ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ শাবান ১৪৪৫

জাতীয়

ঈদকে সামনে রেখে সরগরম বগুড়ার বেনারসি পল্লী

কাওছার উল্লাহ আরিফ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১২২২ ঘণ্টা, এপ্রিল ২, ২০২৩
ঈদকে সামনে রেখে সরগরম বগুড়ার বেনারসি পল্লী

বগুড়া: বগুড়া শেরপুর উপজেলার ঘোলাগাড়ী কলোনির আরেক নাম ‘বেনারসি পল্লী’। ১৯৯০ সালের পর থেকে এ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও কালের আবর্তনে এখন জীবন বাঁচাতে কোনোরকম পেশাটাকে ধরে রেখেছেন এখানকার কারিগররা (তাঁতি)।

তবে ঈদ এলেই ‘খটাশ-খটাশ’ শব্দে মুখর হয়ে ওঠে বেনারসি পল্লী। সে সঙ্গে ঘূর্ণমান মেশিনে সূতো গোছানোর পাশাপাশি ড্রাম মেশিনের সাহায্যে সুতা প্রসেসিংসহ শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত থাকে শ্রমিক।

রোববার (২ এপ্রিল) বেনারসি পল্লী নামে খ্যাত ঘোলাগাড়ী কলোনিতে গিয়ে দেখা মেলে শাড়ি তৈরিতে কারিগরদের কর্মব্যস্ততা।

মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বেনারসি পল্লীতে এতোসব আয়োজন। দরজায় কড়া নাড়ার দিন ঘনিয়ে আসছে। সময়ের সঙ্গে ঘনিয়ে আসছে ঈদুল ফিতর। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেনারসি তৈরিতে দিনরাত অতিবাহিত করছেন কারিগররা।

জেলা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলা শহর। সেখান থেকে ৪-৫ কিলোমিটার পশ্চিমে গেলে দেখা মিলবে এই ঘোলাগাড়ী কলোনির। বাহিরের মানুষের কাছে ঘোলাগাড়ী কলোনি ‘বেনারসি পল্লী’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। এখানে ৩২ জন সদস্য নিয়ে রয়েছে একটি সমিতি। সমিতির নাম ১০ নম্বর শাহবন্দেগী প্রাথমিক তাঁতী সমিতি। কারখানা মালিক ও শ্রমিক নিয়ে গঠিত এ সমিতির বর্তমান কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন মো. ওয়াহেদ রানা নামে এক কারখানা মালিক ও কারিগর।

জানা যায়, সরকার কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে আগে তাঁতিদের বা কারখানা মালিকদের মেশিন প্রতি ১৮ হাজার টাকা করে ঋণ দিতেন। বর্তমানে তা বাড়িয়ে প্রায় লাখ টাকা করেছেন। কিন্তু ঢাকার ব্যবসায়ীরা সঠিক সময় তাদের পণ্যের মূল্য পরিশোধ না করায় ঋণের টাকা পরিশোধে হিমসিম খেতে হয় তাদের। কেননা অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদের তৈরি পোশাকের সিংহভাগ বিক্রি করতে হয় ঢাকায়।

ঘোলাগাড়ী কলোনি ‘বেনারসি পল্লীতে’ ১৯৯০ সালের পর থেকে এ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে। ধীরে ধীরে নারীরাও এ পেশায় নিজেদের যুক্ত করতে থাকেন। সাংসারিক কাজের ফাঁকে-ফাঁকে এ কাজ করেন তারা। বেনারসি পল্লীতে বেনারসি, বুটিক, জামদানি, টাইটাকি, কাতান, কাতান বুটিক, পাটি নামের বাহারি ডিজাইনের শাড়ি বানানো হয়। এসব বাহারি শাড়িতে ফুটে ওঠে প্রতিটি বাঙালি ললনার প্রকৃত রূপ-মাধুরি। আর সেই শাড়ি যদি মানসম্পন্ন ও পছন্দের হয় তবে তো কথাই নেই।

বেনারসি পল্লী ঘুরে দেখা যায়, পোশাক তৈরিতে মাটি কেটে নির্দিষ্ট স্থানে চার কোণাকৃতির গর্ত তৈরি করা হয় প্রত্যেক কারখানার জন্য। গর্তে আসন গাড়েন কারিগরা। সেখানে বসেই মেশিন চালান তারা। বাহারি ডিজাইনের ক্যাটালগ লাগানো হয় প্রত্যেক তাঁত মেশিনে। সামনে জালের মত বিছানো রঙ বেরঙ-এর সুতা। কারিগরের হাত-পায়ের তালে তালে চলছিল তাঁত। সচল মেশিনে সুতোভর্তি কাঠ নিয়ে একহাত এপাশ-ওপাশে চালনা করছিলেন তাঁতী। সমানতালে চালাচ্ছিলেন পা। মেশিন সচল রাখতে গিয়ে হাত-পা যেন অবশ হয়ে আসে তাদের। কিন্তু যতো ক্লান্তিই হোক মেশিন বন্ধ রাখার কোনো সুযোগ একদম নেই।

বেনারসি-পল্লীতে এখন সারাক্ষণ কেবল একটাই শব্দ ‘খটাশ-খটাশ’। পুরুষের পাশাপাশি নারীদের দেখা গেলো ঘূর্ণায়মান মেশিনে সূতো গোছাতে। পাশাপাশি ড্রাম মেশিনের সাহায্যে সুতা প্রসেসিং করছিলেন কয়েকজন পুরুষ-শ্রমিক। কারিগরের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় এই সুতো একসময় হয়ে ওঠে একেকটি আকর্ষণীয় শাড়ি।

প্রযুক্তিগত সাপোর্ট না থাকায় বেনারসি পল্লীতে কারিগরদের একটি বড় সমস্যা। তাই ঢাকার মিরপুর বেনারসি পল্লীতে গিয়ে ফিনিশিংয়ের কাজ করতে হয়।

কারখানার মালিক ও কারিগর আব্দুল কাদির, আজাদ মঞ্জুর বাংলানিউজকে জানান, ছোট থেকেই তারা এ পেশার সঙ্গে জড়িত। ১৯৯০ সালের পর থেকে এ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে। শেরপুর উপজেলার ঘোলাগাড়ী কলোনিতে তারাসহ হাতে গোনা কয়েকজন প্রথম শাড়ি বুননের কাজ শুরু করেন। প্রথমদিকে একটি শাড়ি তৈরিতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগে যেতো। তখন বিদ্যুৎ ছিল না। গ্রামীণ অবকাঠামো ভালো ছিল না। এখন কলোনির বিদ্যুৎ রয়েছে। রাস্ত-ঘাট আগের তুলনায় বেশ ভালো। বর্তমানে দুই-তিন দিনেই তৈরি করা যাচ্ছে উন্নতমানের একেকটি বেনারসি শাড়ি। প্রথম দিকে প্রতিটি মেশিন স্থাপনে ব্যয় হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। ঢাকার মিরপুর থেকে শাড়ি তৈরির সুতা, জরি, কেলা, তানি, রংসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেন। এভাবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কারখানা তৈরিতে তিনটি ধাপের প্রয়োজন হয় বলেও মন্তব্য করেন তারা।

আজিম উদ্দিন, রশিদ মিয়া জানান, তাদের তৈরি শাড়িগুলো ঢাকার মিরপুর-১০, ১১, ১২ এর ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। মিরপুরের ব্যবসায়ীরা ঘোলাগাড়ী কলোনিতে তৈরি করা বেনারসি শাড়ির প্রধান ক্রেতা। এছাড়া উত্তরবঙ্গের বগুড়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, গাইবান্ধা, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলায় এসব শাড়ি বিক্রি করা হয়ে থাকে। তবে তা সংখ্যায় অনেক কম। সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে ব্যবসায় তেমন একটা সুবিধা করতে পারছেন না বলেও মন্তব্য করেন তারা।

১০ নম্বর শাহবন্দেগী প্রাথমিক তাঁতী সমিতির আহ্বায়ক মো. ওয়াহেদ রানা বংলানিউজকে জানান, তিনি একজন কারখানা মালিক ও কারিগর। বেনারসি পল্লী খ্যাত এ এলাকায় শাড়ি তৈরির কাজ আগের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে। যুগের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে এ শিল্প। এক যুগ আগেও এ উপজেলার ঘোলাগাড়ী কলোনি, বড়পুকুর ও পাঁচআড়ঙ্গ এলাকায় একসময় ব্যাপক পরিসরে বেনারসি তৈরি করতো কারিগররা। শুধুমাত্র ঘোলাগাড়ী কলোনি এলাকায় ৫০টির মতো তাঁত মেশিন স্থাপন হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সে সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ৩০টিতে।

তিনি বলেন, সাংসারিক কাজের ফাঁকে-ফাঁকে নারীরাও এ পেশায় নিজেদের যুক্ত করেন। একটা সময় এ গ্রামের বেশির ভাগ নারী এ পেশার সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছিলেন। এ থেকে বাড়তি আয় হয়। যে আয় তাদের অভারের সংসারের অভাব অনেকটা দূর করে। বেনারসি শাড়ি তৈরি করে শ্রমিকদের বেতন দিয়ে তেমন লাভের মুখ দেখতে পান না কারখানা মালিকরা। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে মালিক ও কারিগররা সরকারের সু-দৃষ্টি প্রয়োজন। সম্পূর্ণ মেশিনে তৈরি ভারতীয় শাড়ী আমদানির জন্য ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে তাদের। তবে হাতে তৈরি এসব পোশাকের কদর অন্যরকম। সরকারি অনুদান পেলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আশাবাদি তারা।

এখন বাজারে বেনারসি পাইকারি বাজারে ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা, জামদানি ৪ হাজার ৫শ’ থেকে ৮ হাজার পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাকিস্থান, তাইওয়ান, চায়না, ভারত ও দেশীয় সুতার ব্যবহার হয়ে থাকে এ শাড়িগুলোতে। এ এলাকার বেনারসি শাড়িগুলো ঢাকার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যায়।

বাংলাদেশ সময়: ১২২২ ঘণ্টা, এপ্রিল ২, ২০২৩
কেইউএ/ এসএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।