ঢাকা, শনিবার, ১৪ মাঘ ১৪২৯, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫ রজব ১৪৪৪

আইন ও আদালত

গহীন অরণ্যে গণকবর, তবু থামছেনা মানব পাচার

এরশাদুল আলম প্রিন্স, ল’ এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩০২ ঘণ্টা, জুন ১৮, ২০১৫
গহীন অরণ্যে গণকবর, তবু থামছেনা মানব পাচার

সম্প্রতি মানব পাচার নিয়ে গণমাধ্যমে যেসব খবর বেরিয়েছে তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। মানবপাচারের শিকার হয়ে জীবিকার জন্য অবৈধ পথে সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে নির্মমতার শিকার হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন বহু মানুষ।



দেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় সংঘবদ্ধ একটি চক্র বিভিন্ন পয়েন্ট বা উপকূল ব্যবহার করে নৌপথে মানুষকে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠাচ্ছে। পাচারকারীদের কাছে কক্সবাজার উপকূল অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পয়েন্ট। মানব পাচারকারীদের প্রাথমিক গন্তব্য থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এমনকি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।

কেউ কেউ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলেও অনেকেই দিনের পর দিন ভাসতে থাকে অথৈ সাগরে। আবার অনেকে পুলিশের হাতে ধরা পরে কারাবরণ করে। কারো কারো শেষ ঠিকানা হয় গণকবর। গণমাধ্যমের এ চিত্রগুলো আধুনিক দাসত্বের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রচলিত মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনটি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় মানব পাচারের এমন ঘটনাগুলো ঘটছে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।  

সরকার এক্ষেত্রে যুগোপযুগি একটি আইন প্রণয়ন করেছে। মানব পাচারের বর্তমান চিত্র গণমাধ্যমে আসারও তিন বছর আগে ২০১২ সালে সরকার মানব পাচার  প্রতিরোধ ও দমন আইন প্রণয়ন করে। এ আইনে মানব পাচারের সবোর্চ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন। সেই সাথে মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও অধিকার বাস্তবায়ন ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরা।

শেষোক্ত বিষয়টি অর্থাৎ নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার জন্য ২০১৩ সালে একটি পৃথক আইন প্রণয়ন করা হয়।

কিন্তু আইন থাকাই যথেষ্ট নয়। আইনের প্রয়োগই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আইনের প্রয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত তাদের সদিচ্ছা ও সক্রিয় ভূমিকাকে পাশ কাটিয়ে কোনো আইনের সুফল পাওয়া সম্ভব না।  

সুনির্দিষ্ট আইন থাকার পরেও মানব পাচারের সাথে সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলোর মামলা হয় অন্য আইনে। এর ফলে অপরাধীরা আইনের ফাক দিয়ে বের হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। অপরদিকে এ বিশেষ আইনটিও কার্যকর হতে পারেনা।

ফৌজদারি অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তদন্ত। পূর্ণাঙ্গ, নির্ভেজাল ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া ন্যায়বিচার আশা করা যায়না। তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো দূর্বলতা থাকলে প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোয়ার বাইরেই থেকে যাবে।

মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনাল (২১ ধারার ১ উপধারা) কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি। পাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার কার্য পরিচালনা করতে পারলে প্রতিরোধ ও দমন অনেকটাই সহজতর হবে। গত মাসে মাননীয় আইন মন্ত্রী সাত বিভাগে সাতটি ট্রাইবুনাল প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দিয়েছেন।  

মানব পাচারের সাথে অভিবাসনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। নিরাপদ অভিবাসন যেখানে অনিশ্চিত, মানব পাচারের শুরু সেখান থেকেই। যদিও অভিবাসন ও মানব পাচারের আরো নানা দিক রয়েছে।

মানবপাচার একটি আর্ন্তজাতিক ও আন্ত:দেশীয় অপরাধ। তাই দুটি আইনই আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সঙ্গতি বিধান করে করা হয়েছে। আইনে কেবল পাচারকারীই নয়, দালালচক্রের বিরুদ্ধেও মামলা করার বিধান আছে। আইনে মানব পাচারের যে সঙ্গা দেয়া আছে তাতে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোকে (৩৬০, ৩৬১ ও ৩৬৩) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

মানব পাচারের জন্য অনধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান আছে। আছে জরিমানার বিধানও। এছাড়া বিদ্যমান আইনে সংঘবদ্ধ মানব পাচারের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।

মানব পাচারের শিকার লোকজনের সহায়তা ও মানব পাচার প্রতিরোধের জন্য যে তহবিল করার কথা আছে তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। অবার অন্যদিকে অভিবাসন আইনের ২৯ ধারা অনুযায়ী বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে মানব পাচারের শিকার লোকদের সাহায্যের জন্য হেল্পডেস্ক করার বিধান আছে তার বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সর্বোপরি আইনে ‘জাতীয় মানব পাচার দমন সংস্থা’ নামে একটি কর্তৃপক্ষের বিধান আছে।  

মানব পাচার দমন ও প্রতিরোধে যৌথ বা পারস্পরিক আইনি সহায়তা এবং সহযোগিতা মানব পাচার রোধের একটি বড় উপায়। পাচারের শিকার ব্যক্তিকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করার আইনগত বিধানও আছে। এ আইনের একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, সাক্ষীদের সুরক্ষার বিধান। আইনে সাক্ষীদের জন্য পুলিশী নিরাপত্তার বিধানও আছে।

অসহায় ব্যক্তিদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা সেবা, পুনর্বাসন এবং পরিবারের সাথে সাথে পুনর্মিলনের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক আশ্রয় কেন্দ্র এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিধান আছে। ।

জাতিসংঘের শরনার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের এক তথ্য মতে, ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে ২৫ হাজার লোক অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালের তুলনায় তা দ্বিগুন। এর অর্ধেকই সমুদ্রপথে গিয়েছিল।

মানব পাচারের পেছনের আর্থ-সামাজিক কারণগুলো খুজেঁ বের করে আনতে হবে। তা না হলে মানব পাচার প্রতিরোধ সম্ভব হবে না। বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ, জনসচেতনা সৃষ্টি ও আর্থ-সামাজিক কারণ চিহ্নিত করে মানব পাচার রোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১২৫০ ঘণ্টা, জুন ১৮, ২০১৫

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa