bangla news

সিঙ্গাপুরের ইতিহাসের স্মরণীয় ১০ অঘটন

2407 |
আপডেট: ২০১৫-০২-১২ ১:০২:০০ এএম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

নিরাপদ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ দেশ সিঙ্গাপুরের অতীত সবসময় এত নির্ঝঞ্ঝাট ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কাহিনী হারিয়ে গেলেও অতীতের কিছু ঘটনা এখনও সিঙ্গাপুরের বর্তমান ঐতিহ্যে দাগ হিসেবে রয়ে গেছে।

ঢাকা: নিরাপদ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ দেশ সিঙ্গাপুরের অতীত সবসময় এত নির্ঝঞ্ঝাট ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কাহিনী হারিয়ে গেলেও অতীতের কিছু ঘটনা এখনও সিঙ্গাপুরের বর্তমান ঐতিহ্যে দাগ হিসেবে রয়ে গেছে।

বাংলানিউজের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে সিঙ্গাপুরের এমনই কিছু চমকপ্রদ অতীত।

১। বুকিত হো সুই এর অগ্নিকাণ্ড (২৫ মে, ১৯৬১)
সিঙ্গাপুরের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে দুই হাজারের অধিক বাড়ি পুড়ে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়েন। এতে ৪ জনের প্রাণহানি ও ৮৫ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

আগুনের ঘটনার পরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও আজ পর্যন্ত ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানা যায়নি।

২। ম্যাকডোনাল্ডস হাউসে বোমা হামলা (১০ মার্চ, ১৯৬৫)
সেই সময় মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের একাত্মতার সরাসরি বিরোধিতা করেছিল ইন্দোনেশিয়া। তারপরেও দুই দেশের মধ্যে জমি ভাগাভাগি চুক্তি হয়ে যাওয়ায় প্রতিশোধ স্বরূপ সিঙ্গাপুরে ওসমান ও হারুন নামে দুইজন কমান্ডো পাঠায় ইন্দোনেশিয়া। ।

তারা সিঙ্গাপুরের ২৯ স্পটে বোমা বসায়। এর মধ্যে ১১টি বোমা বিস্ফোরিত হলেও সবচেয়ে বেশী ক্ষতি করে অর্চার্ড রোডের বর্তমান ম্যাকডোনাল্ডস্ হাউসে (তৎকালীন এইচ.এস.বি.সি ব্যাংক বিল্ডিং) স্থাপিত বোমাটি। এতে ব্যাংকের দুইজন কর্মচারীর মৃত্যু হয়। আহত হয় ৩৩ জন। 

সিঙ্গাপুরের পুলিশ ওই দুই কমান্ডোকে আটক করে। ১৯৬৮ সালে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া সেই কমান্ডোদের স্মরণে ‘ওসমান-হারুন’ নামে একটি যুদ্ধ জাহাজের নামকরণ করলে পুরনো সেই তিক্ততা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।  সিঙ্গাপুর সরকার এই জাহাজটি তাদের জলসীমায় কখনও প্রবেশ করতে দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।

৩। স্পাইরোজ জাহাজের বিস্ফোরণ (১২ অক্টোবর, ১৯৭৮)
সিঙ্গাপুরের জুরং শিপ ইয়ার্ডে থাকা অবস্থায় গ্রীক তেলবাহী জাহাজ ‘স্পাইরোজ’এ ভয়াবহ এই বিস্ফোরণে ৭৬ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় আরো শতাধিক। নিহতের সংখ্যার ভিত্তিতে এটি সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

এই ঘটনার পর থেকেই সিঙ্গাপুরের সব শিপ ইয়ার্ডে কঠোর নিরাপত্তা বিধি প্রণয়ন করা হয়।

৪। গেলাং বাহরু হত্যাকাণ্ড (৬ জানুয়ারি, ১৯৭৯)
বাসায় ঢুকে অবুঝ চার শিশুকে হত্যার এই ঘটনা দীর্ঘদিন গণমাধ্যমের প্রধান বিষয় হয়ে ছিল।

সন্ধ্যাবেলায় বাবা-মা দুজনে চাকরি থেকে বাসায় ফিরে দেখতে পান তাদের চার সন্তানের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মৃতদেহ বাথরুমের সামনে পড়ে আছে। অথচ, প্রতিবেশী বা অন্য কেউ তাদের বাসায় সারাদিন কাউকে ঢুকতে বা বের হতে দেখেনি।

পুলিশ অনেকদিন তদন্ত করেও আজ পর্যন্ত নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের কারণ উদঘাটন করতে পারেনি।  গ্রেফতার করতে পারেনি হত্যাকারীকে। 
 
৫। ক্যাবল কার দুর্ঘটনা (২৯ জানুয়ারি, ১৯৮৩)
সিঙ্গাপুরের অন্যতম আকর্ষণ সেনতোসা দ্বীপে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত ক্যাবল কারের দুইটি বগি সাগরে পড়ে গিয়ে ৭ জনের মৃত্যু হয়। আরও চারটি বগি ছেঁড়া ক্যাবলের সঙ্গে কোনোমতে ঝুলছিলো। সেনা ও বিমানবাহিনীর যৌথ অভিযানে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করা হয়। 

পুরো জাতি টেলিভিশনে এই রোমহর্ষক অভিযান সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন ।

সিঙ্গাপুরের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লী সিয়েন লুং তৎকালীন সেনাবাহিনীতে ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল থাকা অবস্থায় এই দুর্ঘটনায় উদ্ধারকার্যের নেতৃত্ব দেন ।

৬। নিউ ওয়ার্ল্ড হোটেলের ধস  (১৫ মার্চ, ১৯৮৬)
সেরাঙ্গুন রোডে অবস্থিত ৬ তলা বিশিষ্ট নিউ ওয়ার্ল্ড হোটেলটি ১৯৮৬ সালের ১৫ মার্চ আচমকা পুরো ধসে পড়লে ৩৩ জনের মৃত্যু হয়। পরে সেনাবাহিনী ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করেন।

নির্মাণ ত্রুটির কারণে ভবনটি দুর্বল হয়ে ধসে পড়ে বলে তদন্তে জানা যায়।

৭। প্লেন ছিনতাই (২৬ মার্চ, ১৯৯১)
মালয়েশিয়া থেকে ১১৮ জন যাত্রী ও ১১ জন ক্রু নিয়ে থাইল্যান্ড যাওয়ার পথে যাত্রী বেশে পাকিস্তানের ৪ জন সন্ত্রাসী সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের SQ-117 প্লেনটি ছিনতাই করে জোরপূর্বক সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্টে অবতরণ করতে বাধ্য করে।তারা নিজেদের পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পি. পি. পি) সদস্য পরিচয় দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানে বন্দি আসিফ আলী জারদারি (বেনজির ভুট্টোর স্বামী) ও অন্যান্য পি.পি.পি নেতার মুক্তি দাবি করেন।

একপর্যায়ে তারা দাবি না মানলে প্রতি ১৫ মিনিট পর পর একজন করে যাত্রীকে হত্যা করবে বলে হুমকি দেয়।

তাদের বেঁধে দেয়া সময় শেষ হওয়ার আগেই সিঙ্গাপুরের সেনাবাহিনীর একদল কমান্ডো অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের হত্যা করে প্লেনটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং সব যাত্রীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে।

৮। সিল্ক এয়ার বিমান দুর্ঘটনা (১৯ ডিসেম্বর, ১৯৯৭)
ঘটনাটি যদিও সিঙ্গাপুরে ঘটেনি, কিন্তু ইন্দোনেশিয়া থেকে সিল্ক এয়ারের এই প্লেনটি ৭ জন ক্রু ও ৯৭ জন যাত্রী নিয়ে সিঙ্গাপুর আসার পথে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ইন্দোনেশিয়ার মুশি নদীতে বিস্ফোরিত হয়। চূর্ণবিচূর্ণ বিমানটির সবাই মারা যায়।

উত্তাল স্রোতের কারণে কোন লাশ পাওয়া না গেলেও শেষ পর্যন্ত প্লেনটির কিছু ধ্বংসাবশেষ  উদ্ধার করা হয়।

বিমানটির নিহত যাত্রীদের মধ্যে ৪০ জন সিঙ্গাপুরের নাগরিক ছিলেন।

৯। নিকোল হাইওয়ে দুর্ঘটনা (২০ এপ্রিল ২০০৪)
রাস্তার নীচে রেল লাইন স্থাপনের সময় নিকোল হাইওয়েতে একটি বীম সরে গিয়ে পুরো স্থাপনা ধসে পড়লে রাস্তায় ১৫০ মিটার চওড়া ও ৩০ মিটার গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়।

এ দুর্ঘটনায় ৪ জন নির্মাণ শ্রমিক নিহত ও ৩ জন আহত হন।এর পর আট মাস ওই এলাকায় নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখা হয়।

১০। লিটল ইন্ডিয়ায় দাঙ্গা (৮ ডিসেম্বর, ২০১৩)
বিভীষিকাময় এই রাতের কথা স্মরণ হলে এখনও সিঙ্গাপুরের লিটল ইন্ডিয়ার অধিবাসীরা শিউরে উঠে।

২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর রাতে মদ্যপ অবস্থায় বাসের নীচে চাপা পড়ে ভারতীয় এক নাগরিক। নিহত হওয়ায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা অন্যান্য ভারতীয়রা আশপাশের বেশ কয়েকটি গাড়ি ও দোকানপাটে ভাংচুর চালায়। ধরিয়ে দেয়  আগুন। এতে পুরো এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

এক পর্যায়ে পুলিশ ও দমকল বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে তাদেরকেও আক্রমণ করে বিক্ষোভকারীরা। তারা পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়ার পাশাপাশি ইট পাটকেল ছুঁড়তে থাকলে ১১ জন পুলিশ সদস্য আহত হন।

এরপর পুলিশের অভিযানে শতাধিক বিদেশি অভিবাসীকে আটক করা হয়।তদন্ত ও সাক্ষ্য প্রমাণ শেষে ২৪ জন ভারতীয় নাগরিককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ওই ঘটনার পর থেকেই সিঙ্গাপুরে ভারতীয়সহ দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকদের অভিবাসনে কড়াকড়ি আরোপ কর‍া হয়। পাশাপাশি লিটল ইন্ডিয়ায় নিরাপত্তামূলক বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হয়।

বাংলাদেশ সময়: ১২০৩ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৫

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

প্রবাসে বাংলাদেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2015-02-12 01:02:00