ঢাকা, বুধবার, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

জাতীয়

ভিটিএমআইএস সিস্টেমে নিরাপত্তা বেড়েছে মোংলা বন্দর চ্যানেলে

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮০৬ ঘণ্টা, আগস্ট ৮, ২০২২
ভিটিএমআইএস সিস্টেমে নিরাপত্তা বেড়েছে মোংলা বন্দর চ্যানেলে

বাগেরহাট: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বন্দর নিরাপত্তা সিস্টেম ভিটিএমআইএস (ভ্যাসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম) স্থাপন করেছে মোংলা বন্দর। ফলে মোংলা বন্দর চ্যানেলে জাহাজের নিরাপত্তা যেমন বেড়েছে, কমেছে দুর্ঘটনাও।

 

জাহাজ হ্যান্ডেলিং ও ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়েছে কয়েকগুণ। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুনাম বেড়েছে বন্দরের। এর ফলে আগের তুলনায় বিদেশি জাহাজও আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে মোংলা বন্দরে। এভাবে চলতে থাকলে দিনে দিনে বন্দর আরও এগিয়ে যাবে বলে দাবি মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের।

মোংলা বন্দর সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) এর শর্ত অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দরে ভিটিএমআইএস থাকা বাধ্যতামূলক। মোংলা বন্দরে ভিটিআইএমএস না থাকায় অনেক সময় বিদেশি জাহাজ আসতে চাইতো না। যার ফলে আইএমও এর শর্ত পূরণ করতে ২০১৭ সালে মোংলা বন্দরে ভিটিএমআইএস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৫২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে যা ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে মোংলা বন্দর চ্যানেলের মোংলা, হিরণপয়েন্ট, হামিদ পয়েন্ট, ও হাড়বাড়িয়া এলাকায় চারটি অত্যাধুনিক টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে রাডার, রেডিও টেকনোলজি, ওয়ারলেস সিস্টেম, এআইএস (অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম), ডিএসসি (ডিজিটাল সিলেক্টিভ কলিং) ও ভিডিও ক্যামেরা। এই সিস্টেম থেকে বন্দর চ্যানেলের কোথাও কোনো দুর্ঘটনা বা কোনো প্রকার ঝামেলা হলে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানতে পারে।  

এছাড়া জাহাজ আগমন ও নির্গমনের তথ্য সয়ংক্রিয়ভাবে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সার্ভারে এন্ট্রি হবে এবং ৩০ দিন পর্যন্ত এসব তথ্য রেকর্ড থাকবে বন্দরের কাছে। যার ফলে মোংলা বন্দর চ্যানেলে জাহাজের নিরাপত্তা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, জাহাজ ব্যবস্থাপনায়ও গতি এসেছে। ভিটিএমআইএস সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ ও দেখভালের জন্য মোংলা বন্দরের ২৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। যারা সবাই এই সিস্টেম সম্পর্কে দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দক্ষতা অর্জন করেছেন। ভিটিএমআইএস সিস্টেমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পাইলট মামুনুর রশীদ।

তিনি বলেন, ভিটিএমআইএস সিস্টেমের ফলে বন্দর চ্যানেলে আসা এআইএস সিস্টেমযুক্ত সব জাহাজকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এই সিস্টেমের ফলে বন্দর চ্যানেলে আসা জাহাজের সব ধরনের তথ্য স্বয়ক্রিয়ভাবে আমাদের কাছে চলে আসে। জাহাজটি কি করছে, কোথায় এ্যাঙ্কর করছে, কোনদিকে মুভ করছে, জাহাজের আশপাশ দিয়ে কি যাচ্ছে সবকিছু আমরা দেখতে পাই। এমনকি জাহাজের পাশ দিয়ে কোনো অবাঞ্চিত নৌযান গেলেও তা আমরা জানতে পারি। ওই নৌযানে যদি কোনো দস্যু বা খারাপ লোক থাকে আমরা জাহাজ কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে পারি। এছাড়া চ্যানেলের মধ্যে কোনো জাহাজ যদি অন্য জাহাজকে ওভারটেকিং বা ক্রস করতে চায় এক্ষেত্রে কতটুকু স্পেস থাকা প্রয়োজন এবং ওই ওভারটেকিং বা ক্রসিংয়ের ফলে তাদের মধ্যে যদি সংঘর্ষ বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে সেটাও আমাদের সিস্টেমের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। তাৎক্ষণিকভাবে আমরা জাহাজটিকে সতর্ক করাসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারি। ফলে বন্দর চ্যানেলের নিরাপত্তা যেমন বৃদ্ধি পয়েছে, তেমনি দুর্ঘটনাও কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।

পাইলট মামুন আরও বলেন, একটা সময় ছিল বন্দর চ্যানেলে আসা জাহাজগুলোর কাছ থেকে আমাদের তথ্য নিতে হত। কিন্তু এখন বন্দর চ্যানেলের ফেয়ারওয়ে বয়ায় প্রবেশের তিন ঘণ্টা আগে এবং বয়া ছেড়ে যাওয়ার তিন ঘণ্টা পর পর্যন্ত জাহাজ সম্পর্কিত তথ্য এবং তার সব ধরনের কার্যক্রমের তথ্য-ভিডিও আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেয়ে যাই। এটা ৩০ দিন পর্যন্ত আমাদের সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকে। ওই জাহাজ যদি কোনো প্রকার দূষণ বা আইনবিরোধী কোনো কাজ করে থাকে সেটাও আমাদের সিস্টেমে রেকর্ড থাকে। এক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ সহজেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। এক কথায় বলতে গেলে এই সিস্টেমের ফলে বন্দরের কাযক্রম অনেক সহজ হয়েছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দিন বলেন, নিরাপত্তা একটা বন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভিটিএমআইএস সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের সেটা নিশ্চিত হয়েছে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে আমরা যেকোন জাহাজকে বিপদ-আপাদে প্রয়োজনে সহযোগিতা করতে পারি। এই সিস্টেমের ডিএসসি (ডিজিটাল সিলেক্টিভ কলিং) এর মাধ্যমে আমরা এআইএস সংযুক্ত প্রতিটি জাহাজকে কল করে তার সুবিধা অসুবিধা জানানোসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারি। জরুরি মুহূর্তে জাহাজগুলোও তাদের সমস্যা আমাদের জানাতে পারে। ফলে আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সুনামও বৃদ্ধি পয়েছে। এজন্য বন্দর ব্যবহারকারীরাও আগের থেকে অনেক খুশি।

মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী ও বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মো. লিয়াকত হোসেন লিটন বলেন, মোংলা বন্দরে একটা সময় নিরাপত্তার বেশ অভাব ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার আসার পর সেটার অনেক উন্নতি হয়েছে। সেই সঙ্গে ভিটিএমআইএস সিস্টেম বসানোয় মোংলা বন্দর চ্যানেলে আসা জাহাজ ও লাইটার জাহাজের নিরাপত্তা আগের থেকে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য আমরা মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বর্তমান সরকারকে ধ্যনবাদ জানাই।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ তরফদার বলেন, ভিটিএমআইএস স্থাপনের মধ্য দিয়ে বন্দরের নিরাপত্তা, সক্ষমতা ও সুনাম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সিস্টেমের ফলে আমরা পুরো বন্দর চ্যানেলকে একনজরে দেখতে পারি। কোন জাহাজ কোথায় রয়েছে, কি করছে তা আমরা বন্দর অফিসে বসেই দেখতে পারি। এর ফলে ফেয়ারওয়ে বয়া থেকে রামপাল পর্যন্ত আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাই বন্দরে নিরাপত্তা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে অপরাধও কমেছে। কমেছে দুর্ঘটনাও। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে বন্দরের সুনামের সঙ্গে সঙ্গে কার্যক্রমও বৃদ্ধি পাবে বলে মন্তব্য করেন বন্দরের অন্যতম এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

১৯৫০ সালে পশুর নদীর জয়মনির ঘোলে চালনা এ্যাংকারেজ পোর্ট নামে মোংলা সমুদ্র বন্দরের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ব্রিটিশ পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ “দি সিটি অব লিয়নস” সর্বপ্রথম এই বন্দরে এসেছিল। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মোংলা বন্দর বর্তমানে একটি জনপ্রিয় ও অন্যতম বন্দর হিসেবে পরিণত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় মোংলা বন্দরে ভিটিএমআইএস সংযুক্ত করা হল। চট্টগ্রাম বন্দর ২০১৪ সালে ভিটিএমআইএস সিস্টেম যুক্ত করে।
 
বাংলাদেশ সময়: ১৭৫৮ ঘণ্টা, আগস্ট ০৮, ২০২২
আরএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa