ঢাকা, শনিবার, ৭ কার্তিক ১৪২৮, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সিঙ্গাপুর

সিঙ্গাপুরে চাকরির নামে প্রতারণা চলছেই

আনোয়ার হোসেন, সিঙ্গাপুর করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১ ঘণ্টা, মার্চ ২৮, ২০১৬
সিঙ্গাপুরে চাকরির নামে প্রতারণা চলছেই ফাইল ফটো

সিঙ্গাপুর: ‘সিঙ্গাপুর মানেই টাকা। একবার যেকোনো চাকরি নিয়ে সেখানে যেতে পারলেই চলবে, বেতন আর ওভারটাইম মিলে যা কামাই করবে, দেশে পাঠিয়ে আরও অনেক টাকা তোমার হাতেই থেকে যাবে।

এছাড়াও প্রতি বছর বেতন বাড়বে। কয়েক বছর চাকরির পর সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যেতে পারবে। তখন তো পুরোপুরি নাগরিকদের মতো সুযোগ সুবিধা পাবে। দেখো, অমুক গ্রামের তমুক সিঙ্গাপুরে গিয়ে আজ কতো টাকার মালিক। ’

গ্রামের সহজ-সরল তরুণদের বিদেশের চাকচিক্য আর সহজে অর্থ উপার্জনের লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন প্রতারক চক্র এভাবেই হাতিয়ে নিয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

সিঙ্গাপুরের সেরাঙ্গুনে ‘ঘরোয়া’ রেস্টুরেন্টে বাংলানিউজের সঙ্গে কথা হয় প্রতারণার শিকার এমনই একজন ভাগ্যাহত যুবক মাইনুল হাসান মোহনের (২০)।

নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া গ্রামের এই তরুণ এসএসসি পাসের পর অর্থাভাবে আর পড়ালেখা করতে পারেননি। বাবা মারা গেছেন আগেই। পরিবারে এখন মা ও দুই ভাই রয়েছেন। বড় বোনটির বিয়ে হয়ে গেছে।

টাকা উপার্জন করে পরিবারের হাল ধরতে হবে- এই ভাবনায় অস্থির ছিলেন মোহন। এসময় গ্রামের এক বড় ভাই এনে দিলেন সহজ সমাধান- ‘সিঙ্গাপুর যাও, টাকা কামাও। ’
তারই পরামর্শে ঢাকায় গিয়ে প্রথমে সাভারের জিরাবোতে ‘সিঙ্গাপুর স্কিলস সেন্টারে’ বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের ১ বছরের একটি কোর্সে ভর্তি হলেন। কোর্স ফি ৪৫ হাজার টাকা গুণতে হলো সেখানে।

সেখানে তার মতো আরও শতাধিক প্রশিক্ষণার্থীর দেখা পেলেন, যারা কাজ শিখেই বিদেশ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর।

কোর্সের শুরুতেই ট্রেনিং সেন্টারের মালিক প্রশিক্ষণার্থীদের সবাইকে সিঙ্গাপুরের ভিসা (ওয়ার্ক পারমিট) সংক্রান্ত বিভিন্ন নিয়ম কানুন বুঝিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, যে কেউ ইচ্ছে করলেই সিঙ্গাপুরে চাকরি করতে যেতে পারে না। ভালো কোম্পানিতে চাকরির পাশাপাশি সিঙ্গাপুর সরকারের আলাদা অনুমতিপত্র যোগাড় করা অনেক কষ্টসাধ্য। এজন্য বেশ কিছু খরচাপাতি আছে।

কয়েক মাস না যেতেই তিনি সবাইকে পারমিটের টাকা যোগাড়ের জন্য তাগাদা দিলেন। খরচ? আট লাখ টাকা মাত্র! বাকি সব ব্যবস্থা ট্রেনিং সেন্টার থেকেই করে দেওয়া হবে।

আশা এবং ব্র্যাক ব্যাংক থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আর আত্মীয় স্বজন থেকে অবশিষ্ট টাকা ধার করে পুরো আট লাখ টাকা ট্রেনিং সেন্টারের মালিকের হাতে বুঝিয়ে দিলেন মোহন। এর কয়েক মাসের মধ্যেই চলে এলো সিঙ্গাপুরের চাকরির নিয়োগপত্র আর ওয়ার্ক পারমিট। কাল বিলম্ব না করে গত বছরের (২০১৫) সেপ্টেম্বরে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে পাড়ি জমালেন তিনি।

চাকরিতে যোগ দিয়ে এক মাস না যেতেই কঠোর বাস্তবতার সম্মুখীন হলেন মোহন।

চুক্তিপত্র অনুযায়ী দৈনিক ১৮ ডলার বেতন আর মুরগির খোপের মতো ছোট্ট ডরমিটরিতে থাকার ব্যবস্থা- সবই ঠিক আছে! ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে আবার রুমে ফিরে যেতে রাত ১০টা- তাও মেনে নিলেন তিনি!

কিন্তু ক্যাটারিংয়ের সস্তা, বাসি খাবারের বিল পরিশোধ করে মাস শেষে পনের হাজার টাকা বাড়িতে পাঠানোর পর নিজের খরচের জন্য একটি ডলারও অবশিষ্ট না থাকায় বুঝতে পারলেন- মিথ্যে প্রলোভনে এত টাকা খরচ করে সিঙ্গাপুরে এসে কত বড় ভুল তিনি করেছেন।  

বাড়িতে মাসে পনের হাজার টাকা পাঠালেও সেখানে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা। বাকি পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা পরিশোধ করতে প্রতি মাসে নতুন করে ধার-দেনা করতে শুরু করলেন মোহনের বড় ভাই। তার মনেও আশা- কয়েক বছর কষ্ট করে কোনোভাবে ঋণের টাকাটা পরিশোধ হলেই ভাগ্য ফিরবে পুরো পরিবারের।

তবে, চাকরিতে আরও কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হলে মোহনের সামনে বেরিয়ে আসে সিঙ্গাপুরের কোম্পানিগুলোর চাকরির নামে প্রতারণার মূল চেহারা।

মাইনুল হাসান মোহন বলেন, ‘আমাদের দেশের স্কিল ট্রেনিং সেন্টারগুলোর সঙ্গে এখানকার কিছু কনস্ট্রাকশন কোম্পানির গোপন চুক্তি আছে। ট্রেনিং সেন্টারগুলো মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে আমাদেরকে এইসব কোম্পানিতে চাকরি করতে পাঠায়। সেই টাকার একটা বড় অংশ আবার সিঙ্গাপুরের এই কোম্পানিগুলোর মালিকদের পকেটে চলে আসে। তারা বাংলাদেশ থেকে কর্মীদের এক বছরের জন্য চুক্তিতে সিঙ্গাপুরে চাকরি করতে নিয়ে আসে।

কিন্তু এক বছর পার হওয়ার পর চুক্তিপত্র আর নবায়ন না করে আবার দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর আবার বাংলাদেশ থেকে ট্রেনিং সেন্টারগুলোর সহায়তায় টাকার বিনিময়ে নতুন কর্মী আনে। এভাবে প্রতারণা করে এরা এখানে কোটি টাকা আয় করছে। ’

তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক মাসে দেখেছি, বাংলাদেশ থেকে এখানে চাকরি করতে নিয়ে আসা অনেককেই এক বছরের চুক্তি শেষ হওয়ার পর আর নবায়ন না করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে অনেক কোম্পানি। এ বছর সেপ্টেম্বরে আমার এক বছরের চাকরির চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। ইতোমধ্যেই আমার কোম্পানি থেকেও জানিয়ে দিয়েছে, সেপ্টেম্বরে আমাকে পাঠিয়ে দেবে। আমার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে এসেছে। দেশে ফিরে গেলে এত টাকা দেনা কিভাবে পরিশোধ করব- এই চিন্তায় অস্থির হয়ে আছি। ’

তিনি জানালেন, শুধু তার কোম্পানিতেই প্রায় পঞ্চাশ জন বাংলাদেশি কর্মী আছেন। যারা এই প্রতারণার শিকার। এদের সবাইকেই ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এছাড়াও পুরো সিঙ্গাপুরে এরকম হতভাগ্যের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

‘পরিবারের মানুষগুলোর মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য এতটাই অস্থির হয়ে ছিলাম যে, ভালো মতো খোঁজ খবর না নিয়ে এসব দালাল আর প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে গেছি। এই স্কিল সেন্টারগুলো সারাদেশে তাদের এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে রেখেছে। এদের কাজই হল মানুষদের বিদেশে চাকরির ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেওয়া। ’ বললেন মাইনুল হাসান মোহন।

বাংলাদেশ সময়: ১৯৫৬ ঘণ্টা, মার্চ ২৮, ২০১৬
পিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa