[x]
[x]
ঢাকা, শনিবার, ৪ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
bangla news

চলে গেলেন রবীন্দ্র গবেষক কাজুও আজুমা

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-০৭-২৯ ৩:৩১:৫৪ এএম

একনিষ্ট রবীন্দ্রপ্রেমী অধ্যাপক কাজুও আজুমা ২৮ জুলাই প্রয়াত হয়েছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে আদর্শ করে বাংলা ভাষার প্রচার ও গবেষণা করে গেছেন আজীবন নিরলসভাবে।

কলকাতা: একনিষ্ট রবীন্দ্রপ্রেমী অধ্যাপক কাজুও আজুমা ২৮ জুলাই প্রয়াত হয়েছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকে আদর্শ করে বাংলা ভাষার প্রচার ও গবেষণা করে গেছেন আজীবন নিরলসভাবে।

প্রথমে জানা গিয়েছিল শান্তিনিকেতনে তার জীবনাবসান হয়েছে। পরে জানা যায়, বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা ১০ মিনিটে জাপানের ইচিকাওয়া শহরের একটি হাসপাতালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন রবীন্দ্র গবেষক আজুমা।

দীর্ঘ রোগভোগের পর ৮০ বছর বয়সে পূর্ণ হওয়ার আগেই তার মৃত্য হয়েছে। ভারত-জাপান মৈত্রী স্থাপনে এবং জাপানে রবীন্দ্রচিন্তা প্রসারে তার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

আজুমার সঙ্গে বাংলাদেশেরও গভীর সম্পর্ক ছিলো। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাপান সফরের সময়ে তাঁর দোভাষী এবং সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলেন কাজুও আজুমা ।

শান্তিনিকেতনে ‘জাপান-ভারত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র্রের মাধ্যমে ‘নিপ্পন ভবন’র মতই ‘জাপান বাংলা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে’র মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র  স্থাপনেরও উদ্যোগ নিয়েছিলেন আজুমা। এর জন্য ৬ কোটি টাকাও জোগাড় করেছিলেন তাঁর অসংখ্য অনুরাগীদের কাছ থেকে।

২০০৪ সালের ১০ আগস্ট অসুস্থ অবস্থায় শেষবারের মতো সপরিবারে আজুমা বাংলাদেশে আসেন।

জাপান থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী রোববার তাঁর শেষকৃত্য হবে। তাঁর স্ত্রী কেইকো কাজুমা এবং দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। আজুমার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা তাঁর অসংখ্য অনুরাগীদের মধ্যে। পশ্চিমবাংলার সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর আত্মিক সম্পর্ক।

জাপানের নাগরিক হয়েও বাংলা সাহিত্যে কাজুও আজুমার শক্তিশালী কলম এবং বাংলা ভাষার সাবলীল উচ্চারণ তাঁকে বাংলা ভাষা চর্চায় অগ্রজ পথিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারণ করে গেছেন ‘ আমি বাংলা ও বাঙালির ভক্ত’। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, বামফ্রন্টের সভাপতি বিমান বসু এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বিমান বসু এদিন কেইকো আজুমার সঙ্গে টেলিফোনে কথাও বলেন। তাঁকে সমবেদনা জানান বসু।  

কাজুও আজুমার জন্ম ১৯৩১সালের ১৪ই আগস্ট টোকিও শহরে। ছোটবেলায় জাপানী ভাষায় অনূদিত রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকটি পড়ে আকৃষ্ট হন। নাটকের ‘অমল’ চরিত্র তাকে খুব আকর্ষণ করেছিলো। সেই শুরু। নিজের উদ্যোগেই বাংলা শেখা শুরু করেন।

পরবর্তীকালে জাপানের রবীন্দ্র অনুরাগীদের মধ্যে অন্যতম ড. ওকাতা নাবের সংস্পর্শে এসে তিনি বাংলা ভাষা চর্চা শুরু করেন। ঐ সময় ভারত- আরও নির্দিষ্ট অর্থে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাছাকাছি আসার জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথকেই অবলম্বন করেছিলেন সেতুপথ হিসেবে। স্বাভাবিকভাবেই টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাজুও আজুমা বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ভারততত্ত্ব এবং জার্মান দর্শনকে।

ইয়কোহামা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানী বিভাগে তিনি অধ্যাপনার জীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে সুকুবা এবং রেইনটাকু বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যামারিটাস প্রফেসার হিসেবে অধ্যাপনা করেন।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের শতবার্ষিকীতে জাপানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর মুখ্য ভূমিকা ছিলো।

ঐ বছর তিনি রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু গল্প, উপন্যাস জাপানী ভাষায় অনুবাদও করেন। তাঁর অনুবাদ করা রবীন্দ্র সাহিত্যের মধ্যে ‘গীতাঞ্জলি’, ‘গোরা’, ‘মুক্তধারা’, ‘চার অধ্যায়’ উল্লেখযোগ্য। জাপানে তাঁর উদ্যোগে এবং নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘টেগোর অ্যাসোসিয়েশন।

আজুমা দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ভারত, বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় নিয়োাজিত রেখেছিলেন নিজেকে। তাঁরই হাত ধরে রবীন্দ্রভাবনা এবং ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চায় দীক্ষিত হয়েছিলেন জাপানের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী। জাপানী ভাষায় প্রকাশিত ১২ খন্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী অনুবাদ ও সম্পাদনা আজুমার মহত্তম কীর্তি।

বাংলাভাষায় তিনি লিখেছেন অসংখ্য বই। রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি রচনা করেছেন একাধিক বই। তার মধ্যে ‘উজ্জ্বল সূর্য : রবীন্দ্রনাথ’, ‘জাপান ও সুভাষচন্দ্র’, ‘প্রসঙ্গ জাপান ও রবীন্দ্রনাথ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

কাজুও আজুমা ভারতে প্রথম আসেন ১৯৬৭ সালে। ঐ বছর অধ্যাপক হিসেবে বিশ্বভারতীর জাপানী ভাষা ও সাহিত্য সংস্কৃতি বিভাগে যোগ দেন। প্রায় চার বছর শান্তিনিকেতনে কাটিয়ে ১৯৭১ সালে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। ঐ সময় পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জরুরী অবস্থা তাঁকে শান্তিনিকেতন ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিলো।

কিন্তু শান্তিনিকেতন ছাড়লেও বাংলার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলেন গভীর আত্মীয়তার বন্ধনে। যা অটুট ছিলো শেষ দিন পর্যন্ত।

পশ্চিমবাংলার গ্রাম- মানুষ তাঁকে ভীষণভাবে টানতো। জাপানে গিয়ে বারবারে ছুটে এসেছেন ভারতে। বিশেষ করে পশ্চিমবাংলায়।

কোনো কোনো বছর দুবারও এসেছেন এই রাজ্যে। পশ্চিমবাংলার অন্তত ২০০ গ্রামে তিনি ঘুরেছেন। সেখানকার লোকভাষা শিখেছেন। তা নিয়ে চর্চাও করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের পরই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনদর্শন ভীষণভাবে তাকে টানতো। তিনি বলতেন, ‘তার যখন ১১ বছর বয়স তখন ইংরেজি জানতেন না। জাপানী রেডিওতে ইংরেজি ভাষায় সুভাষ চন্দ্রের ভাষণের কথাও কিছু বুঝতেন না। কিন্তু সুভাষচন্দ্র্র বসুর ‘দিল্লি­ চলো’ ডাক তাঁকে খুব আলোড়িত করেছিলো।’

আজুমা শান্তিনিকেতনে স্থাপন করেছেন ‘নিপ্পন ভবন’। এই ভবন নির্মাণের জন্য অর্থও সংগ্রহ করেছিলেন। ১৯৯৪ সালে এই ভবনের উদ্বোধন করেন ভারতের উপ রাষ্ট্রপতি আর কে নারায়ণ।

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাডেমি এবং ভারত-জাপান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সহযোগিতায় কলকাতার বিধাননগরে গড়ে ওঠে ‘রবীন্দ্রনাথ-ওকাকুরা ভবন’।

২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট এই ভবনের উদ্বোধন হয়। ঐ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আজুমা। এই ভবন নির্মাণে তাঁর উদ্যোগ অনস্বীকার্য। এই ভবন নির্মাণে যখনই প্রয়োজন মনে করেছেন তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, আজুমার উদ্যোগেই গোটা বিশ্বে একমাত্র সরকার পরিচালিত জাপান কেন্দ্র এই রাজ্যে চালু হয়েছে। এই কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলানিউজকে বলেন, আজুমার সাহিত্যকীর্তি ধরে রাখার জন্য তাঁর রচনাবলী প্রকাশের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যাসাগর মেলার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন আজুমা।

আজুমার লেখা ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : তাঁর কবিতা দর্শন ও জীবনযাত্রা’ বইটির কথা মনে রেখে ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে অর্পণ করা হয় রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার। রাজ্যের তৎকালিন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এই পুরস্কার তাঁর হাতে তুলে দেন। বিধাননগরে নবনির্মিত রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার তাঁকে দেওয়া হয়। ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে।

এছাড়াও বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের ওপর আজুমার অসামান্য কাজের স্বীকৃতি দিতে ১৯৮৬ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে ডি. লিট উপাধি দেওয়া হয়। ১৯৮৯ সালে টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাকে ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচাযর্’ পুরস্কার দেয়।

১৯৯৩ সালে জাপানের ভারতীয় দূতাবাস থেকে দেওয়া হয় ‘আকাদেমি অ্যাচিভম্যান্ট অ্যাওয়াডর্’। বিশ্বভারতী আজুমাকে দেশিকোত্তম উপাধি দেয় ২০০০ সালে।

বহু বিশিষ্টজন কলকাতা থেকে জাপানে গিয়ে তার আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন।

বাংলাদেশ সময়: ১৩২১ ঘণ্টা, জুলাই ২৯, ২০১১

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

কলকাতা বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14