ঢাকা, শনিবার, ৩০ চৈত্র ১৪৩০, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৩ শাওয়াল ১৪৪৫

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য

পলি জমে ভরাট হচ্ছে ভৈরব-রূপসা, কবে শুরু হবে খনন?

মাহবুবুর রহমান মুন্না, ব্যুরো এডিটর  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৪২১ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৪
পলি জমে ভরাট হচ্ছে ভৈরব-রূপসা, কবে শুরু হবে খনন? পলি জমে ভরাট হয়ে নাব্য হারাচ্ছে ভৈরব-রূপসা

খুলনা: তলদেশে পলি জমে ভরাট হওয়ায় নাব্য কমে যাচ্ছে খুলনার ভৈরব নদ ও রূপসা নদীর। পলি জমে চর পড়ছে নদ-নদী দুটোয়।

ফলে দিন দিন এদের আকার-আয়তনেও ছোট হয়ে যাচ্ছে।  

যে কারণে নদ-নদী দুটোর স্রোতপ্রবাহে আগের মতো গতি নেই।  

এই সুযোগে নদীর পাড় অব্যাহতভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে। ভৈরব ও রূপসার ২২-২৫ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে প্রায় সাত শতাধিক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।

এ দখলের কারণে সামান্য বৃষ্টি হলেই খুলনা শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।  

এমন পরিস্থিতিতে ভৈরব ও রূপসা নদী ড্রেজারের মাধ্যমে খনন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘ দিন যাবৎ খনন ও দখল উচ্ছেদের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় সচেতন মহল।  

জানা যায়, খুলনা অঞ্চলের অন্যতম প্রধান নদ ভৈরব। দৈর্ঘ্য ২৪৮ কিলোমিটার। চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে নদটি দুটি প্রবাহে ভাগ হয়েছে। একটি ইছামতী নামে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। আরেকটি শাখা ভৈরব নামে জীবননগর, মহেশপুর, কোটচাঁদপুর হয়ে যশোর অভিমুখী হয়েছে।

আর খুলনা শহর লাগোয়া রূপসা নদীর দৈর্ঘ্য ৯ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৪৮৬ মিটার। সাপের মতো বাঁক নিয়ে বহমান নদীটি। নদীটি পদ্মার একটি শাখা নদী। এটি ভৈরব নদ থেকে উৎপত্তি হয়েছে।

জানা গেছে, ১৮৫০ সালের দিকে নড়াইলের লবণ ব্যবসায়ী রূপচাঁদ সাহা, নৌ-যাতায়াত সহজ করতে একটি খাল কেটে ভৈরব নদের সঙ্গে দক্ষিণে কাজীবাছা নদীর সংযোগ করেন। রূপচাঁদ সাহার নাম অনুসারে ওই খালের নাম হয়েছিল রূপসা। পরবর্তীতে ভৈরব নদের পাড় ভেঙে বিস্তৃত হয়ে ছোট রূপসা খাল পরিণত হয় খরস্রোতা নদীতে।  

নদীর পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা

রূপসা শুধু নিজেই নদীতে পরিণত হয়ে ক্ষান্ত হয়নি, কাজীবাছা নদীকেও প্রচণ্ড ভাঙনের মুখে ফেলে। অন্যদিকে ভৈরবের বাগেরহাট অংশ স্রোত হারিয়ে মরে যায় এ রূপসার কারণেই।

কিন্তু কালের আবর্তে সেই রূপসার স্রোতের গতি হারিয়েছে। অনুরূপভাবে ভৈরব নদও স্রোত হারিয়ে দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে।  

নগর বিশ্লেষক ও নাগরিক নেতারা বলছেন, রূপসা ভৈরবের নাব্য সংকটের কারণে বর্ষা মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির স্বীকার হচ্ছে খুলনাবাসী। শহর লাগোয়া ময়ূর নদ ও খালগুলো একদিকে যেমন দখল হয়ে গেছে অন্যদিকে তেমনি ভরাট হয়ে গেছে। যে কারণে সামান্য বৃষ্টিতে পানি না নামতে পেরে শহরে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। সিটি করপোরেশন একের পর এক কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিলেও নগরবাসী হাজার টাকারও উপকার হয় না। প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আগে সঠিক পরিকল্পনা জরুরি। রূপসা, ভৈরব ও ময়ূর নদসহ ২২টি খাল সংস্কার ও খনন না করা হলে কোনোভাবেই এই জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব নয়।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় খুলনা মহানগরী। এ সমস্যা সমাধানে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি। এখন সময়ে দাবি রূপসা, ভৈরব ও ময়ূর নদসহ ২২টি খাল সংস্কার ও খনন করা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনা জেলার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, মহানগরীসহ এ অঞ্চলের পরিবেশ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষিতে সেচ, মৎস্য চাষ, নদী নির্ভর মানুষের স্বাভাবিক জীবন-যাপন পুনরুদ্ধারে ময়ূর ও ভৈরব নদ এবং রূপসা নদীর খনন এখন সময়ে দাবি। জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন চায় খুলনাবাসী।

যদিও খননের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সিটি মেয়র নগরবাসীকে একাধিকবার আশ্বাস দিয়েছেন।  

খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল বলেন, নদীমাতৃক আমাদের এই দেশে নদীর নাব্য বজায় রাখা অতি জরুরি। এজন্য আমরা রূপসা ও ভৈরব নদ ড্রেজারের মাধ্যমে খননের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, আমাদের ড্রেনগুলোর যে স্রোত তাতে শহরের পানি শেষ ভাটায় ছাড়া বের হওয়ার উপায় নেই। এজন্য আমরা খালকাটার জন্য টেন্ডার দিয়েছি। খাল কাটা চলমান রয়েছে। এখন ভৈরব ও রূপসা নদী খনন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আমরা ইতোমধ্যে তা এনেছি। ভৈরব আর রূপসা নদী না খনন করা হলে জলাবদ্ধতার সমস্যার সমাধান হবে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার সাহা বলেন, আতাই-ভৈরব-রূপসা নদীর অববাহিকার সমন্বিত পানি সম্পদ ও পলি ব্যবস্থাপনা নিমিত্ত বিস্তারিত সমীক্ষা নামের একটি প্রস্তাবনা আমাদের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আছে। এটা একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করবে। তার আলোকে আমরা একটি প্রকল্প তৈরি করব।  

তিনি আরও বলেন, বিষয়টি স্বাভাবিক নিয়মে হবে না। কেননা এখানে এ নদীগুলোতে জোয়ার ভাটা হয়। অন্যান্য নদীর মতো এখানে ড্রেজিং করলে থাকছে না। এটা কীভাবে টেকসই করা যায় তার জন্য বিস্তারিত ফিজিব্রিটি স্ট্যাডি দরকার। দেশ-বিদেশের কারিগরি লোকজন নিয়ে সেটা করা হবে। মডেলিং হবে। বিস্তারিত স্ট্যাডির পরে আমরা প্রকল্প তৈরি করব।  

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমা প্রতিবেদনটি প্রস্তাব পর্যায়ে আছে বলে জানান এ পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ সময়: ১৪০৮ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৪
এমআরএম/এসএএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।