ঢাকা, বুধবার, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২

শিল্প-সাহিত্য

পাণ্ডুলিপি থেকে তারিক টুকুর ১০ কবিতা

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮১৭ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১২
পাণ্ডুলিপি থেকে তারিক টুকুর ১০ কবিতা

প্রথম দশকের কবি তারিক টুকু। মেলায় এসেছে তার প্রথম কবিতার বই ‘বিস্মৃতি ও বিষাদটিলা’।

বইটি প্রকাশ করেছে ‘সংবেদ’ প্রকাশনী। বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য ওই বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে তুলে ধরা হলো ১০ টি কবিতা।


চরাচর

চারদিকে ঘুম নেমে আসে, দেহকাণ্ড সবুজাভ হয়।
আমি ক্ষুধার্ত সিংহের কেশরকে দমবন্ধ নক্ষত্রঝড় বলে ভুল করি।
গান ছেড়ে যারা উঠে গেছে, তাদের প্রত্যেকের ডানা খসে গেছে।
সাইরেনে সড়কের পাশে দাঁড়ানো গাছগুলো রং বদলায়।

আমি রক্ত ভেবে ভয় পাই, এক অতিজীবিত দৃশ্যের ভয়ে
তাকে ফেলে দৌড়ে চলে আসি।


ব্যাধ

কত কিছুই না হারিয়ে ফেলি। এই ধরো সবুজ বল্লম, বাইনোকুলার আর ধবলাগ্নি টর্চ। রাতে তাই বেরোতে পারি না। যদি কেউ চেপে ধরে, মরীচিকা ডাকে!

কেউ বলে ওই তো তোমার বল্লম, রাত্রিভর হরিণের পেছনে উড়েছে।
শুনি’ ওই টর্চই তো প্রভাস্বর, কুয়াশায় জেগে উঠে পৃথিবী দেখায়।

কিন্তু এসব জেনে আমি কী করব। এরা কি কখনো পশুশিকারের কাজে লাগতে পারে। এরা কি বসন্তে হারিয়ে যেতে শিখেছে, হিম থেকে জন্ম নিতে কিংবা রাত্রি হলে স্মৃতি-বিস্মৃতির চক্রে পশুরক্ত কীভাবে জবাফুল হয়ে জমে ওঠেÍপেরেছে কি সেই কথা বুঝে উঠতে!   

দাঁড়

মেঘ, আমি ব্যাধের ধনুকে টানা অভিনিবেশের মতো সমুদ্রের নিরন্তর প্রার্থনায় ভাসি। তোমরা বস্তুত শিলা, জলে ছোঁড়া হিংসা, জাঁতাকল। ঘুমঘোরে অনন্ত আঁধি,  কাচবৃষ্টি। আমার শরীরে লেগে লবণ রক্তের স্বাদ হাঙরকে পৌঁছাও।

ভাসো তুমি, প্রভুর দোমড়ানো রুটি ভেসে চলে যায়, অলিন্দ বিক্ষেপসহ ভাসে, ভাসে স্তনগুটি, উগ্রচাঁদ। তোমার মৌনতায়।


পদ্মরাগমণি

ময়ূরের ছদ্মবেশে থাকে ঘুম, নেশা, পদ্মরাগমণি।
স্বপ্ন থেকে দূর কোনো অপার্থিব সৌরটানে পৌঁছে দেখি
দুই পৃথিবীর মাঝে দাঁড়িয়েছে খণ্ড খণ্ড সপ্রাণ মেঘেরা।

যারা নৈঃশব্দ্য বোঝেনি তারা তাকে আনমনে ডাকে।
ময়ূর চমকে ওঠে, যেন-বা ঝুলন্ত সাপ অতর্কিতে
মুখ থেকে ঢালবে আগুন, গলে যাবে মেঘের প্রাচীরÍ
দেখা হবে মুকুরের সাথে, নিজের হৃদয়ে শুয়ে থাকা
অতিপরিচিত সেই সাপটির সাথে।



বৃষ্টি

আমরা ছিলাম ভাষাপরিত্যক্ত তাই
মেঘের সাথেও কথা বলতে চেয়েছিলাম।
না ভাষায়, না অক্ষরে শুধু নৃত্যে, উঁচু দাঁতে
আমাদের হাসিÍ

নাজুক তীরের মতো চান্দ্র-আকর্ষণে পৌঁছাতে চেয়েছে
তার কালো বৃষটিকে লক্ষ করে।

আর বৃষ্টি  
হচ্ছিল না।

চোখ

অগ্নির কামিন ক্ষুধা
অলিন্দে, নৃত্যের তালে আধোজাগা অলীক সাম্পান।
ঊর্ধ্বগামী শিখার আদলে, নরকের পানে মুখ তুলে
আঁধির জাগ্রত শব্দে, লেলিহ জিহ্বায়, নক্ষত্র আরক করে পান।

সেই জিহ্বা ভাসে ঘুমে, আধো জাগরণে।
নিচে ফলের বাগান, অনাঘ্রাতা ফল তুমি বয়ে চলো।
আমার আঙুল দিয়ে স্পর্শ করি তাহারও আগুন। দু-তিনটি চিতা
দূরে একসাথে জ্বলে ওঠে। রাতজাগা চোখ যেন, শাসনে সক্ষম।

সে পাবক চোখ থেকে বুঝি আমি রক্ষা পেতে চাই। জানালায় উলঙ্গ দাঁড়াই।


স্কেচবুক

গোধূলিতে মেঘরক্তে লক্ষ করি উল্লম্ফন, হাড়মজ্জা ঠান্ডা হয়ে আসে।
বৃক্ষকাণ্ডকে লেহন করে আলো
অসহজ বায়ু বয়, দূরের আকাশে সচকিত নক্ষত্রপাঁজরে
নামল আততায়ী, গুলি হলো।

ঝুমঝুমি একা পড়ে থাকল, উন্মাদ রাস্তায় নেমে তির্যক বৃষ্টিতে ভিজে
চলতি কোনো গান গাইল, দূরে হারমোনিকার সুরে ভেসে এল আমার কৈশোর।


সান্ধ্যসংগীত

ততটা সময় থাকি, যতক্ষণ এ প্রকারে শীত থেকে যায়। দূরে এক সান্ধ্য সংগীত বাতাসে ভাসমান, ঘোরগ্রস্ত বোগেনভেলিয়ায় গিয়ে শেষ হয়। বোগেনভেলিয়ায় গিয়ে আজ তাই শেষ হলো ছায়ার প্রহার।

নিরুদ্ধ শিখার সাথে বিনিময় হয় তাই ডালিম-দানার রক্তপ্রাণ। বিনিময় হয় কালো গোলাপের দেশ। যে আকাশ উভকামী পাখি থেকে রচনা করেছে আজ ত্রস্ত তটরেখা। যা সুদূর, স্বপ্নপরাভূত।

এখানে শীতেরা তাই চলতি সময়গ্রন্থি, সসম্মানে, উপেক্ষা করেছে।


ফল
            
মিছে কেন নিরুত্তর থাকো? বলি শান্ত ফলটিকে, রোজ রোজ তোমার কুসুমঘ্রাণে আমাকে পোহাতে হয় কত যে মাংসের ভাপ, দূর থেকে চোরের মুখোশে আমাকেও যেতে হয় ওই ফলের বাগানে। যদিও তোমার বিহনে সেখানে আনাগোনা করে বাস্তুসাপ, যে মূলত এত দিন এই রতি, মর্ষকাম পাহারায় রেখেছিল। পাহারায় ছিল আরও নগ্ন পুতুলের জনপদ। সেই দেশ থেকে সব কাম উৎসারিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সড়কে, ঝরনায়। তাই তো ভুলে যেতে চাওয়া পথে উঠে আসে বিছানায় বিস্রস্ত রোহিণীর ছায়া। ছায়া, নাকি কোমল অঙ্গার? বাতাসের এই প্রশ্নে আজ খুলে যায় নষ্টপ্রায় পৃথিবীর যত তালা।

আর মৃত্যু পর্যন্ত আমরা খুলে যেতে চাই সমস্ত আভরণ। ভুল হয় নাকি? নাকি ঠিকই হয়, শুধু আরেকটু বিস্তৃত করে খুলে নেয়া যেত ওই গূঢ় শান্ত ফল। পশু ও পুরুষ থেকে, নারীর ভেতর থেকে ওই ফল খুলে খুলে জেনে নেয়া যেত, ঘ্রাণই মূলত ভ্রান্তিময়, যার প্ররোচনায় মাঝে মাঝে নষ্ট তালা খুলে যায় যেকোনো চাবিতে।



নক্ষত্রবাগান

নক্ষত্রবাগান নয় ততখানি মৃত, তাতে ঘ্রাণ ফোটে, সুপ্ত নক্ষত্রদল ধীরে যেন বাষ্প ছড়ায়, তারপর আরও গোল হতে হতে একদিন থেমে যায়। বলেছিল ভাসমান তারকানিচয়। মেঘে অনন্তর শিহরণে যারা ছিল পলায়নপর কোনো স্কুলবান্ধবীর মতন দুরূহ, পাঠে অসম্ভব। দূর থেকে তাদের মনে হতো সরল অঙ্কের খাতা । পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় যে শরীরে লেগে আছে নানাবিধ গণিত-প্রহার।

মূলত তারাই যেন ব্যর্থতা আমার অবশেষে। শুধু চিন্তিত নক্ষত্রবাগানে আজ দুটি-একটি আধফোটা তারা। যদিও জেনেছি আমি, সকল চিন্তার রেখা বিকাশেই বিরুদ্ধতা পায়।  

বাংলাদেশ সময় ১৬২৩, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১২

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa