ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

আইন ও আদালত

নালা সংস্কার করলে সাদিয়ার মৃত্যু এড়ানো যেতো, হাইকোর্টে প্রতিবেদন

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭৩৬ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২২
নালা সংস্কার করলে সাদিয়ার মৃত্যু এড়ানো যেতো, হাইকোর্টে প্রতিবেদন

ঢাকা: চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে নালায় পড়ে কলেজছাত্রী শেহেরীন মাহমুদ সাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কেউই দায় স্বীকার করেনি।

তবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তদন্ত রিপোর্ট বলছে, সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ফুটপাত সংস্কারের সময় নালার ওপরের অংশ সংস্কার করে অথবা নালাটির সম্মুখ অংশ সুরক্ষিত করে এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।

উচ্চ আদালতের নির্দেশে সাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় এমন অনুসন্ধান প্রতিবেদন দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়েছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট মুরাদপুর এলাকায় খালে পড়ে তলিয়ে যান সালেহ আহমদ। এর পরের মাসে ২৭ সেপ্টেম্বর আগ্রাবাদে নবী টাওয়ারের কাছাকাছি নাছিরছড়া খালে পড়ে তলিয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সেহেরীন মাহবুব সাদিয়া। পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টায় তার লাশ উদ্ধার হয়।

এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর এ বিষয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে ২৫ নভেম্বর হাইকোর্টে সাদিয়ার মৃত্যুর জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট করে সাদিয়ার পরিবার এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র।

ওই রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পাশাপাশি কার অবহেলায় সাদিয়ার মৃত্যু, তা অনুসন্ধান করে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। সে অনুসারে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার তানভীর হাসান চৌধুরীকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেন। অনুসন্ধান শেষে এ প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করা হয়।

প্রতিবেদনের মতামত অংশে বলা হয়েছে, সেহেরীন মাহমুদ সাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কেউই দায় স্বীকার করেনি। উভয় কর্তৃপক্ষ মেয়েটি অসাবধানতাবশত গার্ডারের ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে পা পিছলে নালায় পড়ে মারা যায় বলে উল্লেখ করেন এবং এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। ঘটনাস্থলের নালার অবস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দুর্ঘটনাস্থলে নালা সংলগ্ন রাস্তায় ইতোপূর্বে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নির্মিত ডাস্টবিন ও দেয়াল থাকায় তা নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করছিল কিন্তু ‘লালখান বাজার হতে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এ ডাস্টবিন ভেঙে ফেলা হয় এবং রাস্তা ও ফুটপাথ সংস্কার করা হয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সেখানে রাস্তার পাশে ফুটপাতের কাজ করা হলেও রাস্তা সংলগ্ন নালার ওপরের অংশে ফুটপাতের কাজ করা হয়নি এবং কোন নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়নি। ফুটপাত হয়ে হাঁটার জায়গায় শুধুমাত্র নালার উপরের অংশে কোনো স্ল্যাব বসানো বা কোনো সংস্কার কাজ না করার কারণে আনুমানিক ১১ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ ফুট প্রস্থ জায়গা অনেকটা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, যা নালায় পড়ে যাওয়ার দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এক্ষেত্রে ফুটপাত হয়ে কেউ সোজা হেঁটে এসে নালার অংশ খেয়াল না করলে বা অন্ধকারে ফুটপাত ধরে হাঁটলে তিনি সহজেই নালায় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

ডাস্টবিন ভেঙে ফেলার কারণে নালার সম্মুখে শুধু পূর্বে স্থিত ২ ফুট উচ্চতা ও ১ ফুট প্রশস্থতা বিশিষ্ট হুইল গার্ড ব্যারিয়ারটি সুরক্ষা ও ফুটপাতের দুই অংশের সংযোগ হিসেবে সেটা করছিল কিন্তু ফুটপাত হয়ে চলার ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট ছিল না। ফুটপাত হয়ে হাঁটার সময় নালার সামনাসামনি এসে ফুটপাত থেকে রাস্তায় নেমে হেঁটে যেতে হতো অথবা ১ ফুট প্রশস্থ হলে গার্ড ব্যারিয়ারের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হতো, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। হুইল গার্ড ব্যারিয়ায়ের ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে মেয়েটি পা পিছলে নালায় পড়ে যায় বলে জানা যায়।

নালাটি আনুমানিক ১১ ফুট চওড়া এবং ১০ ফুট গভীর; এটি সড়কের পাশে অবস্থিত হওয়ায় এবং এই নালার প্রান্তে রাস্তা সংশ্লিষ্ট জায়গায় বক্স কালভার্ট থাকায় এখানে দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন ছিল এবং নালা সংলগ্ন জায়গা উঁচু দেয়ালের মাধ্যমে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জন্য প্রয়োজন ছিল।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ওই ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করলেও নালার অবস্থান ও পানি প্রবাহ বিবেচনা করে ওই স্থানে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। যেহেতু আগ্রাবাদ বাদামতল মোড়ের সন্নিকটে অবস্থিত হওয়ায় শেখ মুজিব রোডের ফুটপাত দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চলাচল করে এবং রাস্তা সংলগ্ন নালাটি রাস্তার নিচ দিয়ে বক্স কালভার্টে মিলিত হয়েছে, তাই যে কেউ যাতে সহজে নালায় পড়ে বক্স কালভার্টে যেতে না পারে সেজন্য পূর্বের ডাস্টবিন ভেঙে ফেলার সময় নালাটিকে সুরক্ষিত করা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল।

এছাড়া, নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে ওই স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। সর্বোপরি, নালার অবস্থান, প্রবাহ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ফুটপাত সংস্কারের সময় নালার ওপরের অংশ সংস্কার করে অথবা নালাটির সম্মুখ অংশ সুরক্ষিত করে বর্ণিত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আইনজীবী মো. শাহীনুজ্জামান বলেন, প্রতিবেদটি দাখিলের পর আদালত নথিভুক্ত করে রেখেছেন। পরবর্তীতে এ বিষয়ে আদালত আদেশ দেবেন।

বাংলাদেশ সময়: ১৭৩৫ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২২
ইএস/এমজেএফ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa