ঢাকা, বুধবার, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২২ মে ২০২৪, ১৩ জিলকদ ১৪৪৫

জাতীয়

বদলা নিতে ডেকে নিয়ে কোপানো হয় পাভেলকে

মিরাজ মাহবুব ইফতি, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১১৯ ঘণ্টা, এপ্রিল ১৭, ২০২৪
বদলা নিতে ডেকে নিয়ে কোপানো হয় পাভেলকে নিহত পাভেল ও গ্রেপ্তার পাঁচ আসামি

ঢাকা: রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় গ্রুপিং নিয়ে পাভেল ও হাবিবের মধ্যে মারামারি হয়। মারামারির এক পর্যায়ে হাবিবের হাতে কোপ দেন পাভেল।

ওই ঘটনায় ২০২৩ সালে ২৮ ডিসেম্বর বাড্ডা থানায় মামলা হয়। পাভেল জেল খাটলেও খেদ মেটেনি হাবিবের। বদলা নিতে পরিকল্পনা করতে থাকেন হাবিব। দুই-তিন বার চেষ্টা করেও ভেস্তে যায় তার পরিকল্পনা।

হাবিব নতুন করে পরিকল্পনা করেন। মাদক সেবনের জন্য তানজীব নামে এক সহযোগীর মাধ্যমে গত ১৪ এপ্রিল বিকেলে রাজধানীর বাড্ডার পাঁচতলা বাজার এলাকার বাসা থেকে পাভেলকে মোটরসাইকেল যোগে ডেকে নেওয়া হয় পল্লবীতে।  মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের স্বপ্ননগর আবাসিক এলাকার টেকেরবাড়ি নামক স্থানে গণপূর্তের পুকুরের উত্তরপাড়ে মাদক সেবন করেন পাভেল। এরমধ্যে সন্ধ্যার দিকে ঘটনাস্থলে বাসযোগে আসে হাবিবসহ আরও কয়েকজন। সবাই একসঙ্গে পাভেলের ওপর ঝাপিয়ে পড়েন। চাকু ও ছুরি দিয়ে পেট ও পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ৪৫টি আঘাত করা হয়। এরপর তাকে গণপূর্তের পুকুরের পানিতে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যান সবাই।

স্থানীয়দের মারফত খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে পাভেলের মরদেহ উদ্ধারের পর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পল্লবী থানা পুলিশ। এ ঘটনায় মঙ্গলবার (১৬ এপ্রিল) দিবাগত রাতে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গ্রেপ্তাররা হলেন— মামলার এজহারভুক্ত আসামি মূল পরিকল্পনাকারী মো. হাবিব (২৮), মো. হানিফ (২৬) ও মো. আনিছ (২২)। তাদের বরিশালের মেহেদীগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আর মামলার আসামি না হলেও জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িত সোহান ও সাবুদ্দিন নামে অপর দুজনকে ঢাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বুধবার (১৭ এপ্রিল) আসামিদের আদালতে সোপর্দ করা হলে ঘটনার সত্যতা ও জড়িত থাকার বিষয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন হাবিব। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাকি চারজনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত পাভেলের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলায়। তার বাবার নাম শায়েস্তা খান। পাভেল থাকতেন বাড্ডার পাঁচতলা বাজার এলাকায়। তিনি বাসচালকের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। তবে তার মায়ের ভাষ্যমতে, ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন পাভেল।

গত সোমবার পাভেলের মা পারুল বেগম বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজহারভুক্ত আসামি ছয়জন। তারা হলেন—মো. হাবিব (২৮), মো. হানিফ (২৬), মো. আনিছ (২২), মো. রায়হান ওরফে বাবুৃ (২২), মো. মিলন (৩৭), ও মো. জনি (২৬)। অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-ছয়জনকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে গত ১১ এপ্রিল গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায় যান পারুল বেগম। তবে ঢাকায় থেকে যান দুই ছেলে পাভেল ও তমাল। গত ১৪ এপ্রিল পাভেল বাসা থেকে বের হলে মামলার এক নম্বর আসামি মো. হাবিব ঘোরাঘুরি করার জন্য মোটরসাইকেলে করে পাভেলকে নিয়ে যান। রাত ৮টার সময় সব আসামিসহ অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জন পরস্পর যোগসাজশে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পাভেলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে।

পুলিশের সুরতহাল রিপোর্ট অনুযায়ী, পাভেলের পিঠে ছোট-বড় ২২টি এবং মাথায় ৮টি ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। আর মাথার পেছনে প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা আঘাতের চিহ্ন, কোমড়ে চারটি ধারালো অস্ত্রের ক্ষত দেখা গেছে। পাভেলের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছোট-বড় মোট ৪৫টি ধারালো অস্ত্রের ক্ষত-বিক্ষত আঘাত দেখেছে পুলিশ।

আসামিরা পাভেলের মৃত্যু নিশ্চিত করতেই লাশ গণপূর্তের পুকুরের উত্তর পাড়ে পানিতে ফেলে পালিয়ে যায় বলে উল্লেখ করে পারুল বেগম বলেন, আমি গত ১২ বছর যাবত বাড্ডায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছি। পাভেল আমার বড় ছেলে। পাভেল ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। সেই সূত্রে মামলার আসামিদের সঙ্গে আমার ছেলের পরিচয় ও চলাফেরা ছিল।

তিনি জানান, বাড্ডা এলাকায় মারামারি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা পরিচালনা, মাদক বিক্রয়সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আসামিরা। আমার ছেলে গত বছরের ২২ ডিসেম্বর বাধা দেওয়ায় তাদের সঙ্গে মারামারি হয়। আসামি হাবিব বাদী হয়ে পাভেলের বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় একটি মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় ১৮ দিন জেলহাজতে থেকে জামিনে মুক্তি পায় পাভেল।

এত তাড়াতাড়ি পাভেল কেন জামিনে বের হয়ে এলো, সেই কারণে হাবিবসহ অন্যরা ক্ষিপ্ত ছিল দাবি করে মা পারুল বলেন, পুনয়ায় শিক্ষা দিতেই এলাকায় বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখাতে থাকে তারা। আমার ছেলে পাভেল ভয়ে বিভিন্ন এলাকায় পালিয়ে থাকতো। আমি গত ১১ এপ্রিল বাড়ি যাবার পর ওরা আমার ছেলেটাকে মেরেই ফেললো।

এ বিষয়ে পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, বাড্ডা এলাকার গ্রুপিং নিয়ে এলাকায় পাভেল ও হাবিবের মধ্যে মারামারি হয়। পাভেল কোপ দেয় হাবিবের হাতে। এ ঘটনায় ২০২৩ সালে ২৮ ডিসেম্বর বাড্ডা থানায় মামলা হয়। মামলা নং ৬১।

তিনি বলেন, ওই মামলায় গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন পাভেল। পরবর্তীতে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি। এরপর থেকেই পাভেলকে মারার পরিকল্পনা করছিলেন হাবিব। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই পাভেলকে কোপানোর পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। হাবিব তার এলাকার বন্ধু তানজীবের সহায়তায় পল্লবী স্বপ্ননগর আবাসিক এলাকার পেছনে ডেকে নিয়ে যান হাবিবকে।

পরিদর্শক আমিনুল আরও বলেন, সেখানে তারা মাদক সেবন করেন। এরপর হাবিবসহ অন্যরা উপস্থিত হবার পর চাকু আর ছুরি দিয়ে ৪৫টি আঘাত করে পাভেলকে পানিতে ফেলে যান। সেখানে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে পাভেলের মৃত্যু হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, পাভেল নিজেও মাদক সেবন ও কারবারে জড়িত ছিলেন। তবে তিনি এ সংক্রান্ত কারণে কখনো পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হননি। অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার ও পলাতক প্রত্যেক আসামির নামে একাধিক মামলা রয়েছে। আসামিরা স্বল্পশিক্ষিত। পাভেল হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী হাবিব বাড্ডার সুবাস্তু টাওয়ারে চাকরি করেন বলে জানান পরিদর্শক আমিনুল।

আরও পড়ুন:
পল্লবীতে পুকুরপাড়ে পড়েছিল যুবকের লাশ, পুলিশ বলছে হত্যা

বাংলাদেশ সময়: ২১০৯ ঘণ্টা, এপ্রিল ১৭, ২০২৪
এমএমআই/এমজেএফ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।