ঢাকা, রবিবার, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১২ রবিউস সানি ১৪৪২

মুক্তমত

বাজেট: অবাস্তব নাকি দরকারি?

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২৩৩৯ ঘণ্টা, জুন ১৭, ২০২০
বাজেট: অবাস্তব নাকি দরকারি? প্রতীকী ছবি

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছেন, যেখানে ৮.২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথাও বলা হয়েছে। বর্তমান করোনা প্রেক্ষাপটে যা অনেকের কাছে মনে হয়েছে কল্পনাবিলাসী এবং অবাস্তব। আসলেই কি তাই?

এ বছর উন্নয়ন বাজেট করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা যা জিডিপির প্রায় ৬.৫ শতাংশ। আমাদের বাজেট ঘাটতিও প্রায় ৬ শতাংশ।

ঘাটতির সঙ্গে উন্নয়ন বাজেট মোটেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একটি দেশের বাজেটে ঘাটতি থাকা মানে হচ্ছে দেশটি চাচ্ছে তার তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে, চাচ্ছে অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরি করতে, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে। ঘাটতি বাজেট খারাপ কেন হবে? বরং এটাই তো দরকার ছিল!

তবে প্রশ্ন আসতে পারে এই ঘাটতি মেটাবে কি করে বাংলাদেশ? ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার এই ঘাটতি পোষানো সহজ হবে না। তবে বৈদেশিক ঋণ একটা উপায় হতে পারে। ভারত এবং পাকিস্তানের মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ৬৯.০৪% এবং ৭৬.৭৩%।

সেখানে আমাদের এই পরিমাণটা ৩০% এর আশেপাশে আছে বেশ কিছু বছর ধরে। এই অনুপাতে আমরা বিশ্বের সব থেকে নিচের সারির দেশগুলোর মধ্যে একটি। আমরাতো আরিকটু সাহসী চাইলেই হতে পারি।

করোনাকালীনে এবং পরবর্তী সময়ে অনেক দেশই এই ঋণ গুলো পেতে আগ্রহ দেখাবে। সেখানে আমাদের উচিত এখন থেকেই এই ঋণ সহায়তার জন্য তদবির চালানো।

কালো টাকা সাদা করার একটি উপায় সরকার দিয়েছে এই বাজেটে। বাংলাদেশে সরাসরি আর্থিক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ থাকছে কালো টাকাধারীদের। ২০১৫ সালে আমাদের দেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। কালো টাকা বিনিয়োগের এই সুযোগ টাকা পাচারের একটা সমাধান হতে

পারে। এছাড়া কালো টাকার উপর এই ১০% কর হল উপরি পাওয়া! প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনার চাপ আর ব্যাংকে তারল্যের সংকটও যে মোচন করতে হবে, এটাতো অস্বীকার করা যাবে না। আমাদের লাগবে টাকা, অনেক পরিমাণে। কালো টাকার মালিকদের সেই টাকা বিদেশের ব্যাংকে না জমিয়ে দেশের মাটিতে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিলে উপরন্তু আমাদেরই লাভ হওয়ার কথা।

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট ধরা হয়েছে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা যা গত অর্থবছরের কাছাকাছি। করোনার কারণে আরও বাড়ানো যেত হয়তোবা। কিন্তু বাজেট বাড়ানোতেই কি শুধুমাত্র সমাধান?

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বরাদ্দের মাত্র ২৬.৭১ শতাংশ খরচ করেছে আর স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং পরিবারকল্যাণ বিভাগ করেছে মাত্র ২৪.৯৪ শতাংশ। সুতরাং বরাদ্দ বৃদ্ধিই শুধু নয়, বরাদ্দ বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধিও আসলে প্রয়োজন।

ধনী-গরীব বৈষম্য কমাতে ব্যাংক হিসাবের স্থিতির ওপর আবগারি শুল্কের হার বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংকে কারো ১০ লাখ টাকা থাকলেই তাকে এই শুল্ক দিতে হবে আগের থেকে বেশি পরিমাণে। টাকার পরিমাণ যত বেশি, শুল্কের পরিমানও তত বেশি।

গাড়িতে বাৎসরিক করের পরিমাণ ৫০ থেকে ৬৭ শতাংশ বাড়ানোও একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় রাস্তা অপ্রতুল। প্রায় ২২ লাখ গাড়ি চলাচল করে আমাদের এই রাস্তা গুলো দিয়ে। চলমান পরিস্থিতিতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ঝুঁকি আর উবার-পাঠাও এর অভাবে অনেকেরই ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে।

আমরা চাই না রাস্তায় আরও গাড়ি বাড়ুক। তাই বাৎসরিক কর বৃদ্ধি রাস্তায় গাড়ি কমানোর একটা সমাধান হতে পারে। একের অধিক গাড়ি ওয়ালাদের উপর বোঝাটা যৌক্তিক ভাবেই বেশি।    

আমাদের বাজেটে এবার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মূলত ৪টি দিক। স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান। করোনাকালীন সময়ে এই চার দিকে নজর দিতেই হত।

তবে শিক্ষা ও গবেষণায় বাজেট বৈশ্বিক মানদণ্ডে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। আমাদের জিডিপি বনাম শিক্ষায় খরচ এর অনুপাতটি হচ্ছে ২.১ যা ২০০টি দেশের মধ্যে আমাদের দেশকে ঠেলে দিয়েছে ১৮২ নাম্বারে।

এছাড়া মেগা প্রজেক্টে খাত ভিক্তিক বাজেট ১৫০ কোটি থেকে ১২০০ কোটি টাকার মত কমানো হয়েছে। করোনা পরবর্তী সময়ের কথাও আমাদের চিন্তা করা উচিত। বড়সড় একটা লাফ দিয়ে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমরা আরো এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারি নিকট ভবিষ্যতে।

সেটার জন্য লাগবে অনুকূল পরিবেশ। সেই পরিবেশ আনতে লাগবে অনেক অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর সরকারের বিনিয়োগ বান্ধব পলিসি। করোনা পিছিয়ে দিয়েছে অনেক আমাদের। কিন্তু লক্ষ রাখতে হবে, কোন কিছুতেই পথ যেন বন্ধ না হয়ে যায়।

আমাদের এ বছরের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮.২০ শতাংশ। অনেক উচ্চাভিলাষী প্রাক্কলন, কোন সন্দেহ নেই। তবে আমাদের হাতে বিকল্প ছিল খরচ কমিয়ে কোনরকম আত্মরক্ষামূলক একটি বাজেট দিয়ে প্রবৃদ্ধি কম ধরতে।

সেটি না করে আমরা সাহস দেখিয়েছি, আশা করেছি ঘুরে দাঁড়ানোর। একটি দেশের অর্থনীতিতে আয়ের চেয়েও বোধহয় খরচ করতে পারাটা বেশি দরকারি। যত খরচ হবে, উৎপাদনকারীরা তত উৎপাদন করবে, জিডিপিও বাড়বে তত বেশি, আরও উন্নত হবে দেশ।

বড় বড় সমস্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশকে অর্থনৈতিক ভাবে সম্ভাবনাময় দেখাচ্ছে। এই সুযোগ আমরা কেন নেব না? ধনীদের কথা শুধু না ভেবে সাধারণ মানুষের জন্য করা এ বছরের বাজেট আমাদের সামনের কণ্টকাকীর্ণ পথ চলায় সাহস দিবে তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।

লেখক:

* মীর মো. তাসনীম আলম, সহকারী ব্যবস্থাপক, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন।
* কে এম ইশমাম, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা জেলা প্রশাসন।

বাংলাদেশ সময়: ২৩৩৯ ঘণ্টা, জুন ১৭, ২০২০
এমআর/টিসি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa