ঢাকা, বুধবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২২ মে ২০২৪, ১৩ জিলকদ ১৪৪৫

ইসলাম

জোহর সুলতানের সুন্দর মসজিদে

জাকারিয়া মন্ডল, সিনিয়র আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৫৩৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৭, ২০১৬
জোহর সুলতানের সুন্দর মসজিদে ছবি- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

পাহাড়ের ওপরে মসজিদটা যেনো আকাশের পটভূমিতে আঁকা। চারপাশের পাম-খেজুরের উপস্থিতি কেবল বুঝিয়ে দিচ্ছে, আকাশ নয়-এটা মর্ত্যেরই মসজিদ। নতুবা এটিকে মেঘরাজ্যের মসজিদ বলে ভ্রম হওয়াটা বিচিত্র ছিলো না। 

জোহর বাহরু (মালয়েশিয়া) ঘুরে: পাহাড়ের ওপরে মসজিদটা যেনো আকাশের পটভূমিতে আঁকা। চারপাশের পাম-খেজুরের উপস্থিতি কেবল বুঝিয়ে দিচ্ছে, আকাশ নয়-এটা মর্ত্যেরই মসজিদ।

নতুবা এটিকে মেঘরাজ্যের মসজিদ বলে ভ্রম হওয়াটা বিচিত্র ছিলো না।  

উঁচু উঁচু গাছগুলো যেনো মাথা দুলিয়ে বাতাস করছে অতিকায় মসজিদটাকে। দক্ষিণ দিকে রাস্তা পেরুলেই জোহর প্রণালী। ওপাড়ে মাত্র সোয়া ১ কিলোমিটার দূরের সিঙ্গাপুরের দালান সারি বেশ নজরে আসে এখান থেকে। পাশেই সুরাহ আদালত, তারপর রাজ্যের প্রথম হাসপাতাল সুলাতানা আমিনা মেডিকেল।

পাহাড় পাদদেশের প্রণালীটাকে এখানে বলা হয় সাগর। ওই সাগরের পানিতে এক সময় অজু গোসল সারতো এই মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসুল্লিরা। এখন রাস্তাটা মসজিদের কাছ থেকে একটু দূরে সরিয়ে দিয়েছে প্রণালীটাকে।  

আর পাহাড়ের মাথায় এখনো মাথা তুলে আকাশ ছুঁতে চাওয়া মসজিদটার শরীরে মূলত সাদা রঙ। ছাদের কার্নিশ, দরোজার খিলান আর জানালায় খাঁজ কাটা। মিনারগুলোতে ঠিক ব্রিটিশ ওয়াচ টাওয়ারের আদল। পুরো মসজিদটাতে মিশ্র স্থাপত্যের ছাপ থাকলেও ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের দাপুটে উপস্থিতি সহজেই নজর কাড়ে।

এই মসজিদ দিয়েই তো পাল্টে যেতে শুরু করে জোহর। শুরু হয় আধুনিকতায় উত্তোরণ। প্রশাসন আর অবকাঠামোর ব্যাপক সংস্কার করে আধুনিক জোহরের জনক হয়ে ওঠেন সুলতান আবু বকর। আধুনিক জোহরের জন্ম তাই মালয়েশিয়ার অন্যতম সুন্দর এই মসজিদ থেকেই।
  
মালয়েশিয়ার সর্বদক্ষিণ অঞ্চলের রাজ্য এই জোহর আরবি সম্মানসূচক দারুল তা’জিম বা মর্যাদার বাসভূমি নামেও পরিচিত। আর রাজধানী জোহর বাহরুর পরিচিতি ছিলো তানজুং পুতেরি বা রাজপুত্রের জন্য মালয়ের অন্তরীপ হিসেবে। রাজধানী জোহর হলেও এর রয়েল সিটি মুয়ার। পুরনো রাজধানীর নাম জোহর লাম।  

১৯ হাজার ২১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জোহর রাজ্যের উত্তরে পাহাং, উত্তর-পশ্চিমে মালাক্কা ও নাগেরি সেমবিলান। দক্ষিণে জোহর প্রণালী। এ রাজ্যের পূর্ব-দক্ষিণ চীন সাগর আর পশ্চিমে মালাক্কা প্রণালীতে ইন্দোনেশিয়ার জলসীমা। তবে ৫শ’ বছর আগে আরো বিস্তৃত ছিলো জোহর রাজ্য।  

১৫১১ সালে পর্তুগিজ আগ্রাসনের মুখে মালাক্কা সালতানাতের পতন হলে শেষ সুলতান মাহমুদ শাহ এর পুত্র দ্বিতীয় রিয়ায়াত শাহ পালিয়ে চলে আসেন জোহরে। তার হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় দোর্দণ্ড প্রতাপশালী জোহর সালতানাত। গোটা পাহাং, বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার রিয়াউ দ্বীপপুঞ্জ আর সুমাত্রা দ্বীপের অধিকাংশ চলে আসে এ সাম্রাজ্যের অধীনে।  

উড়ে এসে জুড়ে বসা বিদেশি শক্তির পাশাপাশি আঞ্চলিক গোত্রগুলোর সঙ্গেও লড়াই করে মালাক্কা প্রণালীতে প্রভাব বিস্তার করে জোহর। কখনো কখনো গড়ে নেয় কৌশলগত জোট।
 
১৬৪১ সালে জোহর ও ডাচদের মিলিত বাহিনী ফের দখলে নেয় মালাক্কা। পরে দুর্বল হয়ে পড়ায় ১৭ শতকের শেষ দিকে ক্ষুণ্ন হতে শুরু করে সার্বভৌমত্ব। মাথা চাঁড়া দেয় বুগিসরা। আরো অনেক উত্থান-পতনের পর ১৮৫৫ সালে সিঙ্গাপুরে অবস্থান নেওয়া ইংরেজদের সঙ্গে জোহরের সুলতান আলীর চুক্তি হয়। সে চুক্তি অনুযায়ী রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়া হয় দাতো তেমেনগঙ দায়াঙ ইব্রাহিমের কাছে। এই ইব্রাহিমই প্রতিষ্ঠা করেন তামানজুঙ পুতেরি, পরবর্তীতে জোহর বাহরু নাম দিয়ে যেটা হয়ে ওঠে জোহরের রাজধানী।  

ইব্রাহিম এর উত্তরসুরি ‍আবু বাকার সেরি মহারাজা জোহর উপাধি পান ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়ার কাছ থেকে। ১৮৮৬ সালে জোহর সুলতানের মুকুট পরেন তিনি। ব্রিটিশ পদ্ধতির প্রশাসন গড়ে প্রতিষ্ঠা করেন সুলতানের সরকারি বাসভবন ইসতানা বেসার। কালক্রমে তিনিই হয়ে ওঠেন আধুনিক জোহরের জনক।  

১৮৯২ সালে এই মসজিদটির নির্মাণ কাজও শুরু হয় তারই হাতে। টানা ৮ বছরের কর্মযঞ্জে পরিপূর্ণ হয় মসজিদের নির্মাণ কাজ। একসঙ্গে ২ হাজার মুসুল্লি নামাজ পড়তে পারেন এখানে। তবে স্থাপনাটিকে বর্তমানে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। নামাজের জন্য এই মসজিদের পেছনে তোলা হয়েছে আরো একটি মসজিদ ঘর। আনিন্দ্যসুন্দর এই মসজিদটির অবস্থান জোহর বাহরু শহরের কেন্দ্রে, আয়ের মলেক রোডে।

আরও পড়ুন
**সিঙ্গাপুরের কজওয়েতে মরে আছে জোহর প্রণালী
** বাংলাদেশিদের হাতেই জোহর বাহরুর পাইকারি বাজার
**‘ভালো আছে জোহর বাহরুর বাংলাদেশ’
** লাখ টাকায় কোটিপতি হোন আপনিও
** বিনা ভাড়ায় ঘুরুন কুয়ালালামপুরে
** শিকারি কুমিরের সঙ্গে কোলাকুলি
**আকাশের হেলান দিয়ে মসজিদ ভাসে ওই​
** প্রলয় নৃত্যে হতবাক দর্শক
**নরমুণ্ডু শিকারী মুরুত গাঁওয়ে​
** মুসলিম বাজাউরাই বিত্তশালী বোর্নিওতে
**কলসির ভেতর লুনদায়েহ কবর
**লঙহাউজের রুঙ্গুস রাণী​
**বনের ভেতর দুসুন গাঁও
** এক বাজারেই পুরো বোর্নিও
**বোর্নিওতে কী পেতে পারে বাংলাদেশ
** সুলু সাগর তীরের হেরিটেজ ট্রেইলে
** সূর্য ভাল্লুকের সঙ্গে লুকোচুরি
** ওরাংওটাং এর সঙ্গে দোস্তি
** অচেনা শহরের আলোকিত মানুষ
** সাড়ে ৫ হাজার ফুট উঁচু রাস্তা পেরিয়ে
**সাত ঘণ্টাতেই শেষ রাজধানী চক্কর
** সিগনাল হিলে আকাশ ভাঙা বৃষ্টি
** চীন সাগরে মেঘ-সুরুযের যুদ্ধ
** মালয় তরুণীর বিষাদমাখা রাতে
** জিভে জল আনা বাহারি সি-ফুড
** চীন সাগর পেরিয়ে ওরাংওটাংদের দেশে

বাংলাদেশ সময়: ১১৩৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৬
জেডএস/জেডএম/ 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।