ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়ায় অপহৃত বাংলাদেশি উদ্ধার, দেশে আটক ২, মালয়েশিয়ায় ৯

জাহিদুর রহমান, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২৩৪০ ঘণ্টা, অক্টোবর ৪, ২০১৪
মালয়েশিয়ায় অপহৃত বাংলাদেশি উদ্ধার, দেশে আটক ২, মালয়েশিয়ায় ৯ ছবি: জাহিদ সায়মন/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ঢাকা: কোটি টাকা মুক্তিপণের দাবিতে মালয়েশিয়ায় অপহৃত বেসরকারি সংস্থা প্রশিকার সাবেক পরিচালক (ফিল্ড অপারেশন) ফজলুল হককে উদ্ধার করেছে সে দেশের পুলিশ।

শুক্রবার রাতে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের একটি এলাকা থেকে ফজলুল হককে উদ্ধার করা হয়।

এ সময় অপহরণে জড়িত থাকার অভিযোগে ৯ ব্যক্তিকে আটক করে মালয়েশীয় পুলিশ।

মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃতের পরিবারের সঙ্গে অপহরণকারীদের ফোনালাপের সূত্র ধরে তাদের আটক করা হয়। অপহরণের শিকার ফজলুল হক ঢাকা-১৯ (সাভার) আসনের সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমানের শ্বশুর।

এ অপহরণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বাংলাদেশ থেকেও দুই ব্যক্তিকে আটক করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। র‍্যাব-১২’র একটি দল শুক্রবার দুপুরে পুলিশের সহযোগিতায় সিরাজগঞ্জ থেকে আটক করে তাদের। আটককৃতরা হলেন- আল আমিন (২৭) ও নজরুল ইসলাম (৩২)।

এদের মধ্যে আল আমিন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার পাগাড়পাড়া গ্রামের কাজী আব্দুল মজিদের ছেলে। অন্যজন নজরুল ইসলাম একই জেলার কামারখন্দ থানার কাটিবাড়ি গ্রামের সোহরাব আলীর ছেলে।

মালয়েশিয়ায় ফজলুল হকের অপহরণে ঘটনায় আটককৃতদের যোগসূত্র থাকার তথ্য পেয়েছে র‍্যাব। র‍্যাবের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বিষয়টি বাংলানিউজকে নিশ্চিত করেছে।

এদিকে উদ্ধারকৃত ফজলুল হক সুস্থ আছেন এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে নিজেদের হাইকমিশনে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন দেশটিতে অবস্থিত মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন।

এর আগে অপহৃত বাংলাদেশিকে মুক্তির বিনিময়ে র‍্যাবের হাতে আটক দু’জনকে ছেড়ে দেওয়ার শর্ত নিয়েই দর কষাকষি চলে অপহরণকারী ও অপহৃতের পরিবারে মধ্যে।

কুয়ালালামপুর ও ঢাকার মধ্যে শর্ত চালাচালির মাঝেই ফোন ট্রাকিং করে চলে অভিযান। অভিযানের এক পর্যায়ে আটক হয় মালয়েশিয়ায় ফজলুল হক অপহরণে জড়িতরা। এদের অধিকাংশই বাংলাদেশি বলে জানিয়েছে হাইকমিশন।

গত বুধবার রাতে দেশে ফেরার উদ্দেশে কুয়ালালামপুরের উপকণ্ঠে সেপাং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে অপহৃত হন ফজলুল হক।

তিনি সাভার পৌরসভার তালবাগ মহল্লার বাসিন্দা ও ধামরাইয়ের গাঙ্গুটিয়া ইউনিয়নের কাওয়াখোলা গ্রামের মৃত ফাইজুদ্দিনের বড় ছেলে।

গতকাল বাংলানিউজে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের ঝড় ওঠে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশনে।

অপহৃতকে উদ্ধারে তৎপর হয়ে ওঠে দেশের আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থাসহ মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশন।

এদিকে অপহৃত ফজলুল হক সাভারের বাসিন্দা হওয়ায় সাভার মডেল থানা পুলিশও গঠন করে একটি বিশেষ উদ্ধার টিম।

গত বৃহস্পতিবার রাতে মালয়েশিয়ায় থেকে অপহৃতের ছেলে মনিরুল হক মুকুলের মুঠোফোনে ফোন করে শুক্রবার দুপুরের মধ্যে মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের জন্যে চাপ দেয় অপহরণকারীরা। নইলে তাকে হত্যা করা হবে বলেও জানিয়ে দেয় তারা। আর পুলিশ কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিষয়টি জানালে ফজলুল হকের লাশ দেশে পাঠানোর হুমকি দেয় তারা।

এদিকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অপহরণের বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তদন্তে নামে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। আড়ি পাতা হয় অপহৃতের পরিবারের সঙ্গে অপহরণকারী চক্রের ফোনালাপে। রেডর্ক করা হয় তাদের কথোপকথন। একই সঙ্গে চলতে থাকে কললিস্টের পর্যালোচনা।

তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন, মালয়েশিয়ার যে নম্বর থেকে বাংলাদেশে ফোন করে মুক্তিপণের টাকা দাবি করা হচ্ছে সেসব নম্বর থেকে সিরাজগঞ্জের একাধিক নম্বরেও নিয়মিত কথা বলা হচ্ছে।

এদিকে মুক্তিপণের টাকা যমুনা সেতু এলাকায় দেওয়ার কথা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন, মালয়েশিয়ার অপহরণকারী চক্রের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে সিরাজগঞ্জের বাসিন্দাদের।

অপহৃতের ছেলে মনিরুল হক মুকুল মুক্তিপণের টাকা নিয়ে সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতু এলাকায় রওনা দিলে, তাদের অনুসরণ করে সাভার মডেল থানার সেকেন্ড অফিসার মোল্লা স‍াহেব আলীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল।

এদিকে র‍্যাবেরও একটি দল নারী সদস্যদের মোটরসাইকেল আরোহী সাজিয়ে অনুসরণ করতে থাকে মুকুলের গাড়িটি।
পুলিশ সদস্যরা জানান, যমুনা সেতুতে ওঠা মাত্রই অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা টেলিফোন করেন মুকুলকে। ফোন না কেটে তাদের বলা ঠিকানায় গাড়ি নিয়ে যেতে বলেন তারা।

এক পর্যায়ে যমুনা সেতু অতিক্রম করে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ থানার দিকে যাবার নির্দেশনা দেয় তারা। মুঠোফোনে সংযোগ চালু রেখেই এক পর্যায়ে তারা গাড়ি থেকে টাকার বস্তা ফেলে দেওয়ার কথা জানালে মুকুল জামতৈল এলাকায় ফেলে দেন টাকার বস্তা।

এ সময় দুই মোটরসাইকেল আরোহী টাকার বস্তা কুড়িয়ে নিতেই পেছনে চারটি মোটরসাইকেলে স্বামী-স্ত্রী সেজে আসা আরোহী র‍্যাব সদস্যরা টাকাসহ দুই জনকে হাতেনাতে আটক করে।

র‍্যাবের এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন র‍্যাব-১২ সিপিসি-৩ এর কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন ফারুকী। শনিবার র‍্যাব হেডকোয়ারর্টারে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করা হতে পারে বলেও জানিয়েছেন র‍্যাব কর্মকর্তারা।

যোগাযোগ করা হলে র‍্যাব -১২ সিপিসি-৩ এর কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন ফারুকী বাংলানিউজকে বিস্তারিত জানতে শনিবার আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের জন্যে অপেক্ষা করতে বলেন।

এদিকে যোগাযোগ করা হলে র‍্যাব-১২’র অধিনায়ক জামিল আহমেদ বাংলানিউজকে জানান, আমি এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না। বিস্তারিত পরে জানানো হবে। লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং’র সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

অভিযানকারীদের একটি সূত্র বাংলানিউজকে জানায়, আটক আল আমিন মালয়েশিয়ায় প্রবাসী আলিম হোসেনের আত্মীয়। আলিম হোসেনের মুঠোফোন থেকেই মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিলো বলেও জানায় সূত্রটি।

মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার একেএম আতিকুর রহমান বাংলানিউজকে জানান, ফজলুল হককে উদ্ধার করায় স্বস্তি ফিরেছে সে দেশে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের।

অপহরণ কাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে দেশটির পুলিশ অপহৃতের ব্যবসায়িক অংশীদার হারুন উর রশিদকে আটক করেছে। তিনি বাংলাদেশের বরিশালের বাসিন্দা।

মালয়েশিয়ার অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সিলর রইস হাসান সরোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাংলানিউজকে তিনি জানান, আমি ও ফাস্ট সেক্রেটারি এম এস কে শাহীন উভয়ে মিলে এ ব্যাপারে মালয়েশিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কাজ করছি। পুলিশ, ইমিগ্রেশন, গোয়েন্দাসহ আইজিপি কার্যালয়কে জানানো হলে আন্তরিকভাবে তারা তৎপরতা শুরু করে।

তিনি আরও জানান, উদ্ধারকৃত ফজলুল হক সুস্থ রয়েছেন। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাকে দেশে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে অপহৃত ফজলুল হকের স্ত্রী মনোয়ারা হক বাংলানিউজকে জানান, তার স্বামী উদ্ধার হওয়ায় পরিবারে স্বস্তি ফিরেছে। ঈদের আগে স্বামীকে অপহরণ ও কোটি টাকা মুক্তিপণে দাবি করায় পরিবারটি ভেঙে পড়েছিলো।

‘আমরা বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। আশা করছি দ্রুত তিনি দেশে ফিরে আসবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্বক ব্যবস্থা নেবে’ -যোগ করেন মনোয়ারা বেগম।

প্রশিকা থেকে অবসর নেওয়ার পর ফজলুল হক রুর‍্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আরডিএফ) নামে একটি বেসরকারি সংস্থায় পরামর্শক হিসেবে কাজ করতেন। ওই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে সম্প্রতি তিনি মালয়েশিয়ায় সিঙ্গাপুর সীমান্তঘেঁষা জহুরবারো এলাকায় ‘পায়রা গ্লোবাল’ নামে একটি কোম্পানি খুলে রেস্টুরেন্টের ব্যবসা চালু করেন। ব্যবসায় তার অংশীদার ছিলেন বাংলাদেশের বরিশালের বাসিন্দা হারুন উর রশিদ। মাত্র দুদিন আগে রেস্টুরেন্টটি চালু করে ঢাকায় ফেরার পথে অপহৃত হন ফজলুল হক।

** মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অপহৃত
** পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতায় অপহৃত বাংলাদেশি উদ্ধার

বাংলাদেশ সময়: ২৩৩৬ ঘণ্টা, অক্টোবর ০৩, ২০১৪/আপডেট ০৫৪৬ ঘণ্টা

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa