ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২১ মে ২০২৪, ১২ জিলকদ ১৪৪৫

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য

সংরক্ষিত বন উজার করে জমি দখল, কাটা হচ্ছে পুকুর

শফিকুল ইসলাম খোকন, উপজেলা করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৪০৯ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৪, ২০২৪
সংরক্ষিত বন উজার করে জমি দখল, কাটা হচ্ছে পুকুর

পাথরঘাটা (বরগুনা): বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরলাঠিমারা ও বাদুরতলা সংরক্ষিত বনের কয়েক হাজার শ্বাসমূল গাছ কেটে বনভূমি দখল করা হয়েছে। এতে বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব ও পরিবেশের ভারসাম্য হুমকির মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

নির্বিচারে বন উজার করে জমি দখল করা হয়েছে, পাশাপাশি সেখানে পুকুর খননের কাজও চলছে। আর এমন অভিযোগ স্থানীয়দের বিরুদ্ধে।

বনবিভাগ বলছে, স্থানীয় বনরক্ষীরা হামলার ভয়ে দখলে বাধা দেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। তবে স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, বনবিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই এ বনাঞ্চল উজার করে জমি দখল করা হচ্ছে।

জানা যায়, বলেশ্বর নদের তীরবর্তী চরলাঠিমারা ও বাদুরতলা মৌজার ৩ হাজার ১৯ একর আয়তনের এ বন দুটিকে ১৯৮৬ সালে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ বিভিন্ন শ্বাসমূল ও অন্যান্য প্রজাতির বৃক্ষের পাশাপাশি কাঁকড়া, কচ্ছপ, হরিণ, মেছোবাঘ, বানর, শুকরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী ও প্রায় ৩০ প্রজাতির পাখির অভয়ারণ্য এ বনাঞ্চল।  

সেখানে গিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সংরক্ষিত বনে অনুপ্রবেশ করে স্থানীয় দেলোয়ার হোসেন, তার ছেলে এবং খাইরুলসহ স্থানীয় অনেকে বনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে জমি দখলে নিয়েছেন। কয়েক একর জমিতে জাল দিয়ে বেড়া দিয়ে পুকুর কাটা হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে বন উজার এবং জমি দখলের মহোৎসব চলছে। এরই মধ্যে দখলদাররা মাটি কেটে বাঁধ দিয়েছেন।  

স্থানীয় নুরুল ইসলাম প্যাদা, আলম ফিটার ও বাবুল হাওলাদার বলেন, স্থানীয় দেলোয়ারসহ কয়েকজন বনের গাছ কেটে জমি দখলে নিয়েছেন। আমরা তাদের ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারছি না। তারা বিভিন্ন মামলা, হামলার ভয়ভীতি দেখান।  

তারা আরও বলেন, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই এ বন ধ্বংস করা হচ্ছে।  

এদিকে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্তরা পালিয়ে যান। বাড়ি গিয়েও অভিযুক্তদের পাওয়া যায়নি।

এর আগে ১৯৮৯-৯০ সালে একই বনাঞ্চলের ৪০ একর জমি চর দেখিয়ে বন্দোবস্ত নেয় স্থানীয় ৫৩ কথিত ভূমিহীন পরিবার। এসব পরিবার ২০১৩ সালে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় সংরক্ষিত বনের প্রায় অর্ধ লাখ গাছ কেটে প্রায় ১৯ একর জমি দখলে নিয়ে ঘর তোলেন। সে সময় বনবিভাগ দখলে বাধা দিলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় ওই সময় ৫৩ জন দখলদারকে বিবাদী করে বরগুনার সহকারী জেলা জজ আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা করা হয়। পরে আদালত স্থিতাবস্থা জারি করেন। তখন দখলদারদের দাবি ছিল, ১৯৮৯-৯০ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক হরেন্দ্রনাথ হাওলাদার পদ্মা গ্রামের ৫৩ জন ভূমিহীনের মধ্যে ৪০ একর জমির ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ দেন। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় ১৯ একর জমি দখলে নিয়ে তারা বসবাস করছেন। এখন বাকি ২১ একর জমির গাছপালা কেটে দখলে নিয়েছেন।

চরলাঠিমারা বিট কর্মকর্তা আবদুল হাই বলেন, বিট কার্যালয়ের পাশেই প্রত্যন্ত এলাকায় বন। আমাদের কোনো গাফিলতি ছিল না। এতো বড় বনে সল্প সংখ্যক লোকবল নিয়ে দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব।  

বনবিভাগকে ম্যানেজ করে দখল চলছে-এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের (স্থানীয়দের) স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেই আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেয়। এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

এ বিষয় পাথরঘাটা সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন বলেন, আমার বাবা অসুস্থ থাকায় তার চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। আমি এমন অভিযোগের কথা শুনেছি। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলানিউজের এ সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, সংরক্ষিত বন উপকূলের রাকবজ। এ বন যদি এভাবে ধ্বংস করা হয়, তাহলে পরিবেশসহ জীববৈচিত্র্যই হুমকির মুখে পড়বে। সেই সঙ্গে পাথরঘাটার উপকূলও হুমকির মুখে পড়বে।  

পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ্জামান খান বলেন, বন উজার ও জমি দখলের ব্যাপারে তিনজনের নামে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এটা বন আইনের অপরাধ, তাই বনবিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৪০৪ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৪, ২০২৪
এসআই

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।