ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়া থেকে মাজেদুল নয়ন

স্টুডেন্ট ভিসায় যেন শ্রমিক না আসে

মাজেদুল নয়ন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩২৭ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৪
স্টুডেন্ট ভিসায় যেন শ্রমিক না আসে ছবি : বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

চেরাস, কুয়ালালামপুর থেকে: ‘মালয়েশিয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট টাইম চাকরির সুবিধা,’ দেশে এ ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে ফাঁদে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।

দালালের খপ্পরে পড়ে এভাবে প্রতি মাসে কয়েকশ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় পড়তে এসে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।



আর দালালদের মাধ্যমে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে কাজ করতে আসা শিক্ষার্থীদের কারণে মর্যাদাহানি হচ্ছে বৈধ শিক্ষার্থীদের। তাদের দাবি, স্টুডেন্ট ভিসায় মাধ্যমে মূলত আসছে শ্রমিক। তাছাড়া পার্ট টাইম চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের শ্রমিক হিসেবে পাচার করা হচ্ছে।
 
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি কলেজ সেদায়া ইন্টারন্যাশনাল (ইউসিএসআই) এর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক আড্ডায় এসব অভিযোগ করেন তারা।
 
ফাইরোজ হুমাইরা ভূঁইয়া এ বছরের মার্চে এসেছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। পড়ছেন ডিপ্লোমা ইন ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিষয়ে। তিনি বলেন, এখানকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বেশ ভাল। একইসঙ্গে বাজে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদেরই নিজের প্রতিষ্ঠানটি বাছাই করতে হবে।
 
ঢাকার মেয়ে সুমাইয়া শফিক খানের বেড়ে ওঠা সৌদি আরবে। ২০১৩ এর মে থেকে এখানে গণযোগাযোগ বিষয়ে স্নাতক পড়ছেন। তিনি বলেন, দেশে প্রচুর বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, মালয়েশিয়াতে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট টাইম চাকরির সুবিধা রয়েছে। আসলে কিন্তু তা নেই। দেশে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরা এ স্বপ্ন নিয়ে এখানে এসে পড়ে বিপাকে পড়ছেন।
 
মেক্যানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান। ২০১৩ এর এপ্রিল থেকে পড়ছেন এখানে। তিনি বলেন, পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে এডুকেশন কনসালটেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পাড়ি জমাচ্ছেন এখানে। কনসালটেন্টরা আশ্বাস দেয় মালয়েশিয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট টাইম কাজ করে ভালো আয় করা যায়। তাই বাবা-মা ঋণ করে সন্তানদের  বিদেশে পাঠান।  

একশ্রেণির দালাল ও প্রতারকচক্র এখানে পার্ট টাইম চাকরির যে প্রলোভন দেখায় তা আসলে ভুয়া। পার্ট টাইম চাকরি করে একজন ছাত্রের যে আয় হয় তা দিয়ে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ বহন শেষে থাকা-খাওয়ার ব্যয় নির্বাহ অসম্ভব। তাছাড়া এখানে ১২ ঘণ্টার নিচে কোনো কাজও নেই।  
 
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আরেক শিক্ষার্থী মাহফুযুল আবেদিন এ বছরের এপ্রিলে এসেছেন এ দেশে। এখানে পড়াশোনার দুর্বলতা নিয়ে তিনি বলেন, মালয় বা চীনা শিক্ষকরা অনেক সময় নিজ ভাষায় কথা বলেন, যেটা আমাদের বিব্রত করে।
 
তিনি বলেন, দালালের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা স্টুডেন্ট ভিসার নামে এখানে শুধু কাজ করতে আসেন। একসময় অবৈধ হয়ে পড়েন এসব শিক্ষার্থী। এসব কারণে আমাদের মতো বৈধ শিক্ষার্থীদেরও এখানে শ্রমিক হিসেবেই মূল্যায়ন করা হয়। এটা খুবই বিব্রতকর ও মর্যাদাহানিকর।
 
এ শিক্ষার্থীরা জানান, মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের সমস্যা এখানে আরো বেশি। মালয়েশিয়ায় লেখাপড়া করার সময় কোনো ফুল টাইম চাকরি নেই। পার্ট টাইম যে চাকরি রয়েছে তাও হয় কোনো রেস্টুরেন্ট অথবা শপিং মলের দোকানে। তবে নামে পার্ট টাইম বললেও, প্রতিদিন ৮-১২ ঘণ্টার নিচে কেউ কাজ দিতে চায় না। তাই পার্ট টাইমের নামে এসব কাজকে ফুল টাইম বলা যায়। কিন্তু বেতন হয় প্রতি ঘণ্টা হিসেবে।

এখানে যারা পার্ট টাইম কাজ করেন ঘণ্টায় তাদের বেতন দেওয়া হয় ৫-৭ রিঙ্গিত। ( ১ রিঙ্গিতে বাংলাদেশি টাকার মূল্যমান ২৪ টাকা)
 
সুমাইয়া আরো জানান, এখানে সরকারিভাবেই শিক্ষার্থীদের কাজ করার অনুমতি নেই। এছাড়াও যতটুকু সুযোগ রয়েছে তাতেও স্থানীয়দের প্রাধান্য। এখানে শিক্ষার্থীর যে জীবন-মানের ব্যয় তার ২০ শতাংশও পার্ট টাইম করে ওঠানো সম্ভব নয়।
 
এখানকার শিক্ষা জীবনের ভাল দিক সর্ম্পকে সুমাইয়া বলেন, আমরা অনেকেই বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। দেশে খুব আয়েশি জীবন-যাপন করতাম। কিন্তু এখানে নিজেদের কাজটা নিজেদেরই করতে হচ্ছে। থালা-বাসন ধোঁয়া থেকে শুরু করে ঘর মোছা পর্যন্ত।
 
রাফাত বলেন, এখন আমরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিচ্ছি। যেমন আমি ভাবছি, ক্রেডিট ট্রান্সফারের কথা, সেটাও আমার নিজের সিদ্ধান্ত।
 
দেশের প্রসঙ্গ উঠতেই তারা জানান, দেশের অভাব অনুভব করেন সবাই। মাহফুজ বলেন, বিশেষ করে যখন অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন খুব নিঃসঙ্গ মনে হয়। হয়তো অসুস্থ, তবে বাসায় বলছি বেশ সুস্থ আছি। না হলে মা দুঃচিন্তা করবেন।
 
ইউসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছরে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের নিয়ে অ্যাসোসিয়েশন করা হয়েছে। বর্তমানে ৫৫ জন এই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। সুমাইয়া জানান, গত সেমিস্টারের শিক্ষার্থীরা এখনো অ্যাসোসিয়েশনে অর্ন্তভুক্ত হয়নি।
 
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এখানে বাংলাদেশ কমিউনিটি এখনো মর্যাদা নিয়ে দাড়াতে পারেনি। এর কারণ নিজেদের মধ্যে একতার অভাব। একটি শক্তিশালী কমিউনিটি গড়ে উঠলে বাংলাদেশিদের নিয়ে তাচ্ছিল্য করা এখানে এতোটা সহজ হবে না।
 
পড়াশোনার পাশাপাশি এখানকার শিক্ষার্থীরা জড়িত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও। সম্প্রতি ফেনী সমিতির অনুষ্ঠানে গান গেয়ে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে সুমাইয়া। তিনি জানান, সৌদি আরব থাকতেও সেখানে শিল্পী হিসেবে তার বেশ খ্যাতি ছিল।
 
মাহফুজ বলেন, কমিউনিটিভিত্তিক বড় ধরনের আয়োজনে যদি আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে পারি, তবে সেটা আমাদের মর্যাদা বাড়াবে। গত মে মাসে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ নামে একটি প্রোগ্রাম করেছি।
 
শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেরই চাওয়া, বাংলাদেশ থেকে স্টুডেন্ট ভিসার নামে যেন শ্রমিক না আসে। আবার এ প্রক্রিয়ায় যেন মেধাবী শিক্ষার্থীদেরও শ্রমিক হিসেবে পাচার করা না হয়। এতে দেশের সম্মান যেমন নষ্ট হয়, বৈধ শিক্ষার্থীদেরও বিপাকে পড়তে হয়।

** মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরের ভিসা পেতে
 
বাংলাদেশ সময়: ১৩২৮ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa