bangla news

বিশ্ব ইজতেমা: এক অনন্য বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি

1730 |
আপডেট: ২০১৫-০১-০৭ ৪:৪৮:০০ এএম
ছবি: নাজমুল হাসান /বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: নাজমুল হাসান /বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

বাংলাদেশে ১৯৬৭ সাল থেকে প্রতি বছর টঙ্গির তুরাগ নদীর তীরে তাবলিগ জামাতের সবচেয়ে বড় সম্মেলন ‘বিশ্ব ইজতেমা’ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এটা বাংলাদেশের জন্য পরম সৌভাগ্য ও গর্বের বিষয়। ‘ইজতেমা’ আরবি শব্দ। বাংলা অর্থ হচ্ছে, সমাবেশ বা সম্মেলন।

বাংলাদেশে ১৯৬৭ সাল থেকে প্রতি বছর টঙ্গির তুরাগ নদীর তীরে তাবলিগ জামাতের সবচেয়ে বড় সম্মেলন ‘বিশ্ব ইজতেমা’ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এটা বাংলাদেশের জন্য পরম সৌভাগ্য ও গর্বের বিষয়। ‘ইজতেমা’ আরবি শব্দ। বাংলা অর্থ হচ্ছে, সমাবেশ বা সম্মেলন। ধর্মীয় কোনো কাজে বহুসংখ্যক মানুষকে একত্রিত করাকে ইসলামি পরিভাষায় ‘ইজতেমা’ বলে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীর বহুসংখ্যক দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যেখানে সমবেত হন তাকে ‘বিশ্ব ইজতেমা’ বলা হয়। বিদায় হজের সময় হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার কাছে যদি কোনো বাণী থাকে তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’ এই শাশ্বত বাণীকে আঁকড়ে ধরে বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশ থেকে আগত হাজার হাজার তাবলিগ অনুসারী বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। এছাড়া বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-শহর-বন্দর থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান ইজতেমায় অংশ নেন।

বিশ্ব ইজতেমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর শৃঙ্খলা। ‘যার যার ডাইনে চলি’ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে সবাই হাঁটেন জিকির করতে করতে। ঝগড়া-বিবাদ তো দূরে থাক, কেউ একটু রেগে কথা বলেন এমন দৃশ্যও চোখে পড়ে না। উপস্থিত মুসল্লিদের মানবতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও ঐক্য দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না। তারা একে অন্যের কষ্টকে ভাগাভাগি করে নেন। কোনো ধাক্কা-ধাক্কি ছাড়াই একজন অপরজনকে পথচলার সুযোগ করে দেন। কোনো শোরগোল নেই। কারো বিছানার ওপর দিয়ে গেলেও কেউ কটু কথা বলেন না। ‘আওয়াজ না করি; খামোশ হয়ে যাই, জামাত তৈয়ার’ এই একটি ঘোষণা শুনেই সবাই নামাজের কাতার সোজা করে নেন। এখানে ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ নেই। কত সুন্দর মুসলমানদের আমল, কত উত্তম তাদের আদর্শ ও শিক্ষা। এসবের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় ইজতেমার মাঠে।

সবেচয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, সভাপতিহীন বিশ্ব ইজতেমায় এই যে প্রায় ৩০/৪০ লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়, তার জন্য কোনো প্রচারব্যয় নেই। লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, মাইকিং কিছুই নেই। নেই কোনো কেন্দ্রীয় তহবিল, নেই কোনো আনুষ্ঠানিক অফিস, টেলিফোন, যানবাহন ইত্যাদি। এ বিশাল আয়োজনে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করা হয় না। সরকারি-বেসরকারি গণমাধ্যমে যা কিছু প্রচারিত হয় বা যে সব সহযোগিতা পাওয়া যায় তাও সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত। এটাও বিশ্ব ইজতেমার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য যার কোনো তুলনা নেই।

এখন প্রশ্ন হলো, বিশ্ব ইজতেমা আসলে কি এবং কেন? পথের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ সহ্য করে দেশ-বিদেশের মুসলমানরা ছুটে আসেন ইজতেমা ময়দানে। তারা কি জন্যে আসেন এবং যাওয়ার সময় সঙ্গে করে কি নিয়ে যান? এর উত্তরে সংক্ষেপে এতটুকু বলা যায়, তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম গত শতাব্দীতে শুরু হওয়া একটি নতুন ধারা। শাব্দিকভাবে ‘তাবলিগ’ অর্থ ‘প্রচার’ হলেও এতে মূল আবেদন থাকে মুসলমানদের শরিয়া পালনে উদ্বুদ্ধ করা। বংশগতভাবে মুসলমান হয়েও যারা ইসলামি অনুশাসন ও আচার পালনে উদাসীন, ইসলামের বিধিনিষেধ জানার ও অনুধাবনের আগ্রহ যাদের কম, তাদের উদ্দীপ্ত করতেই এই কার্যক্রমের অবতারণা। ইসলামি জীবনধারা পরিচালনায় অনাগ্রহী কিংবা অসচেতন ব্যক্তিদের সজাগ করার জন্য মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) এই নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে এ কাজ শুরু হলেও ফলপ্রসূ কার্যকারিতার কারণে তার প্রসার ঘটেছে অভাবনীয় গতিতে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাবলিগের ইজতেমা হয় প্রতি বছর। তবে বাংলাদেশেরটি জনসমাগমের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় হয়। লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে সোনাভানের টঙ্গির ‘কহর দরিয়াখ্যাত’ তুরাগপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা মুখরিত হয়। সেখানে উপস্থিত মুসলমানেরা আল্লাহর বিধান ও রাসুলের বাণী শুনে নতুন প্রেরণা লাভ করেন। ইসলাম নির্দেশিত পথে জীবন নির্বাহের দীক্ষা নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যান। বস্তুত বিশ্ব ইজতেমা মানুষের মধ্যে ব্যাপক ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ভাব-গাম্ভীর্যময় আবেগ তৈরি করে আধ্যাত্মিক প্রেরণার উন্মেষ ঘটায়। এক কথায় বলা যায়, বিশ্ব ইজতেমা দলমত নির্বিশেষে মুসলমানদের মনে প্রচণ্ড ধর্মীয় ভাবাবেগ তৈরি করে।

ধর্মীয় বিষয়ের বাইরেও বিশ্ব ইজতেমা আমাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভিতকে মজবুত করেছে। সৃষ্টি করেছে পরস্পরে সচেতনতা। বিশ্ব ইজতেমার শেষদিন আখেরি মোনাজাতের প্রভাব গড়ায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। এর ফলে আমরা দেখতে পাই, মাননীয় প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ ও বেসামরিক-সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা  বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে। উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে একদিনের জন্য হলেও গোটা দেশকে এভাবে টঙ্গিমুখি করার একটি প্রতীকী মূল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ও বটে। কামনা করি এর প্রভাব আমাদের দেশের সবখানে ছড়িয়ে পড়ুক। প্রতিফলিত হোক মানবজীবনের পরতে পরতে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ধর্মীয় ইমেজ গঠনে তাবলিগ ও বিশ্ব ইজতেমার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমাদের পরম সৌভাগ্য এই যে, বিশ্ব ইজতেমার জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয়া হয়েছে। প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে টঙ্গিতে। পৃথিবীর যেসব দেশে মুসলমানদের বসবাস রয়েছে তার প্রায় সব দেশ থেকেই মুসল্লিরা ইজতেমায় আগমন করেন। তাই বিশ্ব ইজতেমার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ও ধর্মীয় ইমেজ গড়ে উঠছে এবং তা দিন দিন বাড়ছে। আমাদের দেশের জন্য তা কম কথা নয়। এর মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে সুন্দর ও ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার একটি সুযোগ আমরা পাচ্ছি। ইজতেমা উপলক্ষে বিশ্বের যেসব প্রান্ত থেকে মুসলমানরা আসছেন, তারা আমাদের দেখে, আমাদের সঙ্গে মিশে, আমাদের আতিথেয়তার মুগ্ধ হয়ে একটি ইতিবাচক বাংলাদেশের ছবি নিয়ে ঘরে ফিরে যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক বিনিময় হচ্ছে। ফলে তারা আমাদের সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছেন। পরিচিতির ক্ষেত্রে এটা একটি বিরাট সুযোগ। সে হিসেবে বলা যায়, বিশ্ব ইজতেমা আমাদের দেশ ও জাতির পরিচয় বিশ্বের দরবারে উঁচু করে তুলে ধরছে। আমরা কামনা করি, তাবলিগের এই বহুমাত্রিক কার্যক্রম চলুক অনন্তকাল। আরও গতিশীল হোক এ কাজ, বিস্তৃত হোক সমাজের পরতে পরতে। আসন্ন বিশ্ব ইজতেমা সফল হোক।

muftianaet@gmail.com

বাংলাদেশ সময় ১৫৪৭ ঘণ্টা, জানুয়ারি ০৭, ২০১৫

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

ইসলাম বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2015-01-07 04:48:00