ঢাকা, শনিবার, ৯ মাঘ ১৪২৭, ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ০৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

লন্ডন

‘গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’ ২০১৫

বাংলাদেশি নারী নাদিয়াই সেরা

সৈয়দ আনাস পাশা, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৪৪০ ঘণ্টা, অক্টোবর ৮, ২০১৫
বাংলাদেশি নারী নাদিয়াই সেরা

লন্ডন: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের ধারণাই সত্যি হলো। ২৭ হাজার প্রতিযোগীসহ দুই সেমি ফাইনালিস্টকে পেছনে ফেলে 'গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’ ২০১৫ এর শিরোপা জিতে নিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত নারী নাদিয়া হোসেইন।

 
 
বুধবার (৭অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ৮টায় বিবিসি-১ এ প্রচারিত নাদিয়ার এ বিজয় মুহূর্ত দেখেছে বিশ্বের ১৪ মিলিয়নেরও বেশি টিভি দর্শক।
 
ছয়টি পর্ব পেরিয়ে নাদিয়া হোসেইনের সঙ্গে তমাল রায় ও আয়ান কামিং ফাইনাল পর্বে উঠলেও নাদিয়াই যে শিরোপা জিতবেন বঙ্গকন্যার নৈপুণ্য দেখে দর্শকরা তা আগেই অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন।  
 
শুধু সাধারণ দর্শক নয়, খোদ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও আত্মবিশ্বাস নিয়ে আগেই বলেছিলেন 'জিতবেন একজনই, আর তিনি হলেন নাদিয়া। কারণ তীব্র চাপের মধ্যেও নাদিয়া শান্ত থাকতে পারে'।  
 
প্রতিযোগিতা চলাকালীন নাদিয়ার এক সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতাল বেডে থেকে টিভিতে মায়ের প্রতিযোগিতা দেখার সুযোগ দেওয়া হয় তাকে। অসুস্থ সন্তানের কাছে বসে নাদিয়ার ছল ছল চোখের সেই করুণ চাহনি দর্শকদের দারুণ প্রভাবিত করে, অধিকাংশ দর্শকই চেয়েছিলেন নাদিয়াই যেন জিতে। ধর্মপ্রাণ হিজাব পরিহিতা নাদিয়ার মধ্যে অবশ্য কিছুটা সংশয় ছিলো, হিজাব পরিহিতা একজন প্রতিযোগীকে কেমন ভাবে নেবে ব্রিটিশ মূলধারা? কিন্তু সব সংশয় সন্দেহ দূর করে দিয়ে বিজয়ের মুকুট পড়লেন নাদিয়াই।  
 
তিন কন্যার পার্লামেন্ট জয়ের পর ব্রিটেনে বাঙালিদের আরেকটি নতুন রেকর্ড নাদিয়ার এই বিজয়।
 
প্রতিযোগিতার মোট ৬টি পর্ব দাপটের সঙ্গে অতিক্রম করে এসেছেন ৩০ বছর বয়সী নাদিয়া। গড়ে ৯.৫ মিলিয়ন দর্শক টেলিভিশনের পর্দায় উপভোগ করেছে প্রতিটি  পর্ব, দেখেছে নাদিয়ার নৈপুণ্য। শুধু সেমিফাইনালই দেখেছে ১০দশমিক ২ মিলিয়ন দর্শক। ফাইনালে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ১৫ মিলিয়ন। নাদিয়ার নৈপুন্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে এমনই বিমোহিত করেছিল যে এই বঙ্গকন্যার বিজয়ে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তিনি।
 
দলের কনফারেন্সে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি 'গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’ প্রতিযোগিতার ফাইনাল পর্ব উপভোগ করাও  ছিল তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
 
কয়েক মিলিয়ন দর্শকের সঙ্গে নিজ পরিবার সদস্যদের নিয়ে প্রতিটি পর্ব উপভোগ করেন তিনি। মধ্যাহ্নের আগে ছেলেমেয়েদের টেলিভিশন দেখা নিষেধ থাকলেও  'গ্রেট ব্রিটিশ ব্রেক অফ’ এর কারণে এই নিষেধাজ্ঞাও শিখিল করেছিলেন ক্যামেরন। ব্রিটিশ একাডেমি ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস বিজয়ী প্রতিযোগিতা ‘গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’ ২০১০ সাল থেকে বিবিসি প্রচার করে আসছে।
 
নাদিয়ার বাবা-মার আদি নিবাস সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার মোহম্মদপুর গ্রামে। বাবা জমির আলী ও মা আসমা বেগমের চার মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে নাদিয়া তৃতীয়।  
 
ধর্মভীরু নাদিয়ার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্রিটেনে। লন্ডন থেকে চল্লিশ মাইল দূরবর্তী শহর লুটনে কেটেছে নাদিয়ার শৈশব ও কৈশোর। বর্তমানে স্বামী সন্তান নিয়ে উত্তর ইংল্যান্ডের লিডসে বসবাস করলেও অধিকাংশ সময়ই থাকেন লুটনে।  
 
লুটনের স্থানীয় একটি হাইস্কুলে অধ্যয়নকালে সময় থেকেই তিনি কেক ও নানা ধরনের পিঠা জাতীয় খাদ্যদ্রব্য তৈরি করতেন। মার্শাল নামের তার একজন স্কুল শিক্ষক নিজ বাড়িতে ট্রাডিশনাল ব্রিটিশ কেক, পেস্টিং ও পুডিং তৈরিতে নাদিয়াকে উৎসাহিত করেন। বাড়িতে এসে নাদিয়া শিক্ষকের শেখানো পদ্ধতিতে এসব তৈরি করতেন। ধীরে ধীরে এলাকায় ব্যাকার হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকেন তিনি। এরই এক পর্যায়ে বিবিসিতে প্রচারিত ‘গ্রেট বৃটিশ বেক অফ’ অনুষ্ঠানে নাম লেখান নাদিয়া। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
 
নাদিয়ার পরিবারে আনন্দের বন্যা
এদিকে, ‘গ্রেট বৃটিশ বেক অফ’ এ শিরোপা জয়ে আনন্দে ভাসছে নাদিয়ার পরিবারসহ ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটি। বিজয় ঘোষণার পর পরই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে। সবার মধ্যেই আনন্দ, উচ্ছ্বাস। মেয়ের বিজয়ে বাবা জমির আলী নিজের উচ্ছ্বাস জানাতে গিয়ে বাংলানিউজকে বলেন, 'আমি কল্পনাও করিনি বাংলাদেশের অন্যতম এই গৌরব লুকিয়ে আছে আমার ঘরে'। তিনি বলেন আমার স্ত্রী, সন্তানসহ পুরো পরিবারের কাছে আজকের দিনটি সবচেয়ে স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে।  
 
জমির আলী বলেন, নাদিয়ারা প্রজন্মের রোল মডেল হোক, প্রতি বছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নতুন নাদিয়া বেরিয়ে আসুক এটাই কামনা আজকের দিনে আমার'। তিনি বাংলানিউজের মাধ্যমে তার মেয়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।  
 
বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অলি খান নাদিয়ার বিজয়ে খুবই খুশি। নাদিয়ার জন্ম ও বেড়ে ওটার শহর লুটনে বসবাসরত অলি খান বলেন, 'রাজনীতি থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই আজ আমাদের সন্তানরা দাপটের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। নাদিয়া সেরা বেকার হওয়া আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অবশ্যই একটি ভালো প্রভাব ফেলবে বলে আমরা আশা করি। আর এভাবেই আমাদের কমিউনিটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে ব্রিটিশ মূলধারার প্রতিটি সেক্টরের শীর্ষ পর্যায়ে, নাদিয়ার বিজয় এই আশাই নিয়ে এসেছে আমাদের জন্য'।
 
বাংলাদেশ সময়: ০৪৪২ ঘণ্টা, অক্টোবর ৮, ২০১৫
এমজেড 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa