগানো যায়।

মাগুরার সালিখা'র পরশ আলি। তার ভিসার মেয়াদ চার বছর। এর পর মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে লাল সিল মারা হয়েছে। এদেশের সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হবে না। এতে সমস্যায় পড়েছেন পরশ আলী।
 
এই বিষয় ক্যামেরুন হাইল্যান্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি বিল্লাল মাহমুদ বাংলানিউজকে বলেন, অনেকের চার বছর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এসব ভিসায় লাল সিল মারা হয়েছে। তাই সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, ভিসার মেয়াদ যেন আরও তিন বছর বাড়ানো হয়। তা না হলে অনেক শ্রমিককে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে।
 
বাংলাদেশ সময়:  ১৩৩৫ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৫
এমআইএস/জেডএম

** কবর দেয়া ও কাপড় পরা শিখছে ওরা!
** কোরবানির গরু বছরে একবারই খোঁয়াড়ে আসে
** সুন্দর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে সঙ্গী মেঘদল
** ঈদ উপলক্ষে মালয়েশিয়ায় হোটেল মার্কে ৩০ শতাংশ ছাড়
** এয়ার এশিয়ায় কম খরচে মালয়েশিয়া

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

মালয়েশিয়া এর সর্বশেষ

Alexa