ঢাকা, বুধবার, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ০৫ আগস্ট ২০২০, ১৪ জিলহজ ১৪৪১

ইচ্ছেঘুড়ি

ছোটগল্প

বীরের নাতনী

সুমাইয়া বরকতউল্লাহ্ | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১০-১২-২৮ ০৪:৪১:৫২ পিএম
বীরের নাতনী

অর্পিতা আমার বান্ধবী। আমরা একই কাশে পড়ি।

তার সাথে আমার খুব ভাব। তাদের বাড়িতে বছরে দুটো বড় অনুষ্ঠান হয়। একটি মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা দিবসে আরেকটি ১৬ ডিসেম্বরে মহান বিজয় দিবসে। সে আমাকে দাওয়াত করে। আমি তার বাড়িতে গিয়ে উৎসবে যোগ দেই।

অর্পিতার দাদা কাদের মাস্টার নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। ১৯৭১ সালে যখন দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তখন অর্পিতার দাদা চাকরি ফেলে যুদ্ধে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

একদিন সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। যাওয়ার সময় তিনি অর্পিতার দাদিকে বলেছিলেন, ‘আমি যুদ্ধে গেলাম। তোমরা সাবধানে থেকো। ভয় পেয়ো না। কোন মুক্তিযোদ্ধা যদি বিপদে পড়ে আমাদের বাড়িতে আসে তবে তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করবে। আর আমি দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরছি না। আমি যদি না ফিরে আসি তবে মনে করবে আমি দেশের জন্য জীবন দিয়েছি। তোমরা স্বাধীন দেশে থাকবে। এর চেয়ে গৌঁরবের আর কিছুই নেই। ’
 
অর্পিতার দাদা চলে যান যুদ্ধে। তারপর অনেকদিন তাঁর কোনো খবর নেই। সারাদেশে প্রচন্ড যুদ্ধ। দাদি দাদার চিন্তায় অস্থির হয়ে যান। খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দেন। দাদা আর ফিরে আসেন না।

প্রায় ৬ মাস পরে অর্পিতাদের বাড়িতে একটা লাশ নিয়ে আসে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। অর্পিতার দাদার লাশ। বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা বললেন, ‘আপনারা কেউ কাঁদবেন না, তিনি পাকিস্তানিদের সাথে সামনাসামনি যুদ্ধ করে ২ জনকে গুলি করে মেরেছেন। পরে পাকবাহিনীর একটা গুলি এসে তার বুকে লাগতেই তিনি ঢলে পড়ে যান। তিনি বীরের মতো যুদ্ধ করে শক্রুকে মারতে মারতে শহীদ হয়েছেন। তিনি আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমাদের গর্ব। সবাই তাঁকে স্যালুট করবে। ’

তারপর থেকে অর্পিতার দাদির উদ্যোগে বাড়িতে নিয়মিত অনুষ্ঠান হয়। এখন দাদার জন্য কেউ আর কাঁদে না, সবাই গর্ব করে। বছরের দুবার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কাদের মাস্টারের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে তাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়িতে এসে অনুষ্ঠান করে।

বাড়ি ভর্তি থাকে মানুষ। এলাকার ছেলে-মেয়ে ও বুড়োরাও আসে অনুষ্ঠানে। উঠানে সামিয়ানা টাঙ্গানো হয়, থাকে চেয়ার টেবিল। সাধারণ জ্ঞান ও ছোটদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কারও বিতরণ করা হয়। এলাকার কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এসে অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন। সেই স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় মুক্তিযুদ্ধের কত অজানা আর ভয়ঙ্কর সব ঘটনা।

যুদ্ধের সময় কত নির্মম ও কত বীরত্বের ঘটনা যে ঘটেছে তা তাদের মুখে শোনার পর আমি স্থির থাকতে পারি না। আমার রক্ত টগবগ করে। আমি মনে মনে বলি সারাদেশেই যদি মুক্তিযোদ্ধারা নিজের মুখে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা বলতো আর আমাদের মতো শিশুরা শুনতো তা হলে কতো উপকার হতো। কারণ, আমি মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে শুনে আমাদের স্বাধীনতা স¤পর্কে যতোটা না জেনেছি বই পড়ে ততটা জানতে পারতাম না।

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র যেমন মানুষের কাছে বই পৌঁছে দেয় পড়ে জ্ঞানী হওয়ার জন্য তেমনি সরকার যদি মুক্তিযোদ্ধাদের পৌঁছে দিতো দেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য শিশুর মাঝে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনানোর জন্য তা হলে শিশুরা জানতে পারতো মুক্তিযুদ্ধের আসল ঘটনা।

আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত কাহিনী শোনার পর এখন মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনা আমার ভেতরে জ্বলজ্বল করছে। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের মূল্যবান সম্পদ। যাঁরা যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন তাঁদেরকে স্মরণ করা ও যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদেরকে মনে প্রাণে ভালোবাসা আমাদের উচিৎ। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের মনেপ্রাণে ভালবাসি আর শ্রদ্ধা করি। আমি অর্পিতাকেও ভীষণ ভালোবাসি। কারণ সে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাতনী।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa