ঢাকা, বুধবার, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ০৫ আগস্ট ২০২০, ১৪ জিলহজ ১৪৪১

অর্থনীতি-ব্যবসা

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের শতবর্ষী পাইকারি বাজারের হতশ্রী দশা!

তপন চক্রবর্তী/রমেন দাশগুপ্ত | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-০৭-০২ ১০:১৬:৫২ পিএম
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের শতবর্ষী পাইকারি বাজারের হতশ্রী দশা!

চট্টগ্রাম: দেশের ভোগ্যপণ্যের ঐতিহ্যবাহী পাইকারী বাজার বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ এখন আর আগের অবস্থানে নেই। বিশ্বাসনির্ভর ব্যবসায় অব্যাহত প্রতারণা, ব্যবসায়ীদের অবহেলা আর আচরণে শত বছর পার করা এই বাজার এখন হতশ্রী রূপ নিয়েছে।



চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের বনেদি ব্যবসায়ীদের উত্তরসূরিরা তাদের পূর্বপুরুষের এ ব্যবসাকেন্দ্রের হতশ্রী অবস্থা দেখে মনে কষ্ট পান। দিনের পর দিন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক পরিবেশের অধঃপতন দেখে তাদের অন্তরে জন্ম নেয় দ্রোহ ।

এ দ্রোহ থেকেই ২০০৪ সালে সৃষ্টি হয় চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসেসিয়েশন। শুরু থেকেই এর সভাপতি হিসেবে মাহবুবুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছৈয়দ ছগীর আহমদ দায়িত্ব পালন করছেন।

শতবছর পার করা এ ব্যবসাকেন্দ্রের সার্বিক পরিস্থিতি, এর থেকে উত্তরণ সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাংলানিউজের মুখোমুখি হয়েছিলেন সংগঠনের এ দু’প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক।

দু’ব্যবসায়ী নেতার মতে, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে ব্যবসায়িক লেনদেন বাড়লেও আগে ব্যবসায় যে স্বস্তি এবং নৈতিকতা ছিল তা এখন আর নেই। খাতুনগঞ্জ এখন অবক্ষয়ের প্রতিরূপ।

আর ভোক্তাসাধারণ ও চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনদের মতে, আগে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের দর্শন ছিল মালামাল বেশি বিক্রি করা কিন্তু লাভ কম করা। আর এখন নীতি বিবর্জিতভাবে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে এবং কৃত্রিমভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়।

তবে সিন্ডিকেট করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর বিষয়টি নাকচ করে সংগঠনের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘দেশে এখন ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বেড়েছে। আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগেও দেশে বছরে চিনির চাহিদা ছিল মাত্র দু’ থেকে তিন লক্ষ টন। এখন লাগে বছরে প্রায় ১০-১২ লক্ষ টন। চাহিদা বেড়েছে, যোগান কম। এ হিসেবে বিদেশের বাজারে দাম বাড়ছে, প্রভাব পড়ছে দেশেও। ’

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা এখনও ‘ম্যাক্সিমাম বিজনেস-মিনিমাম প্রফিট’ ভিত্তিতে ব্যবসা করেন বলে সভাপতি দাবি করেন।    

বিশ্বাসের উপরে ভিত্তি করে খাতুনগঞ্জে কোটি কোটি টাকা লেনদেন চলে। কিন্তু বিভিন্ন ঘটনায় আশির দশকে বিশ্বাসের এ ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়।

সভাপতি মাহবুবুল আলম জানান, ১৯৮৭ সালে খাতুনগঞ্জের বনেদি ব্যবসায়ী বিভূতিভূষণ সাত কোটি টাকা নিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে ভারতে চলে যান। এরপর কয়েক কোটি টাকার প্রতারণা করে পালিয়ে যান মারোয়ারি ব্যবসায়ী সুশীল রাজগরিয়া। এরপর থেকে চেক জালিয়াতি, বাকি শোধ না করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেয়া সহ বিভিন্নভাবে প্রতি বছর অন্ত:ত দু’তিনটি প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদ জানান, আশির দশকের শেষদিকে ঢাকার কমলাপুরে কনটেইনার ইয়ার্ড তৈরি এবং সরকারী ও বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর সদরদপ্তর ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ব্যবসাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে ফেলা হয়, বন্দর থেকে ভোগ্যপণ্যবাহী কনটেইনার সরাসরি চলে যাচ্ছে ঢাকায়।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের আরেক সমস্যা যানজট। অপ্রশস্ত সড়কের উপর যানবাহন রেখে দৈনিক কমপক্ষে তিন’শ থেকে সাড়ে তিন’শ ট্রাকে মালামাল ওঠানামা চলে চাক্তাই- খাতুনগঞ্জে। এর সঙ্গে আছে ঠেলা ও ভ্যানগাড়ি। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর মোহনা ভরাট হয়ে যাওয়ায় চাক্তাই খাল দিয়ে এখন বড় নৌকাও ঢুকতে পারে না। ফলে নৌকায় পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে সব পণ্য ঢুকে ট্রাক ও কনটেইনার মুভারের মাধ্যমে।

মাহাবুবুল আলম বলেন, ‘বন্দর থেকে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে পণ্য আনতে যে সময় এবং খরচ হয় ফেনী নিতে তার চেয়ে আরও কম অর্থ এবং সময় লাগে। তাই ফেনী থেকেও ব্যবসায়ীরা এখানে আসতে চান না। ’

উল্লেখ্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্য কর্ণফুলী নদী থেকে প্রবাহিত চাক্তাই, রাজাখালী ও বদরশাহ এ তিনটি খালের উপকণ্ঠে বৃটিশ আমলে গড়ে উঠেছে পাইকারী বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ।

এ বাজারের গোড়াপত্তন নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও চট্টগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নদী ও খালের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের বাড়তি সুবিধা নিয়ে ১৩’শতকে সুলতানী আমলে তৎকালীন চাটগাঁ’র শুলকবহর ও চকবাজার এলাকায় পাইকারী ব্যবসা শুরু করেছিলেন কয়েকজন বনেদি ব্যবসায়ী।

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কাছাকাছি হওয়ায় দ্রুত এ ব্যবসা বিস্তার লাভ করে। ক্রমে সেটা আরও ছড়িয়ে পড়তে পড়তে খাতুনগঞ্জে এসে থিতু হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, খাতনুগঞ্জে বিভিন্ন পণ্যের প্রায় ১২’শ দোকান আছে।

বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী- এমন প্রবাদ যেন খাতুনগঞ্জের বেলায় সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। এখানে বিভিন্ন পণ্যের সওদা করে এখন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি, তারকা ব্যবসায়ী হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়।

এদের মধ্যে আছেন প্রবীণ শিল্পপতি পিএইচপি গ্র“পের চেয়ারম্যান সুফি মিজানুর রহমান, এস আলম গ্র“পের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ, এনজিএস গ্র“পের চেয়ারম্যান ননী গোপাল সাহা,কেডিএস গ্র“পের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, বিএসএম গ্র“পের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী, টিকে গ্র“পের আবুল কালাম ও আবু তৈয়ব, মোস্তফা গ্র“পের প্রয়াত মোস্তাফিজুর রহমান, এমইবি গ্র“পের প্রয়াত মোহাম্মদ ইলিয়াছ, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিএ)’র হেফাজতুর রহমান প্রমুখ।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জানালেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে তারা এখন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চান। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের সমস্যা সমাধানে তারা এরই মধ্যে সরকারকে ১৪ দফা দাবি দিয়েছেন।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের সমস্যা সমাধানে সংগঠনটি একদিকে সরকারের যেমন সহযোগিতা চান তেমনি খাতুনগঞ্জ থেকে প্রতিষ্ঠিত পাওয়া তারকা ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদেরও সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।

বাংলাদেশ সময়: ২০০৯ঘণ্টা, জুলাই ২, ২০১১ 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa