ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

আন্তর্জাতিক

উত্তাল ইরানে খামেনির ছবি পুড়িয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৬০৯ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৭
উত্তাল ইরানে খামেনির ছবি পুড়িয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন! যানবাহনে আগুন দিচ্ছেন আন্দোলনকারীরা। ছবি: বিবিসি

ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলন এবার ছড়িয়ে পড়ছে ছোট শহরগুলোতেও। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি পোড়ানোর মতো নজিরবিহীন ঘটনারও সৃষ্টি করছেন বিক্ষোভকারীরা।   

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত দু’জন নিহত হওয়ার দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা।

রোববার (৩১ ডিসেম্বর) খোরামাবাদ, যানজান ও আহভাজ শহরে মিছিল থেকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিসহ ইসলামী বিপ্লবের নেতাদের পদত্যাগ ও তাদের ‘নিপাত’ যাওয়ার দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়েছে।

এমনকি আবহার শহরে খামেনির ছবি সম্বলিত সুবিশাল ব্যানারে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা।

হাজার হাজার মানুষ গত চারদিন ধরে ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী এ বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। মূলত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ানো ও ব্যাপক বেকারত্বের প্রতিবাদ জানাতে বৃহস্পতিবার (২৮ ডিসেম্বর) মাশহাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ থেকে ৫২ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করায় দ্রুতই সেটি সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়।

এর আগে শনিবার (৩০ ডিসেম্বর) রাত পর্যন্ত রাজধানী তেহরান ছাড়াও মাশহাদ, কেরমানশাহ, রাশত, ইস্পাহান ও কোমাসহ অন্তত নয়টি শহরে তীব্র বিক্ষোভের পর কিছু জায়গায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর দেয় বিবিসি।

রোববার বড় শহরগুলো থেকে তাদের এই বিক্ষোভ ইরানের ছোট ছোট শহরেও ছড়িয়ে পড়ছে এবং ক্রমশ আরও ব্যাপক আকার নিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ইরানে আটত্রিশ বছর আগে হওয়া ইসলামিক বিপ্লবের পর দেশটির গ্র্যান্ড আয়াতুল্লার বিরুদ্ধে এ ধরনের বিক্ষোভ আর দেখা যায়নি।

বিবিসি জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন প্রান্তের মূলত তরুণ ও পুরুষ বিক্ষোভকারীরা সরাসরি দেশ থেকে ‘মোল্লাতন্ত্র’ উচ্ছেদের ডাক দিচ্ছেন। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধসহ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারও চাইছেন তারা। বিক্ষোভকারীরা শ্লোগান দিচ্ছিলেন, ‘মানুষ ভিক্ষা করছেন, ধর্মপুরুষেরা ঈশ্বরের মতো কাজ করে’।

উত্তর ইরানের আঝার শহরেও বিক্ষোভকারীরা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি সম্বলিত বড় ব্যানারে আগুন ধরিয়ে দেন। সেন্ট্রাল ইরানের আরাক এলাকায় সরকার সমর্থিত বেসিজ মিলিশিয়াদের স্থানীয় সদর দফতরে আগুন দিতে দেখা গেছে।

মাশহাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের গাড়ি ও মোটরসাইকেল ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। শহরটিতে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ হারানোর অসংখ্য রিপোর্ট এসেছে। বিক্ষোভ হয়েছে ধর্মীয় নেতাদের আবাসস্থল হিসেবে খ্যাত কোম শহরেও।

কিরানানশাহের বিক্ষোভকারী মাকান বিবিসিকে বলেন, ‘বিক্ষোভকারীদেরকে পিটিয়ে মেরেছে। কিন্তু আমরা বলতে পারি না যে, তারা পুলিশ বা বেসিজ মিলিশিয়া ছিল’।

শনিবার ‘অবৈধ সমাবেশ’ এড়াতে বিক্ষোভকারীরা সরকারের সতর্কবাণী উপেক্ষা করার পর এ বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা তাদের নিজেদের এবং অন্যান্য নাগরিকদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করবে’।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও হুশিয়ারি দেন, আইন ভঙ্গকারী এবং সরকারি সম্পদ ধংসকারীদের পরে জবাবদিহি করতে হবে, এবং আজকের বিক্ষোভের জন্য কঠিন মূল্য দিতে হবে।

বিরোধীপক্ষ এবং বিদেশি শক্তি এ বিক্ষোভে উস্কানি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ ইরান সরকারের।

কিন্তু এ হুশিয়ারির পর শনিবার সামাজিক মাধ্যমের অজ্ঞাতপরিচয় পোস্ট থেকে ইরান জুড়ে আরো বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হলে রোববার তা বিস্তৃত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ছড়িয়ে দেওয়া ওই ভিডিও ফুটেজগুলোতে রাজধানী তেহরানের একেবারে কেন্দ্রে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ হতে দেখা যাচ্ছে। খামেনিকে পদত্যাগের আহ্বানে শ্লোগান দেওয়ার পর সেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বেধে যায় শিক্ষার্থীদের। বিদ্রোহীদের সমর্থনে পার্সিয়ান রিপোর্টে বলা হয়েছে, তেহরানের আজাদী স্কয়ারেও জড়ো হয়েছেন বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারী।

তেহরানের ইসলামিক রেভ্যুলিউশনস গার্ড বা বিপ্লবী বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল কায়সারিও বলেছেন, সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের এ আন্দোলন চলতে থাকলে, ‘শক্ত হাতে’ তা দমন করা হবে।

কমান্ডার অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা দ্রব্যমূল্যের বাইরে রাজনৈতিক ইস্যুতে শ্লোগান ও সরকারি সম্পত্তিতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছেন।

ইরানের এক সংবাদ সংস্থাকে ব্রিগেডিয়ার ইসমাইল কাওসারি বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা যদি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদেই রাস্তায় নামতেন, তাহলে তারা সরকারবিরোধী শ্লোগান দিতেন না।

অবশ্য এ বিক্ষোভের পেছনে ইরানের ব্যাপক সামাজিক অসন্তোষও দায়ী তা পরোক্ষভাবে ও এর দায় কিছুটা স্বীকার করছেন সরকারের কেউ কেউ। প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির উপদেষ্টা হিশামুদ্দিন আশেনা টুইটারে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘ইরানের সামনে বেকারত্ব, জিনিসপত্রের উচ্চমূল্য, দুর্নীতি, বৈষম্যসহ অনেক গুরুতর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জনগণের কথা যেন শোনা হয়, সে অধিকার তাদের আছে’।

২০০৯ সালে দেশটিতে বিতর্কিত নির্বাচন ও ব্যাপক সংস্কারের পর একই ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করেছিল ইরান সরকার। তবে এবারের বিক্ষোভকে জন অসন্তোষের সবচেয়ে গুরুতর ও ব্যাপক অভিব্যক্তি বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

বাংলাদেশ সময়: ২২১০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৭
এএসআর
 

** ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে দু'জনের মৃত্যুর খবর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa