ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৫ রজব ১৪৪৪

আইন ও আদালত

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং প্রতিরোধে করণীয়

দিলীপ কুমার সরকার | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৯৪৫ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৪
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং প্রতিরোধে করণীয়

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৫ জানুয়ারি থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হচ্ছে। ভোট প্রদানের অপরাধে তাঁদের ওপর শারীরিক হামলা, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়া, বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাট করা, এমনকি ক্ষেতের ফসল-পানের বরজ নষ্ট করা কোন কিছুই বাদ থাকছে না।



গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটের দিন সন্ধ্যায় যশোরের অভয়নগর উপজেলার চাঁপাতলা গ্রামের মালোপাড়ায় তান্ডব চালায় দুর্বৃত্তরা।

১১২টি মৎসজীবী হিন্দু পরিবার এ হামলার শিকার হয়। দুই ঘন্টা ধরে চালানো এ তাণ্ডবে ২০ জন আহত হয়েছেন।

জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে তাঁদের ঘরবাড়ি। শুধু অভয়নগরেই নয়, দিনাজপুর সদর উপজেলার চেহেলগাজী ইউনিয়নের কর্ণাই গ্রামের ছয়টি হিন্দু পাড়ায় হামলা চালিয়ে দেড় শতাধিক বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করে দুর্বত্তরা। লোকজনদের মারধর করা হয়। চালানো হয় লুটপাট।
এ ছাড়াও জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, গাইবান্ধার বেড়াডাঙ্গা, নোয়াখালীর হাতিয়া, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ, রংপুরের পীরগাছা, মৌলভীবাজারের বড়লেখা, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, সাতক্ষীরা, মাগুরা, সুনামগঞ্জ ও জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।

জয়পুহাট ও গাইবান্ধায় ইতোমধেই দুইজনের মৃত্যুর খরর পাওয়া গিয়েছে। শুধু হিন্দু সম্প্রদায় নয়, আদিবাসীদের ওপরেও হামলা চালানো হচ্ছে।

ভূক্তভোগী জনগণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য থেকে জানা যায়, জামায়াত-শিবির ও বিএনপি’র নেতা-কর্মী-সমর্থকরা এই হামলা চালিয়েছে।

পাশাপাশি আমরা আরও জেনেছি, অভয়নগরের হামলার এক ঘন্টা পূর্বেই হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে পুলিশ প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা চাওয়া হলেও তারা কেউ এগিয়ে আসেন নি।

২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় সময়েও আমরা তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিষ্ক্রিয় দেখেছি। সেই নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ঘটনার সঙ্গে জড়িত নিজেদের লোকদের রক্ষা করেছে।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে বিষয়টি নিয়ে তাঁরা শুধু ‘রাজনীতিই’ করেছে কিন্তু অপরাধীদের শাস্তির উদ্যোগ নেয়নি।

এই সময় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাসমূহের তদন্ত করা হলেও, দোষীদের বিচার হয়নি। ফলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ গোষ্ঠী, রাজনৈতিক অপশক্তি ও সুযোগ সন্ধানী দুর্বৃত্তরা আরও বেশি সাহসী হয়ে উঠেছে।

অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়ার কারণেই পরবর্তীকালে রামুতে গুজব ছড়িয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, একইভাবে গুজব ছড়িয়ে পাবনার সাঁথিয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাকে কেন্দ্র করে বরিশালের চর কাউয়ার কালীগ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা আমরা দেখেছি।

পাশাপাশি সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম ও মহেন্দ্রনগর, সাতক্ষীরা ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সুজনসহ দেশের সচেতন মহল অনেক আগে থেকেই বলে আসছিলেন যে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সরকার ও প্রশাসন যেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানে পূর্বপ্রস্তুতি রাখে। কিন্তু সরকার ও প্রশাসন সেই সকল কথায় গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয় না। ফলে, এই ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা নির্বিঘেœ ঘটে চলেছে।
আরও যে বিষয়টি আমাদের উদ্বিগ্ন করে, তা হচ্ছেÑ গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিভিন্ন ঘটনায় ক্ষমতাসীন দল ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা।
  
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা মনে করছি, সরকার, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না, বরং কোথাও কোথাও জড়িয়ে পড়ছে ঘটনার সঙ্গে।

প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসমূহসহ সচেতন নাগরিকদেরকেও যথাসময়ে আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে না।

প্রধান বিরোধীদল বিএনপি, জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে নিজেরাও এইসকল অপকর্মে সম্পৃক্ত হচ্ছে, কোথাও কোথাও নেতৃত্ব দিচ্ছে।

অথচ পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, আমাদের এই জনপদে যুগ যুগ ধরে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ও আদিবাসী সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছে।

অতীতে যখনই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনা ঘটছে, তখনি দেখা গিয়েছে এর পেছনে কাজ করেছে হীন রাজনৈতিক স্বার্থ বা স্থানীয় স্বার্থান্বেষী-সুযোগ সন্ধানীদের কারসাজি।

সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলের আকাঙ্খাও সংখ্যালঘু নির্যাতনের একটি বড় কারণ। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা আরও দেখতে পাই, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় ৩৯% হিন্দু জনগোষ্ঠী এখন ৯%-এ নেমে এসেছে, হ্রাস পাচ্ছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও।
প্রতিটি আদম শুমারীতেই দেখা যায়, এই হার নিম্নগামী।

সংখ্যালঘু নির্যাতনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলোকে যদি আমরা চিরতরে বন্ধ করতে অথবা বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিবিধান না করে না পারি, তবে ভবিষ্যতে স্বদেশভূমি থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বিতাড়িত করার দায়ে জাতিগতভাবে আমাদেরকে একদিন বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

তাই সকল ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা স্থায়ীভাবে বন্ধে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এখনই।

এক্ষেত্রে সরকারকেই নিতে হবে মূল দায়িত্ব। এখনি সরকারকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা-নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাগরিক হিসেবে তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করতে হবে।

প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনাকাক্সিক্ষত এসকল ঘটনা প্রতিরোধে এগিয়ে এসে আইনি দায়িত্ব পালন করতে হবে।

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিসহ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সচেতন সকল নাগরিকদের দাঁড়াতে আক্রান্তদের পাশে এবং এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সংঘবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী জামায়াত-শিবিরসহ ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে রাজনীতি করতে হবে এবং আন্দোলনের নামে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাসমূহের বিষয়ে সরকারকে অবিলম্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে এবং দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

পাশাপাশি সংসদীয় গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধারণ করে সরকারপ্রধানকে মন্ত্রী পরিষদ এবং মন্ত্রী পরিষদকে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করে ও আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে ’৭২-এর সংবিধান পুনরুজ্জীবিত করতে হবে এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এদেশে কারো অনুগ্রহে বসবাস করে না, এটা তাঁদের জন্মগত ও সাংবিধানিক অধিকার।

তাই সকলেই যদি স্ব স্ব অবস্থানে থেকে রাষ্ট্র প্রদত্ত, পেশাগত ও নাগরিক হিসেবে দায়-দায়িত্ব, অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতার কথা মনে রেখে সঠিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হই, তবে এই ধরনের অনাকাক্সিক্ষত সকল ঘটনাই আমরা প্রতিরোধ করতে পারবো।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে মনে রাখতে হবে- এ দেশ, এ মাটি আমার। জন্মগতভাবেই আমরা এদেশের নাগরিক। কারো অনুগ্রহে আমরা এখানে বসবাস করছি না।

তাই ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে আমরা একা নই। অনেক শুভাকাংঙ্খি, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি এবং সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ আছে আমদের পাশে।
আক্রান্ত হলে সকলের সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন। নিজভূমে পরবাসী না হয়ে, নাগরিক হিসেবে সকল প্রাপ্য অধিকার নিয়েই স্বদেশ ভূমিতে সকলকে বসবাস করতে হবে।

নিশ্চয়ই সকলের সম্মিলিত প্রয়াশে আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমিকে আমরা হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্ট্রান-আদিবাসী তথা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের জন্য বাসযোগ্য করে তুলতে পারবো।          
দিলীপ কুমার সরকার, কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী, সুজন

বাংলাদেশ সময়: ১৯৪৬ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa