ঢাকা, বুধবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৮, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩ সফর ১৪৪৩

লন্ডন

লন্ডনে আন্তর্জাতিক কনফারেন্স

অপরাধীর নয়, ভিকটিমের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলুন

সৈয়দ আনাস পাশা, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯৫৩ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩, ২০১৫
অপরাধীর নয়, ভিকটিমের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলুন ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

লন্ডন: ৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে কতিপয় দেশ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের কথা বলায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. আলীম চৌধুরীর সন্তান ড. নুজহাত চৌধুরী।

বুধবার লন্ডনের কুইনমেরি ইউনিভার্সিটির ক্লার্ক কেনেডি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত ‘রাইজ অব টেরোরিজম ইন দ্য নেইম অব ইসলাম: বাংলাদেশ এন্ড সাউথ এশিয়া কনটেক্সট এন্ড দ্যা নিড ফর গ্লোবাল রেসিসটেন্ট’ শীর্ষক এক সেমিনারে ড. নুজহাত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের ওয়ারক্রাইম ট্রায়ালে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার আগে আমার মত ভিকটিম পরিবারের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা উচিত সংশ্লিষ্টদের।



তিনি বলেন, একাত্তরে আমার বাবা যখন পাকিস্তানি আর্মি ও তাদের দেশীয় দালালদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন তখন তো তাঁর মানবাধিকার নিয়ে কাউকে কথা বলতে দেখিনি। দীর্ঘ চার দশক পর যখন আমার বাবার হত্যাকারী ঐ মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার হচ্ছে তখন তাদের মানবাধিকারের নামে মায়া কান্না আমাদের মত শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি উপহাস বলেই মনে হচ্ছে। একাত্তরে নিজের বাবা ড. আলীম চৌধুরীর হত্যাকাণ্ডের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত ড. নুজহাত বলেন, একাত্তরে ধর্মের নামে যে সন্ত্রাস আমার মাতৃভূমিকে রক্তাক্ত করেছিলো, দুই বছরের শিশু আমার কাছ থেকে আমার বাবাকে কেড়ে নিয়েছিলো, সেই সন্ত্রাস আজ পশ্চিমা দুনিয়ার দোড়গোড়ায়। পশ্চিমা দুনিয়া একাত্তরের ভিকটিমদের কান্না যদি সেই সময় থেকেই শুনতো তাহলে আজকে হয়তো তাদের দোড়গোড়ায় এটি আসতো না।

তিনি বলেন, ধর্মের নামে সন্ত্রাস শুধু সন্ত্রাস নয়, এটি একটি ‘আদর্শিক লড়াই’। এই ‘লড়াই’ শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের মাধ্যমে যার যার ধর্ম নিয়ে বসবাসের বিরুদ্ধে নিজ নিজ ধর্মীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। আমাদের সন্তানরা একটি সেক্যুলার শান্তিপূর্ণ সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে চলবে না ধর্মীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করবে, এর কোনটি আমরা চাই এটি আমাদের এখনই ভেবে দেখতে হবে।

ব্রিটেনের প্রতি ইঙ্গিত করে নুজহাত বলেন, আইএস এর বিরুদ্ধে গর্জন না দেখিয়ে নিজ দেশে প্রতিনিয়ত জন্ম নেয়া জঙ্গিদের বিষয়ে মনযোগ দিলে সন্ত্রাস মোকাবেলা সহজ হবে।

চৌধুরী মঈনুদ্দিনে মত দণ্ডিত একজন যুদ্ধাপরাধীকে নিজের দেশে রেখে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস মোকাবেলার এই গর্জন শোভা পায় না, এমনই মন্তব্য করেন নুজহাত।

নিজেদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যে একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে সন্ত্রাস মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যে নুজহাত বলেন, ভবিষ্যত প্রজন্ম ধর্মের নামে এই সন্ত্রাসী লড়াইয়ে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হোক বাংলাদেশ তা চায় না বলেই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছে। ধর্মের নামে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাগছে বাংলাদেশ, রাজনৈতিক স্বার্থ চিন্তার বাইরে এসে আপনারাও জাগুন।

ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে কি নোট স্পিকার হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির। আলোচনায় তিনি বলেন, সেক্যুলারিজমকে সমর্থন না করলে ধর্মীয় সন্ত্রাস বাড়বেই। বাংলাদেশের জামাত-শিবিরকে মডারেট ইসলামি সংগঠন বললে বর্ডার সিল করেও সন্ত্রাস মোকাবেলা সম্ভব নয়।

জামায়াতে ইসলামকে সাউথ এশিয়ার সন্ত্রাসীদের গড ফাদার মন্তব্য করে শাহরিয়ার কবির বলেন, একাত্তরে ধর্মের নামে বাংলাদেশে যে রক্তগঙ্গা বইয়েছে এরা, আজকে ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সেই রক্তগঙ্গাই বইছে। এই রক্তগঙ্গা রুখতে প্রয়োজন এডুকেশন, কালচার ও সোস্যাল লাইফসহ প্রতিটি স্থরে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠা।

ওয়ার অন টেররে পাকিস্তান, সৌদি আরবকে সাথে নিয়ে এটি কতটুকু সম্ভব তা ভাবতে হবে পশ্চিমা দুনিয়াকে।

একাত্তরের দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মঈনুদ্দিনের ব্রিটেনে অবস্থানের কথা উল্লেখ করে শাহরিয়ার কবির বলেন, ডেমোক্রেসি ও ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনের সুযোগ নিয়ে এরা প্রচার করছে তাদের সন্ত্রাসী আদর্শ। ফলে ব্রিটেনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যেই প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে আইএস সমর্থক।

নিজের দেশে নিরাপদ হেফাজতে মঈনুদ্দিনের মত যুদ্ধাপরাধীদের রেখে ওয়ার অন টেররে বিজয়ী হওয়া কতটুকু সম্ভব এ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শাহরিয়ার কবির।

ধর্মের নামে সন্ত্রাসের প্রতি বাংলাদেশের জিরো টলারেন্স নীতির কথা উল্লেখ করে দক্ষিণ এশিয়াকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে তিনি বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি।

কনফারেন্সে আরও বক্তব্য রাখেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডাইরেক্টর জেনারেল সামিম মোহাম্মদ আফজাল ও লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার কাউন্সিলার টি এম জোবায়ের।

বিশিষ্ট ব্রিটিশ সাংবাদিক গীতা সায়গলের সভাপতিত্বে ও মানবাধিকার কর্মী আনসার আহমেদ উল্লার পরিচালনায় অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে ডেইলি টেলিগ্রাফের লন্ডন এডিটর খ্যাতিমান ব্রিটিশ সাংবাদিক এন্ড্রু গিলিগানসহ মূলধারার সাংবাদিক, গবেষক, ব্লগার ও স্টুডেন্টরা অংশ নেন।

প্রশ্নোত্তর পর্ব সেশনে প্যানেল আলোচকরা অডিয়েন্সের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।

বাংলাদেশ সময়: ১৯৫৩ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৫
আরআই

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa