ঢাকা, শনিবার, ১৩ মাঘ ১৪২৯, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫ রজব ১৪৪৪

আইন ও আদালত

দলীয় পরিচয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন

সাইফ উদ্দিন আহমেদ | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩২৯ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৮, ২০১৫
দলীয় পরিচয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ মানুষ ছিল দরিদ্র। গত ১৫ বছরে দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নেমেছে।

দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও এখনও প্রায় ৪ কোটি মানুষ দরিদ্র। এর মধ্যে চরম দরিদ্রের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি।

জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অনুসারে ২০১৫ সালের টার্গেট তিন বছর আগেই অর্জন করে বাংলাদেশ। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সম্পূর্নভাবে দারিদ্র্যমুক্ত করতে হলে গ্রামীণ উন্নয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। আর এ কাজে সৃজনশীল নেতৃত্ব দিতে হবে স্থানীয় সরকারকে।

বর্তমান সরকার তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন এবং দেশে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নেয়া এ সিদ্ধান্তটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক চলছে। এ সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে যত যুক্তিই থাকুক, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে যাতে প্রতিষ্ঠানটিতে জনগণের কাছে প্রকৃতই গ্রহণযোগ্য এবং উপযুক্ত নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে হবে যাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ প্রকৃতই পিছিয়ে পড়া জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারে।

সর্বোপরি, জনঅংশগ্রহণ এবং জনগণের নেতৃত্বে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, আত্মনির্ভরশীল গ্রামীণ জনপদ গড়ে তুলতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তরেই দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচন করতে আইনের সংশোধন অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। নির্বাচনে মেয়র, চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের দলীয় মনোনয়ন ও দলীয় প্রতীক থাকতে হবে।

বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪০টি দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকবে। স্থানীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ রাখা হলেও তাদের জন্য বিধি ঠিক করবে নির্বাচন কমিশন।

এ বছরের ডিসেম্বরে পৌরসভা নির্বাচন দিয়েই শুরু হবে দলীয় মনোনয়নের ভিত্তিতে প্রথম স্থানীয় নির্বাচন। সময় কম থাকায় আইনের বদলে অধ্যাদেশ করে ওই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।

১২ অক্টোবর ২০১৫ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রীসভার নিয়মিত বৈঠকে স্থানীয় সরকারের ৫টি প্রতিষ্ঠানের সংশোধন আইন একযোগে অনুমোদন করা হয়। আইনগুলো হচ্ছে: স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) সংশোধন আইন, ২০১৫; উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৫; জেলা পরিষদ (সংশোধন) আইন, ২০১৫; স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন আইন ২০১৫ এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) সংশোধন আইন, ২০১৫।

এসব আইনের আওতায় পর্যায়ক্রমে ৩২৩টি পৌরসভা, ৪ হাজার ৫৫৩ টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৮৮টি উপজেলা, ১১টি সিটি কর্পোরেশন এবং ৬৪টি জেলা পরিষদ নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে।

উদ্যোগের স্বপক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভুঁইয়া বলেন, সরকার তৃণমূল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন এবং দেশে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংসদীয় ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দলীয় মনোনয়নের ভিত্তিতে হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই দুটি দেশের উদাহরণ দেয়ার কারণ, বাংলাদেশে বিদ্যমান ব্যবস্থা এসব দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অনুরুপ।

সরকার পক্ষ মনে করছে, যেহেতু নির্দলীয় এই নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীরাই অংশ নেন, তাই এই স্ববিরোধিতার আর প্রয়োজন নেই।

১৪ দলের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটর মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, এর ফলে আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র বাইরে তৃণমূলে অন্যান্য রাজনৈতিক দল সংগঠিত ও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাবে।

সরকারি এই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক দিকগুলো দেশের স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরাও তুলে ধরেছেন। তাদের যুক্তি হলো, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনেক এলাকায়ই কিছু স্বীকৃত ভালো মানুষকে অংশ নিতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররাই এ ধরনের মানুষকে নির্বাচনে দাঁড়াতে উৎসাহিত করে, বাধ্য করে। তারা কোনো দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। দলীয়ভিত্তিতে নির্বাচন হলে এ ধরনের মানুষের অংশগ্রহণ ও নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। কারণ, তারা নির্বাচনে অংশ নিয়ে কোনো দলের বিরাগভাজন হতে চাইবেন না।

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন হলে প্রার্থীসংখ্যা কম হয়। তাতে ভালো প্রার্থীর সংখ্যা কমে। ভালো প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে। কারণ, ভোটারদের বিকল্প বাছাইয়ের সুযোগ সীমিত হয়। প্রভাবশালী, বিত্তশালী ও রাজনৈতিক দাপটে থাকা খারাপ লোক নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ তৈরি হবে।

আমরা সাধারন জনগণ সবসময়ই চাই, রাজনৈতিক দলগুলোই জনগণের দায়িত্ব নিক। ন্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সৃজনশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করুক। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের নির্বাচন কমিশন এবং তাদের ভূমিকা নিয়ে তাদের রাজনৈতিক দল এবং জনগণের কোনো অভিযোগ নেই।

স্থানীয় সরকার, বিশেষত ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের অন্যতম প্রধান সমস্যা হল অর্থায়ন ও অপ্রতুল জনবল। বিদ্যমান আইনে অর্থসম্পদসহ জনবল ও কার্যাদি হস্তান্তরের যে বিধান রয়েছে তা কার্যকর করলে পরিষদের সক্ষমতা ও কার্যকারিতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে।  

নেতিবাচক আশঙ্কাগুলোকে ইতিবাচক রুপান্তর করতে হলে সরকার ও সব দলের তথা জনগণের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। সর্বত্র আইনের শাসন ও নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

সরকারের এ ইতিবাচক সিদ্ধান্তের সুফল পেতে হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

সাইফ উদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর (গভর্ন্যান্স), দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ সময়: ১৩২৯ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৮, ২০১৫

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa