ঢাকা, রবিবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২২ মে ২০২২, ২০ শাওয়াল ১৪৪৩

প্রবাসে বাংলাদেশ

নিজ মেধার উত্তরাধিকার দেখে যেতে চান পার্থ প্রতীম

সৈয়দ আনাস পাশা, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১০৫৯ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৮, ২০১৪
নিজ মেধার উত্তরাধিকার দেখে যেতে চান পার্থ প্রতীম প্যারিসে বাংলানিউজকে সাক্ষাতকার দিতে গিয়ে প্রতিবেদকের সাথে একান্ত একটি মূহূর্তে

লন্ডন: বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মুকাভিনেতা পার্থ প্রতীম মজুমদারের ৬০তম জন্মদিন শনিবার। নিজ মেধার গুনে আন্তর্জাতিকভাবে যতই খ্যাতি অর্জন করুন এই ‘আর্টিস্ট অব সাইলেন্স’, সব স্বপ্ন কিন্তু তাঁর জন্মভুমি বাংলাদেশকে ঘিরেই।



৬০তম জন্মদিনে ১৮ই জানুয়ারি শনিবার প্যারিস সময় রাত ১২.০২ মিনিটে বাংলানিউজের পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর সময় হওয়া কথাবার্তায় এমনটাই বলেন তিনি।

জন্মদিনের ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিজ জেলা পাবনার মেয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা সূচিত্রা সেনের মৃত্যুতে মনটা ভালো নেই। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা জন্মদিনের শুভেচ্ছায় নিজ ফোন, ফেইসবুক, ইমেইল ব্যস্ত হয়ে পড়ায় এই কষ্ট দীর্ঘক্ষন আমার মন দখলে রাখতে রাখতে পারেনি।

তিনি কি স্বপ্ন দেখেন এমন প্রশ্নের উত্তরে পার্থ প্রতীম মজুমদার বলেন, ‘মুকাভিনয়ে আমি যতটুকু করছি তা যদি আমার মেধা হয়, তাহলে এই মেধার যোগ্য উত্তরাধিকার দেখে যেতে চাই আমি। আন্তর্জাতিক মুকাভিনয় জগতে প্রবেশ করে আমি যতটুকু শিখেছি, আমার এই শিক্ষা আমার জন্মভুমির ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যে আমি বিলিয়ে দিতে চাই।

আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক মানের মাইম ইন্সটিটিউট হবে, যার মাধ্যমে আমার অর্জিত মেধা আমি বিলিয়ে দেবো মাইমের প্রতি আকৃষ্ট আমার দেশটির পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে, দীর্ঘদিন থেকে আমি এই স্বপ্নই দেখছি, এই মুহূর্তের স্বপ্নও আমার এটি’।

মাইম ইন্সটিটিউটের স্বপ্নের বাইরে দেশ নিয়েও অনেক স্বপ্ন দেখেন মুকাভিনয়ের মুখোশের ভেতরের এই দেশপ্রেমিক মানুষটি।

সম্প্রতি প্যারিসে বিশিষ্ট সাংবাদিক দেবেশ বড়ুয়ার বাসায় বাংলানিউজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতকারে দেশ নিয়ে তাঁর স্বপ্নের পাশাপাশি অনেক হতাশার কথাও বলেন এই মুকাভিনয় শিল্পী।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে আজও যখন ধর্মের বিভাজন সামনে এনে সাম্প্রদায়িক হামলা হয় তখন খুবই আহত হন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাঙালির গর্ব এই মানুষটি।

বাংলানিউজকে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাই ছিল অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। সেই চেতনা যদি রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে আজ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে, তাহলে আমাদের আর থাকেই বা কি?’

নিজের বসবাসস্থল ফ্রান্সের রাজনীতি ও গণতন্ত্র চর্চার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সসহ উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে গণতন্ত্রের চর্চা হবে এটিতো স্বপ্ন দেখার কোন বিষয় ছিলনা। জাতি হিসেবে আমরা আর কত স্বপ্ন দেখবো? অপার সম্ভাবনা থাকা সত্বেও স্বপ্নের বাস্তবায়ন কেন আমাদের ভাগ্যে জুটছে না। ’।

মুকাভিনয় জগতে নিজের পথচলা নিয়ে বাংলানিউজের সাথে বিভিন্ন স্মৃতিচারণও করেন পার্থ। ১৯৭৪ সালে মুকাভিনয় শুরুর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,  ‘তখন এসব শেখা খুব কঠিন ছিল। গান নিয়েই তখন ব্যস্ত থাকতাম বেশি। মিউজিক কলেজে পড়তাম ও গান গাইতাম আমি। ’।

ষাটের দশকে কলকাতায় গিয়ে পড়াশোনার কথা উল্লেখ করে পার্থ বলেন, ‘ফরাসী কলোনি চন্দন নগরে যোগেশ দত্ত নামে একজন মুকাভিনয় চর্চা করতেন। মার্সেল মার্সোর মুকাভিনয়ের প্রতি আগ্রহী হয়েই তিনি এই চর্চা শুরু করেন। ট্রায়াঙ্গলার পার্কের কাছে অবস্থিত তাঁর বাড়ির কাছেই আমার এক আত্মীয় থাকতেন। সেই সূত্রে আমারও যাতায়াত শুরু হয় যোগেশ দত্তের বাড়িতে।

আমারও ইচ্ছে তাঁর কাছে মুকাভিনয়টা একটু শিখি।   কিন্তু এই শিল্পে ভাত জুটে না, এই অজুহাতে তিনি আমাকে শিখাতে রাজি নন। এরপরও অল্প কিছু শিখে দেশে ফিরে আসলাম। মুকাভিনয় জগতে প্রবেশের এটিই আমার প্রাথমিক পর্যায়। বাংলাদেশ তখন স্বাধীন হয়েছে, দেশে এসে ভর্তি হলাম মিউজিক কলেজে। ’

বাংলানিউজের কাছে দেশ ছেড়ে ফ্রান্স চলে আসারও অনেক স্মৃতিচারণ করলেন পার্থ। তিনি জানান কলকাতা থেকে ফেরার পর মিউজিক কলেজেই মাইম প্রাকটিস করতেন তিনি।

খুব কম মানুষই তখন মুকাভিনয় সম্পর্কে জানতো, এমন মন্তব্য করে পার্থ বলেন, ‘বন্ধুবান্ধব ও কলেজের টিচাররা জানতে চাইতেন এটি কি?। তাদের বলতাম এটি হলো অঙ্গভঙ্গি দিয়ে মানুষের অনুভূতি তুলে ধরার একটি শিল্প। এটির নাম মাইম মানে মুকাভিনয়। ’ ৭৪ এ লালকুঠিতে অনুষ্ঠিত পারফরমেন্স, ৭৫ এ বিটিভিতে প্রচারিত শিক্ষাঙ্গন প্রোগ্রামে মিউজিক কলেজের অংশ নেওয়া একটি পর্বে গানের পাশাপাশি ১৫ মিনিটের মুকাভিনয় ইত্যাদি পারফরমেন্সগুলো ব্যাপক হিট হওয়ায় তিনি অনেক লাইম লাইটে চলে আসেন বলে জানান পার্থ।

এ প্রসঙ্গে তিনি বিটিভি’র প্রয়াত ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’, ‘আপন প্রিয়’, ‘বলা বাহুল্য’  ইত্যাদি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার কথা উল্লেখ করেন। এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় পত্রপত্রিকায় তাঁকে নিয়ে লেখালেখি শুরু হয় বলে জানান পার্থ।

তিনি বলেন, ‘এমনি এক মূহুর্তে ফরাসি দূতাবাসের কালচারেল সেন্টারের ডিরেক্টরের মাধ্যমে ফরাসী রাষ্ট্রদূত ডেকে নিয়ে বললেন আমাদের এখানে তোমি অনুষ্ঠান করো। তিন তিনটা অনুষ্ঠান করার পর রাষ্ট্রদূত একদিন বললেন মুকাভিনয়ে তোমার যে মেধা তাতে তোমি স্কলারশিপ নিয়ে প্যারিসে যেতে পারো।

তিনি আমাকে বললেন তুমি শুধু তোমাদের সরকার থেকে একটি ‘নো অবজেকশন’ সার্টিফিকেট নিয়ে আসো, বাকি ব্যবস্থা আমি করবো। ‘নো অবজেকশন’ সার্টিফিকেট নিতে গিয়ে বুঝলাম যতই মেধা থাকুক ‘তদবির মামা’ না থাকলে বাংলাদেশে সাফল্যের দেখা পাওয়া যে কত কঠিন। অনেক আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শেষ পরয্ন্ত দীর্ঘ আড়াই বছর পর এই সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে সম্ভব হলাম আমি। ’

স্কলারশিপ নিয়ে প্যারিসে এসে বিশ্ববিখ্যাত মুকাভিনয় শিল্পী মার্সেলো মার্সোর সাথে পরিচয় পর্বের স্মৃতিচারণও করলেন বাংলানিউজের সাথে পার্থ।

তিনি বলেন, ‘মার্সোর একটি শো দেখতে গিয়েই প্রথম পরিচয় হয় তাঁর সাথে। এরপর তাঁর প্রতিষ্ঠানেই মুকাভিনয়ে প্রশিক্ষন নেওয়া শুরু হয় আমার। মার্সোর গ্রুপের সঙ্গে কাজ করার সুযোগে পৃথিবীর অনেক স্থানে যেতে পেরেছি আমি। ’ মার্সোর সাথে তাঁর পিতা-পুত্রের সম্পর্ক ছিল এমন মন্তব্য করে পার্থ বলেন, ‘তাঁর সাথে সম্পর্কের কথা স্মরণ হলে নিজেকে একজন ধন্য মনে হয়। ’

এত বড় মাপের একজন মানুষ আপনি, এটি ভাবতে কেমন লাগে? বাংলানিউজের এমন এক প্রশ্নের জবাবে পার্থ বলেন, ‘নিজেকে আমি বড় কিছু মনে করিনা। তবে বিশ্ব পর্যায়ে কাজ করতে পেরেছি, মুকাভিনয় জগতের কিংবদন্তি মার্সেলো মার্সোর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সন্তানতূল্য স্নেহ পেয়েছি এটি আমার জীবনের পরম পাওয়া।

বাংলাদেশ সম্পর্কে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সের নাগরিক হলেও আমি বাংলাদেশের মাটির সন্তান। প্যারিসে বসবাস করলেও মন ও মননে সব সময় আমার বাংলাদেশের অবস্থান।

উল্লেখ্য, মুকাভিনয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সম্মাননা পেয়েছেন বাংলাদেশের ছেলে পার্থ প্রতীম মজুমদার। এরমধ্যে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সাংষ্কৃতিক পদকশেভালিয়র(নাইট)ছাড়াও রয়েছে থিয়েটারে ইউরোপের সর্বোচ্চ মরযাদাপূর্ণ এওয়ার্ড ‘মলিয়েরা এওয়ার্ড’, সাউথ ইষ্ট এশিয়ার একমাত্র মাইম ইন্সিটিউট থেকে প্রাপ্ত ‘মাষ্টার অব মাইম’ এওয়ার্ড,  মালয়েশিয়ান মিডিয়ার দেয়া ‘মাষ্টার অব দ্যা ওয়ার্ল্ড’ পদক ইত্যাদি।

২০১০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকেও ভূষিত হন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই মুকাভিনেতা। পার্থ সম্পর্কে বিশ্ব মুকাভিনয় জগতের কিংবদন্তী মার্সেলো মার্সোর মন্তব্য–‘পার্থ ইজ দ্য ব্রিজ অব কম্যুনিকেশন বিটুইন ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট। ’ ১৯৮০ সাল থেকে প্যারিসে বসবাস করছেন বাঙালির গর্ব পার্থ প্রতীম মজুমদার।

বাংলাদেশ সময়: ১০৫০ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৮, ২০১৪
সম্পাদনা: নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa