ঢাকা, সোমবার, ৪ মাঘ ১৪২৭, ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ০৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

আন্তর্জাতিক

যৌন হেনস্থার দায়ে পদ হারালেন লর্ড আহমেদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭৫৪ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২, ২০২০
যৌন হেনস্থার দায়ে পদ হারালেন লর্ড আহমেদ

ভারতের কট্টর সমালোচক লর্ড নাজির আহমেদ ব্রিটেনের হাউজ অব লর্ডসের সদস্য পদ হারিয়েছেন। কাশ্মীরি নারীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে লর্ডসের সম্মান তাকে খোয়াতে হয়।

ভারতের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নাজির ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়।  

কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক দুনিয়াকে বিভ্রান্ত করাই ছিলো তার একমাত্র লক্ষ্য। অথচ দুর্বল কাশ্মীরি নারীরই ইজ্জত লুণ্ঠন করেন তিনি। যৌন নির্যাতনের আরও একাধিক অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। বহু নারীই আজ তার বিরুদ্ধে সরব। ফলে হাউজ অব লর্ডস থেকে বিতাড়িত  হতে হয় তাকে। এখন নিজের সম্মান বাঁচাতে অবসরের নাটক করছেন জন্মসূত্রে এই পাকিস্তানি।
 
কাশ্মীরি নারী তাহিরা জামান প্রথম মুখ খোলেন লর্ড নাজির আহমেদের বিরুদ্ধে। তার অভিযোগ, নাজির আহমেদ যৌন নির্যাতন করেছেন। দুই সন্তানের মা তাহিরা লন্ডনের কমিশনার অব স্ট্যান্ডার্ডস অব কমিশনারের কাছে নিজের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করেন। বিতর্কিত নাজিরের বিরুদ্ধে বিবিসি একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। সেখানে যৌন শোষণের অভিযোগ করেন অনেকেই। বিবিসির তথ্যচিত্রে উঠে আসে নাজির আহমেদের আসল চরিত্র। ধরা পড়ে যান তিনি।

নাজিরের উত্থান বেশ চমকপ্রদ। ১৯৯৮ সালে তার হাউজ অব লর্ডসে প্রবেশ। তিনিই প্রথম কাশ্মীরি মুসলিম হিসাবে লর্ডসে প্রবেশের সুযোগ পান। এর আগে তিনি ছিলেন রথেরহ্যামের কাউন্সিলার। সাবেক ব্রিটিশ প্রাইম মিনিস্টার টনি ব্লেয়ারের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক সর্বজনবিদিত। কিন্তু ইরাক যুদ্ধের সময় থেকে সেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে।  

তাহিরা ফাঁস করে দিয়েছেন নাজিরের কীর্তি-কলাপ। তার অভিযোগ, অন্তত জনা পাঁচেক নারী নাজির আহমেদের কড়া শাস্তি চাইছে। তারা সকলেই যৌন শোষণের শিকার। কিন্তু পরিবার ও সামাজিক সম্মানের কথা চিন্তু করে কেউই মুখ খুলতে চাইছেন না। তিনি জানান, লন্ডনে নাজিরার বাড়িতে বিভিন্ন আছিলায় ডেকে নিয়ে গিয়ে তাকে যৌন হেনস্থা করা হয়। বারবার তাকে শিকার হতে হয়েছে হাউজ অব লর্ডসের এই লম্পট সদস্যের যৌন কামনার। শুধু তিনি একা নন, অন্যান্য নারীরাও তাদের অভিজ্ঞতার কথা ফাঁস করতে শুরু করেছেন। যৌন লালসার শিকার আরেক নারী জানিয়েছেন, তার স্বামীর ব্যাবসায়ীক শ্রীবৃদ্ধিতে সহায়তার কথা বলে তাকেও বিছানায় রাত কাটানোর কূপ্রস্তাব দিয়েছিলেন নাজির।  

অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নয় নাজিরের কীর্তিকলাপ। হাউজ অব লর্ডস খতিয়ে দেখেছে সমস্ত অভিযোগ। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটিও। সেই কমিটির সুপারিশেই নাজিরকে বের করে দেওয়া হয় ব্রিটিশ ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান থেকে। হাউজ অব লর্ডস থেকে বিতাড়িত হয়ে অবশ্য নাজির এখন উল্টো সুর গাইছেন। তার পেটোয়া পাকিস্তানি টিভি চ্যানেল প্রচার করছে নাজির নাকি নিজেই অবসর নিয়েছেন। কিন্তু নাজিরকে বহিষ্কার করেছে হাউজ অফ লর্ডস। এর আগে জন্মসূত্রে পাকিস্তানি নাজিরকে গত আগস্ট মাসে যৌন লাঞ্চনার দায়ে অভিযুক্তও করে। এবার প্রমাণ হাতে পেয়ে নাজিরকে একেবারে বের করে দেওয়া হয়। আর লর্ডস থেকে ঘাড় ধাক্কা খেয়ে নাজির এখন অবসরের গল্প ফাঁদছেন।  

হাউজ অব লর্ডসের কমিটি অবশ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হাউজের সম্মানের বিষয়টি মাথায় রেখেই নাজিরের সদস্য পদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘সসংদীয় পরিচয় ব্যবহার করে নাজির আহমেদ তাহিরা জামানের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। তার আচরণে হাউজের এবং হাউজের সকল সদস্যের মর্যাদাহানী হয়েছে। টোল খেয়েছে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস। ’ আচরণ কমিটির এই প্রতিবেদনে পশ্চিমি দুনিয়ার কাছে ভারতের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের মূল কান্ডারীর গ্রহণযোগ্যতা টোল খেয়েছে অনেকটাই। নাজির আহমেদের আগে মাত্র দুজনকে হাউজ ছাড়তে হয়েছিল যৌন হেনস্থার অভিযোগে। এরা হলেন মার্কস অ্যান্ড স্পেনসারের প্রধান লর্ড অ্যান্ড্রু স্টোন এবং অ্যান্টনি লেস্টার। কমিশনার অব স্ট্যান্ডার্ডসের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি বলেছে, ‘লর্ড নাজির আহমেদ হাউজ অব লর্ডসের আচরণ বিধি লঙ্ঘন করেছেন। ’ কমিশনার তার রিপোর্টে বলেছেন, ‘২০১৭ সালের ২ মার্চ তাহিরা জামানকে যৌন লাঞ্ছনার পর তার সম্মান নিয়েও ছিনিমিনি খেলেছেন লর্ড নাজির আহমেদ। তাহিরার ব্যক্তিগত সম্মানকেও ধূলিস্যাত করা হয়েছে। ক্ষুণ্ন হয়েছে তার ব্যক্তি স্বাধীনতাও। ’ একই সঙ্গে রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘তদন্তে উঠে এসেছে লর্ড নাজির আহমেদের উদ্দেশ্যই ছিল অসত। তিনি সততা বা আস্থার প্রতি মর্যাদা না দিয়ে পুরোপুরি ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলেন তাহিরার সঙ্গে। তাঁর ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয়টিতেও খেয়াল রাখার কথা ভাবা হয়নি। ’ ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের তদন্ত রিপোর্টে আরও বলা হয়, ‘তাহিরা জামান হতাশায় ভুগছিলেন। তার জন্য মনোবিদের অধীনে চলছিল চিকিৎসাও। কিন্তু সবকিছুর তোয়াক্কা না করে লর্ড নাজির তাহিরার আবেগের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। যৌন লাঞ্ছনারও শিকার হয়েছে তাহিরা। ’ তাই আচরণ বিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে লর্ড নাজির আহমেদকে বহিস্কারের সুপারিশ করা হয়।  

এখানেই শেষ নয়, লর্ড আহমেদ যে তদন্তকারীদের সহযোগিতা করেননি সে কথাও উল্লেখ করা হয়েছে কমিশনারের রিপোর্টে। বলা হয়েছে, ‘কমিটির সামনে লর্ড আহমেদ কখনওই সঠিক তথ্য দেননি। বরং বারবার চেষ্টা করেছেন তদন্তকে ভুল পথে পরিচালিত করতে। তদন্তকারীদের বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করেননি তিনি। বারবার বিভ্রান্ত করার চেষ্টা তিনি চালিয়ে গিয়েছেন। নিজের পদের মর্যাদাটুকু রাখার বিষয়েও যত্নশীল ছিলেন না তিনি। তার অসৎ আচরণ ও হাউজের মর্যাদা রক্ষার প্রতি আস্থাশীল মানসিকতার অভাব ধরা পড়েছে। তাহিরা জামানের পাশাপাশি হাউজের সম্মানও নষ্ট করেছেন লর্ড নাজির আহমেদ। ’

ধরা পড়ে যাওয়ার পর লর্ড নাজির চেষ্টা করেছিলেন বর্ণ বিদ্বেষের অভিযোগ তুলে পার পেয়ে যাওয়ার। নিজের ভারত-বিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে সমস্ত অভিযোগকে চক্রান্ত বলে চালানোর চেষ্টাতেও ত্রুটি রাখেননি। কিন্তু কমিটি সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তাকে দোষি সাব্যস্ত করে।  

বিবিসি, সানডে টাইমস, দ্য এশিয়ান লাইটের মতো পশ্চিমা মিডিয়ার বলিষ্ঠ সাংবাদিকেরাও হাউজ কমিটির সামনে নিজেদের স্বাধীন মতামত তুলে ধরে লর্ডসের বিরুদ্ধে। পানীর মতো পরিষ্কার হয়ে যায় নাজিরের কীর্তি। তাই ব্রিটিশরা তাকে ক্ষমা করেনি। কেড়ে নিয়েছে হাউজের সদস্য পদ। পদ খুইয়ে তাই নিজের কীর্তি ঢাকতে ভারতবিরোধী অপপ্রচার ফের শুরু করেছে আরও বেশি করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে।

তবে স্ট্যান্ডার্ডস কমিশনারের সুপারিশ কার্যকর করতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি হাউজের আচরণ বিষয়ক কমিটি। বরং দ্রুততার সঙ্গে নাজিরের সমস্ত বক্তব্য খারিজ করে তার সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া হয়। সংসদীয় সকল কাজকর্ম থেকে বাদ দেওয়া হয় তাকে। আচরণ কমিটির সাফকথা, লর্ড নাজির আহমেদ নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে হাউজের মর্যাদাকেও কালিমালিপ্ত করেছেন। সেইসঙ্গে তদন্তকারীদের সঙ্গেও বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করার সৌজন্য দেখাননি। তাছাড়া তাহিরা দুর্বল জেনেও তাকে যৌন শোষণের শিকার করা হয়েছে। বিন্দুমাত্র তার সম্মানের কথাটিও চিন্তা করা হয়নি। লর্ড নাজির তার সংসদীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে দুর্বল নারীর ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। এটা মানুষের অস্থার পরিপন্থী। তাই তাকে বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছিল। হাউজ কমিটিও তাই সেই সিদ্ধান্তকে মান্যতা দেওয়ার বিষয়ে দৃঢ় ছিল।  

লর্ড নাজির বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন। তাই স্পিকার তাকে বহিষ্কারের আগেই তিনি ইস্তফার গল্প বাজারে চাউর করে দেন। পাকিস্তানি জিও টিভি সেটি ফলাও করে সম্প্রচার করে। কোনও কারণ না দেখেই তারা প্রচার করতে থাকে, পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত লর্ড নাজির আহমেদ ২৩ বছরের সংসদীয় কাজকর্মে ইতি টানছেন। তিনি নাকি স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিচ্ছেন হাউজ অব লর্ডস থেকে। ১৬ নভেম্বর থেকে হাউজ অব লর্ডসের সঙ্গে তার সম্পর্কের ইতি পড়ে। সমস্ত দোষ ঢাকতে এখন ব্যস্ত পাকিস্তানি বংশোদ্ভুত এই ব্রিটিশ লর্ড।  

তবে নাজির আহমেদের জীবনে এটাই প্রথম বিতর্ক নয়। বরং বলা যায় চিরকালই তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। শাস্তিও ভোগ করতে হয়েছে বহুবার। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে ২০০৯ সালে তাকে জেলেও যেতে হয়েছিল। কারণ এমওয়ান হাইওয়েতে তিনি মোবাইলে ম্যাসেজ করতে করতেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তার গাড়ি ধাক্কা মারে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়িকে। জখম হন গাড়ির চালক। ২০১৩ সালে তার জেলযাত্রার কারণ হিসাবে ‘ইহুদিদের ষরযন্ত্র’ বলে বর্ণনা করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেন। তার জন্য তাকে লেবার পার্টি থেকে বরখাস্তও করা হয়। পরে অবশ্য তিনি ছেড়ে দেন লেবার পার্টিটাকেই। তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ উঠলেই তাকে সাম্প্রাদায়িক রং দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতেন নাজির। এবারও করেছিলেন। কিন্তু তাহিরা জামান তাকে এবার লর্ডস ছাড়তে বাধ্য করলো।

বাংংলাদেশ সময়: ১৭৫২ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ০২, ২০২০
নিউজ ডেস্ক

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa