ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

জাতীয়

৩৫ ঘণ্টা হয়রানি শেষে স্বামী-স্ত্রীর লাশ পেল স্বজনরা

আবাদুজ্জামান শিমুল,সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৭০৯ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৯, ২০২১
৩৫ ঘণ্টা হয়রানি শেষে স্বামী-স্ত্রীর লাশ পেল স্বজনরা

ঢাকা: বিষপানে মারা যাওয়া দম্পতির মরদেহ অনেক হয়রানি শেষে দীর্ঘ ৩৫ ঘণ্টা পর বুঝে পেয়েছেন স্বজনরা।

মঙ্গলবার (১৯ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গ থেকে ময়নাতদন্তর পরে স্বজনদের কাছে মরদেহ দুটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

সোমবার (১৮ অক্টোবর) গাজীপুরের কাশিমপুর থেকে ফিরোজ ও তার স্ত্রী লিজাকে অচেতন অবস্থায় প্রতিবেশী রঙ্গিলা ও তার স্বামী রান্টু ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসলে দায়িত্বরত চিকিৎসক ভোর ৪টা ২৪ মিনিটে উভয়কে মৃত ঘোষণা করেন।

এর পরপরই হাসপাতালের মর্গ অফিসের তত্ত্বাবধানে তাদের মরদেহ জরুরি বিভাগ মর্গের ফ্রিজের বাইরে রাখা হয়। টানা ১৬ঘণ্টা বাইরে থাকার পরে শাহবাগ থানা পুলিশ সোমবার রাত ৮টায় হাসপাতালে এসে মরদেহ দুটি ফ্রিজে রাখে। এরই মাঝে ১৬ ঘণ্টা মরদেহ দুটির খোঁজ নিতে স্বজনদের অনেক ধকল পোহাতে হয়।

যদিওবা অনেক দূর থেকে দুপুরের দিকে হাসপাতালে ছুটে আসে নিহতদের স্বজনরা। পরে তারা হাসপাতালে পুলিশের কাছে বিষয়টি অবগত হয়ে মরদেহের খবর নিতে চলে যায় ঢামেক মর্গ অফিসে। সেখান থেকেই শুরু হয় স্বজনদের হয়রানি ও ধকল। মর্গ অফিস থেকে স্বামী-স্ত্রীর মরদেহ নেওয়ার বিষয়ে নানারকম কথা বলা হয়। কেউ বলেন কাশিমপুর থানায় যান, আবার কেউ বলেন শাহবাগ থানায় যাবেন। এ অবস্থায় স্বজনরা বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী করবেন। এভাবে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। একপর্যায়ে মর্গ অফিসের লোকজনে দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বজনরা দুই হাজার টাকার বিনিময়ে স্বামী-স্ত্রীর ডেথ সার্টিফিকেটের ফটোকপি হাতে পায়।

এরপর সেই সার্টিফিকেট নিয়ে তারা শাহবাগ থানায় যোগাযোগ করে। পরে শাহবাগ থানার (এসআই) রাশেদুল আলম ঢামেক মর্গে এসে মরদেহ দুটি বাইরে পড়ে থাকতে দেখতে পেয়ে দ্রুত ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ১৬ ঘণ্টা দুটি মরদেহ কেন বাইরে ছিল বুঝে উঠতে পারছি না। এরপরে স্বজনদের জানান, মঙ্গলবার (১৯ অক্টোবর) সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে মরদেহের ময়না তদন্ত হবে। তারপরে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

মৃত লিজার মামা নাসির উদ্দিন জানান, ঢামেক মর্গ অফিসে যখন মরদেহ নিতে হলে কী করতে হবে জানতে চাইলে সেখান থেকে নানারকম কথা বলা হয়। কেউ বলে কাশিমপুর যান, আবার কেউ বলে শাহবাগ থানায় যান। কিন্তু কেউ কোনো সঠিক তথ্য দেয়নি। কোনো কাগজপত্রও দেয়নি। একপর্যায়ে মর্গ অফিসে থাকা একজনের হাতে পায়ে পর্যন্ত ধরেছি, তবুও তাদের মন গলেনি। পরে তাদের চাহিদা মোতাবেক দুই হাজার টাকা দেওয়ার পর ডেথ সার্টিফিকেটের ফটোকপি হাতে পাই। ডেথ সার্টিফিকেট হাতে পাওয়ার পরে ভেবেছিলাম মনে হয় এখন মরদেহ নিতে পারব। তখন মর্গ অফিসে তাদের বলি মরদেহ দেন, আমরা নিয়ে যাই। সে সময় মর্গ অফিস থেকে জানানো হয়, এভাবে নিতে পারবেন না। শাহবাগ থানায় যান, জিডি করেন। তারা এসে আপনাদের নিয়ম অনুযায়ী দেবে। পরে রাতে শাহবাগ থানার পুলিশ এসে জানায়, ময়নাতদন্ত ছাড়া দেওয়া যাবে না। রাতে যেহেতু ময়নাতদন্ত হয় না। তাই মঙ্গলবার  নিতে হবে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ভোর চারটার সময় তারা মারা গেছে , অথচ রাত ৮টায় জানলাম মরদেহ দেওয়া হবে না।

আরেক মামা ওয়াসিম আহমেদ জানান, সবাই খুব গাফলতি করেছে। যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। মরদেহের একটা মানবাধিকার আছে। সেটা ভঙ্গ করেছে তারা। এছাড়া ১৬ ঘণ্টা ফ্রিজে না রেখে মরদেহ বাইরে ফেলে রেখেছিল এর বিচার কে করবে?

ঢামেক মর্গের সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, যে কোনো পুলিশ কেসের ক্ষেত্রে ডেথ সার্টিফিকেটের ফটোকপি অবশ্যই স্বজনদের কাছে দিতে বাধ্য। এছাড়া পুলিশ না আসা পর্যন্ত মরদেহ সংরক্ষণের দায়িত্ব  মর্গ অফিসের। যদি ডিএমপির বাইরে ঘটনা হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই শাহবাগ থানাকে জানাতে হবে। পরে তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

ঢামেক মর্গের ওয়ার্ড মাস্টার আবদুল গফুর জানান, ডেথ সার্টিফিকেটের বিনিময় টাকা নেওয়ার প্রশ্নেই ওঠে না। নিহতদের স্বজনদের কাজ থেকে এমন অভিযোগ পাইনি। মরদেহ বাইরে থাকার কারণ আমরা শুনেছি স্বজনরা ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দুটি নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এ বিষয়ে ঢামেকের পরিচালক ব্রি. জেনারেল মো. নাজমুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ডেট সার্টিফিকেট বিনিময় মর্গ অফিসে দুই হাজার টাকা নিয়েছে। এরকম একটা কথা শুনেছি। তবে কোনো প্রমাণ পাইনি। মর্গ অফিসে তারা কাকে টাকা দিয়েছে সেটাও জানতে পারিনি। তবে ভোর চারটায় দুইজন মারা গেছে, আর রাত ৮টা পর্যন্ত স্বজনরা  দৌড়াদৌড়ি করেছেন- এ বিষয়গুলি পুলিশ দেখবে। তবুও হাসপাতালের মর্গ অফিসের অভিযোগগুলো সত্য কিনা সেগুলো আমরা দেখছি।

এদিকে ঢামেক মর্গের একটি সূত্র জানান, দুটি মরদেহের কাগজ পাওয়ার  সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন। পরে সব প্রক্রিয়া শেষে পুলিশের উপস্থিতিতে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে স্বজনদের কাছে দুইজনের মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর স্বজনরা মর্গ ত্যাগ করেন।

** গাজীপুরে বিষপানে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু

বাংলাদেশ সময়: ১৬৫৯ ঘণ্টা, অক্টোবর ১৯, ২০২১
এজেডএস/এমএমজেড

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa