bangla news
শেষ বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে

তিন জীবনের বন্ধু আমার, হে প্রেসক্লাব

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১২-০২-২৩ ৩:৫৪:০৪ এএম

২০ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হয়েছেন মধ্যরাতের অশ্বারোহী খ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক ও  সাহিত্যিক ফয়েজ আহমদ। আমরা শোকাহত। মৃত্যুর আগের দিন সূচীপত্র থেকে প্রকাশিত হয় তার শেষ বই ‘আমার সাম্প্রতিক লেখা’। বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য ফয়েজ আহমদের ‘আমার সাম্প্রতিক লেখা’ বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে স্মৃতিচারণমূলক গদ্য ‘তিন জীবনের বন্ধু আমার, হে প্রেসক্লাব’ তুলে ধরা হলো।

[২০ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হয়েছেন মধ্যরাতের অশ্বারোহী খ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক ও  সাহিত্যিক ফয়েজ আহমদ। আমরা শোকাহত। মৃত্যুর আগের দিন সূচীপত্র থেকে প্রকাশিত হয় তার শেষ বই ‘আমার সাম্প্রতিক লেখা’। এ বইটিতে তার ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি ও সংবাদপত্র বিষয়ক মোট ১৬টি প্রবন্ধ রয়েছে।

বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য ফয়েজ আহমদের ‘আমার সাম্প্রতিক লেখা’ বইয়ের পাণ্ডুলিপি থেকে স্মৃতিচারণমূলক গদ্য ‘তিন জীবনের বন্ধু আমার, হে প্রেসক্লাব’ তুলে ধরা হলো।]


http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2012February/foez 120120223145131.jpgরাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাব আমার কাছে যেন প্রেসক্লাবের অতিরিক্ত কোনো কিছু। এ আমার কাছে দ্বিতীয় গ্রহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রেসক্লাব আমার মা-বাবার মতো স্নেহশীল। সে বন্ধুর মতো আলিঙ্গন করে। সে অন্নদাতার মতো খাদ্য জোগায়। সে আলাপ-আলোচনায় এক শীর্ষভূমি। সোফায় কাৎ হয়ে শুয়ে পড়ার মতো অলস আবেশের এক মোহময় স্থান। প্রেসক্লাব এভাবেই আমার আর-এক গৃহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রেসক্লাবে আমি বন্ধু পেয়েছি এমন, যে হীরকখণ্ডের মতো।

প্রেসক্লাব আমাকে সারাটা দিন বক্ষে ধারণ করেছে। আমি একটা গৌরবের বা এক্সক্লুসিভ কোনো সংবাদ তৈরি করলে আমাকে যেন আলিঙ্গন করেছে। এই প্রেসক্লাব আমার সুখ-দুঃখ-বেদনার এক অনন্ত ভূমি-- আবার এই প্রেসক্লাবই আমার আশ্রয়স্থল ছিল। এই প্রেসক্লাবে যে তাস খেলেছি আমি এবং আনন্দ লুণ্ঠন করেছি তার সঙ্গে জগতের অন্য কোনো মুহূর্তের তুলনা করা সম্ভব নয়। প্রেসক্লাবকে আমরা আলিঙ্গন করি, আড্ডায় আমরা উল্লসিত হয়ে উঠি; নতুন কোনো খবরে আমরা বিকশিত হই; রাজনৈতিক উত্থান-পতনে আমরা পরিবর্তনের চিত্র দেখি।

এই প্রেসক্লাবই আমার সাংবাদিক জীবনের ধাত্রী। এই প্রেসক্লাব থেকে আমার যেন মুক্তি নেই। এখনও ৮০ বছরের বার্ধক্যে স্বপ্নে দেখি পুরনো প্রেসক্লাবের কথাগুলোকে। এর প্রতিটি কক্ষ, এর বারান্দা, এর ফুলের বাগান, ডাইনিং হলের খাদ্য সকলেই আমাকে এখনও তীব্রভাবে আকৃষ্ট করে। যদিও প্রেসক্লাবের মূল বিল্ডিং এখন আর নেই এবং একই ভূ-এলাকায় অত্যাধুনিক ভবনে বিস্তীর্ণ স্থানে প্রেসক্লাব স্থাপিত হয়েছে, তবু আমি সেই পুরাতন লাল ইটের প্রেসক্লাবটাকে সর্বদাই চোখের সামনে ভেসে উঠতে দেখি। কারণ প্রেসক্লাবের সেই বিল্ডিংয়ের প্রথম দিন থেকে আমার কতিপয় বন্ধু প্রেসক্লাবের সাংবাদিক সদস্য। বহুজন আমার বন্ধু এম আর আখতার মুকুল, এস এম চৌধুরী, সৈয়দ জাফর আলী, আরও বহুজন, আর কোনোদিন প্রেসক্লাবে আসবে না। এমন অনেকজনের নাম বলা চলে। কিছুদিন পর হয়ত আরও কিছু লোক ক্লাব ছেড়ে যাবেন। তবু আমরা কয়েকজন প্রাচীন যুবক বর্তমানে বার্ধক্যে নতুন ক্লাবভবনে মাঝে মাঝে বিচরণ করি।

যারা নতুন এসেছে, সাংবাদিকতাকে যারা কুসুমায়িত করতে চায় তাদের অতীতের সফলতার কথা ভুলে গেলে চলবে না। মানিক মিয়া, খাইরুল কবির, সৈয়দ নুরুদ্দীন, আব্দুস সালাম, এস এম আলী, স্টেটম্যানের আব্দুল ওহাব, আরও বহুজন আর ফিরে আসবেন না এই ক্লাবে। প্রেসক্লাবে সর্বদাই তারুণ্য ও বার্ধক্যের সমাবেশ ঘটে। পরিবর্তিত পৃথিবীতে নতুন করে সাংবাদিকতার ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে, অফিসের আকৃতি বৃদ্ধি পেয়েছে। সাংবাদিকদের সংখ্যা স্ফীত হয়েছে। সংবাদ বা খবরের ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পেয়েছে-- ঘটনার সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে। সংবাদক্ষেত্র ও সন্ধানের স্থান পরিব্যাপ্ত হয়েছে। সংবাদের পরিপ্রেক্ষিত, সংবাদ-উৎস বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবাদ প্রেরণের কমিউনিকেশন জগতের অসাধারণ বিকাশ ঘটেছে, যার ফলে সংবাদ আজ ৫০ বছর আগের তুলনায় ৫০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবাদ ব্যাখ্যায় আমাদের নতুন দৃষ্টিপাত, সংবাদের ব্যাপ্তিতে অনেক শাখা-প্রশাখা এখন প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি মুহূর্তের চাঞ্চল্য, প্রতিটি কথা এমনকি অক্ষর সংবাদ। আমরা সংবাদকে কোনোভাবেই আর তুচ্ছজ্ঞান করতে সক্ষম নই। সংবাদের পরিব্যাপ্তি সীমাহীন ও অনন্ত।

এই সংবাদের মাধ্যমেই আমার বয়স বেড়েছে। আমি পরিপুষ্ট হয়েছি। আমি বার্ধক্যে চলে এসেছি। প্রেসক্লাবকে কেন্দ্র করে আমার এ দীর্ঘ বয়সের সময়ে আমি প্রত্যহ যেন নতুন জীবনে অবগাহন করেছি। এই প্রেসক্লাবকে জীবনের নানা ঘটনাপ্রবাহের কারণে আমার আর তাচ্ছিল্য করার কোনো উপায় নেই। বছর বছর আমি তাকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দেখেছি। তাকে, তার ঠিাকানাকে আমি আমার মাতৃভূমি করেছি। বাস্তব জীবনে প্রেসক্লাব নানা প্রকাশের মাধ্যমে আমার জীবনকে আলিঙ্গন করে রেখেছে। এই প্রেসক্লাবের জন্মের দিন থেকে আমরা বেশ কিছুসংখ্যক সমবয়সি সাংবাদিক জড়িত ছিলাম। প্রেসক্লাব যে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং আমরা থাকব না একথা কোনোদিন ভাবিনি। অনেক বন্ধুর মতো আমিও একদিন এই প্রিয় প্রেসক্লাবকে ছেড়ে যাব। এই দেশ আমার মাতৃভূমি-- এই প্রেসক্লাব আমার মাতৃগৃহ। এই প্রেসক্লাবের ভস্ম থেকেই আমার পুনর্জন্ম হতে থাকুক এ-কামনা আমি করতে পারি। আমার জীবনের তিন-তিনবার প্রেসক্লাব থেকেই আমি চরম অন্ধকারে পতিত হয়েছিলাম।

আমার যেন ফিনিক্স পাখির মতো জন্ম হয়েছিল এই প্রেসক্লাবে। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে আইয়ুব খান সমগ্র পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। তখন থেকে এই দেশটা নতুন ধারায়, নতুন শাসনব্যবস্থায়, নতুন একশ্রেণীর লোকের মুষ্টিবদ্ধ হস্তের সম্মুখে বর্ধিত হতে থাকে। মানুষের সব স্বাভাবিক অধিকার সামরিক বাহিনী লুণ্ঠন করে। আইয়ুব খান ছিলেন সেই ক্ষমতা লুণ্ঠনকারীদের শ্রেষ্ঠ নেতা। আমরা যারা কমিউনিস্ট পার্টির প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলাম তারা সবাই আন্ডারগ্রাউন্ডে একসঙ্গে আশ্রয় নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতে শুরু করলাম। কমিউনিস্ট পার্টি আগে থেকেই ভূতলবাসী ছিল। এবার সকল প্রগতিপন্থি, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিকেতনের আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে গেল। পূর্ব পাকিস্তানি প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী এমনকি ব্যবসায়ী পর্যন্ত আতঙ্কে দেশে ও বিদেশে (ভারত) আশ্রয় নিতে শুরু করল। প্রথমদিকে আমরা পরিস্থিতি সঠিক অনুমান করতে পারিনি। আমি ক’দিন আগে অবজারভারে জয়েন করার জন্য ওই পত্রিকায় আসা-যাওয়া করছিলাম। এটা সংবাদ পত্রিকা ছেড়ে দেয়ার পরের ঘটনা। সংবাদের চিফ রিপোর্টারশিপ ছেড়ে দেয়ার চিঠি আমি কর্তৃপক্ষকে তখন দিয়েছিলাম। থাকতাম নবাবপুরের এসডি খান হোটেলে। সামরিক শাসন প্রবর্তনের বিশেষ রাতে প্রায় একটার দিকে আমি আর অবজারভার পত্রিকার চিফ রিপোর্টার মাহবুব জামাল জাহেদী অবজারভার থেকে বেরিয়ে বাসার দিকে যাত্রা করি। তখনই সর্বশেষ খবর থেকে আমরা জানতাম হয়ত আজ রাতেই মার্শাল ল’ জারি করা হবে।

খুব ভোরে আমি প্রথমে পাই অবজারভার পত্রিকা। ঘুমে থাকতেই পিয়ন আমার কক্ষের জানালা দিয়ে পত্রিকাটি দিতেন। সেদিন পত্রিকা খুলেই দেখি লেখা হয়েছে ‘সামরিক শাসন প্রবর্তন করা হয়েছে’। আমি তখন রাস্তায়, কেবল ২-১টা রিকশা, কাকডাকা ভোর, সে-সময় বেরিয়ে গেলাম নিরুদ্দেশের সন্ধানে। সেই ছিল আমার প্রথম ভূতলবাসী হয়ে বসবাসের অভিজ্ঞতা। সেদিন থেকেই আমার ভূতলে জীবনধারণের অভিজ্ঞতা শুরু হলো। প্রথম সপ্তাহ চলে যাওয়ার পরও দেখলাম প্রদেশে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। কেন প্রদেশে গ্রেফতার শুরু হয়নি তার কারণ আমরা তখনও জানতে পারিনি। পরে জানা গেল নিরাপত্তার কারণে গ্রেফতারের কোনো আইন প্রাদেশিক সরকারের হাতে তখন ছিল না। নতুন আইন তৈরি করতে হবে হয়ত। শেষে প্রাদেশিক সরকার কেন্দ্রের নির্দেশে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট’ নামে সরকারের হাতের একটি আইন অক্টোবর মাসের ১৮ তারিখ থেকে প্রয়োগ করতে শুরু করল, নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে। দেশের সর্বত্র সন্দেহভাজন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের পুলিশি নজরের মধ্যে একদিন রাখা হয়েছিল। এই আইন কেবলমাত্র বিদেশি অপরাধীদের ব্যাপারে সরকার প্রয়োগ করতে পারে। এমন একটা সাধারণ আইন অনেক দেশেই থাকে। এসব বিদেশির বিচার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায়, যাঁরা ভুলক্রমে বর্ডার অতিক্রম করেন অথবা যাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে বর্ডার পার হয়ে অন্য দেশে যান অথবা যারা ভুলক্রমে ভিসার তারিখ বর্ধিত করেননি তাঁদের ব্যাপারে এ-আইন প্রয়োগ করা হয়। অর্থাৎ কেবল বিদেশিদের ব্যাপারে প্রয়োগযোগ্য। কিন্তু মার্শাল ল’-এর আইনের অর্ডারে এ-আইনের সামান্য সংশোধন করে প্রয়োগ শুরু হলো।

প্রদেশে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে যে-মন্ত্রিসভা ছিল তারাই এই ফরেনার্স অ্যাক্ট পরিষদে পাশ করিয়েছিল। এজাতীয় আইন প্রায় প্রতিটি দেশেই থাকে; কিন্তু আইয়ুব খান এবার সে-আইন নিজের দেশে প্রয়োগ করে ফেললেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২১ দফার ভিত্তিতে আতাউর রহমান সরকার নিরাপত্তা আইন বাতিল করেছিল। তারা এই আইনের বিপরীতে অন্য কোনো জনবিরোধী আইন তখন তৈরি করেনি। এটাই ছিল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের প্রথম বাধা।

এই ফরেনার্স অ্যাক্ট আইনে প্রদেশের সর্বত্র ব্যাপক ধরপাকড়ের খবর ছড়িয়ে পড়ল। আমরা আন্ডারগ্রাউন্ডে আশ্রয় নিলাম। আমি তখন গ্রামে চলে গেলাম এবং আমার গ্রামের দুটি ঠিকানা হাসান হাফিজুর রহমানের কাছে রইল। হাসান নিজেও তখন ঢাকায় সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করত।

একদিন হাসানের একটা চিরকুট পেলাম এক গোপন সভা অনুষ্ঠানের। ঢাকার স্বামীবাগে সিকান্দার আবু জাফরের বাড়িতে এই সভা হওয়ার কথা। আইয়ুব সরকার ক্ষমতায় এসেই উর্দু হরফের বাংলা লেখা চালু করতে চাইল। স্বামীবাগের সভায় এই সরকারি প্রচেষ্টার বিরোধিতা করার জন্য বাংলার পক্ষের সমমনা ব্যক্তিদের একটি প্রকাশ্য সভা আহ্বান করা হয়েছিল।

এই আয়োজনের পর স্বামীবাগ থেকে রাত ১১টার পর আমরা কয়েকজন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রাত্রিযাপনের জন্য চলে যাই। কিন্তু আরমানিটোলায় যে-বাড়িতে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সে-বাড়ির বাইরে মূল দরজা রাত ১২টার পর খোলা হয়নি। আমি বহুবার ঘণ্টা বাজালেও বাড়ির কেউ দরজা খোলেনি। বাধ্য হয়ে আমি রাত ১২টার পর এক রিকশায় চড়ে আশ্রয়ের সন্ধানে বের হলাম এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসক্লাবে এসে আশ্রয় নিই। প্রেসক্লাবের পশ্চিমদিকে দোতলার শেষ কামরায়। কামরাটা ছিল লাউঞ্জ। এই লাউঞ্জে সোফা-চেয়ার-টেবিল সুন্দর করে বিছানো। আমি সেখানে এসে একজন স্টাফকে ডেকে বললাম, আমাকে ওই লাউঞ্জে আশ্রয় দাও। আমি খুব ভোরে চলে যাব।বললাম, আমাকে বাইরের দিক থেকে তালা লাগিয়ে দাও। এবং ভোরে এসে খুলে দিও।

ভোররাত ৪টার দিকে কে যেন আমার রুমের কড়া নাড়ছিল। কাচের ফাঁকে চেয়ে দেখি এক ব্যক্তি অনুনয় করছে দরজা খুলে দেয়ার জন্য। বুঝলাম, সাদা ড্রেসের আইবির হাতে আমি ধরা পড়েছি। এই জাতীয় গ্রেফতারের ব্যাপারে আইবিরা কখনো একা আসে না। নিশ্চয় প্রেসক্লাব আর্ম-ফোর্সড ঘেরাও করেছে।
আমি তাকে বললাম, কাকে চান? তিনি উত্তর দিলেন, আপনাকে, একটু কথা বলব। বললাম, আপনি আইবির লোক?
কোনো উত্তর নেই।

বললাম, আমাকে গ্রেফতার করবেন? কোনো কথা নেই। আমি বুঝলাম, ধরা পড়ে গেছি। কপাট খোলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এসে আমার পাশে সোফায় বসলেন। বললেন, আপনাকে একটু আমাদের অফিসে যেতে হবে। আমি আইবি বিভাগে কাজ করি। আমার বসের সঙ্গে কথা বলার পর আপনি চলে আসতে পারবেন। আমি বুঝলাম, শেষের এই কথাটা মিথ্যা। আইবি ভদ্রলোক আমার সঙ্গে অতি সুন্দর ব্যবহার করলেন এবং এক ফাঁকে বললেন, আমার বন্ধু মোহাম্মদ সুলতান তাঁর সঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে একই ইয়ারে পড়ত। ক’দিন আগে তিনি তাঁর বন্ধু সুলতানকে গোপন স্থান থেকে গ্রেফতার করেছেন।

আমি বললাম-- আপনি কিসের বলে আমাকে আটক করছেন? কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে? তিনি বললেন, আছে। এই কথা বলে পকেট থেকে একটা স্কুলের রুল করা খাতার পাতা আমার সামনে তুলে ধরলেন। তাতে লেখা ছিল, ‘ত্বরিত প্রেসক্লাবের দোতলায় যান। সেখানে ফয়েজ আহ্মদকে গ্রেফতার করতে পারবেন। নির্দেশক ডিআইজি (স্বাক্ষর)।’ আমি বুঝতে পারলাম ডিআইজির কোনো উচ্চ পর্যায়ের সোর্স তাঁকে আমার প্রেসক্লাবে অবস্থানের খবর দিয়েছে। অধিক রাত্রে তিনি ছেলেমেয়েদের স্কুলের খাতা ছিঁড়ে এই পৃষ্ঠায়  সরকারি গ্রেফতারের অর্ডার দিয়েছেন। কোর্টে এটি গ্রেফতারি পরোয়ানা হিসেবে গৃহীত হয়।

আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ভোর হলে আমাকে আপনি নিয়ে যেতে পারেন না?
শান্ত প্রকৃতির ভদ্রলোক নরম করে বললেন, নিয়ম ও নির্দেশ অনুযায়ী আপনাকে ধরার পরই নিয়ে যেতে হবে। আমি সব জেনেও সময় কাটাতে চেষ্টা করলাম ভোর হওয়ার জন্য। যে-কোনো কারণেই হোক পুলিশ যদি আমাকে গায়েব করে দেয় তবে আমার অস্তিত্ব কোথাও প্রমাণ করা যাবে না। সে-কারণে আমি ভোর হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। নানা উসিলা ধরে কথা বলে ভোর করলাম-- তখন বাইরে কাক ডাকছে। আমি বললাম, চলুন এখন। দোতলার এক কোনার রুমে আমাদের শ্রদ্ধেয় খাতিব ভাই থাকতেন। সিঁড়ির কাছ থেকে আইবি অফিসে চলেছি। এই আমার প্রথম স্বাক্ষী-- আমাকে পুলিশ নিয়ে গেল। আইবি আমার হাতে কড়া পরায়নি। আমি নিচে এসেই আকস্মিকভাবে ডাইনিং হলের পাশে ছোট্ট কক্ষে ঢুকে গেলাম এবং টেলিফোন উঁচিয়ে একজনকে ঘুম থেকে ওঠালাম। এবং তাঁকে বললাম, দুঃখিত আমি গ্রেফতার হয়ে এখন পুলিশের হাতে, তাদের অফিসে চলেছি। উনি প্রখ্যাত ডা. এম এন নন্দী।

তারপর আইবি আমাকে বললেন, আপনি তো আমাকে বিপদে ফেলবেন, এবার চলুন। নিচে আশপাশেই আর্ম ফোর্স ছিল। তাদের নিয়ে আইবি অফিসার তাঁর অফিসের দিকে হাঁটা দিলেন। তোপখানা রোডে গিয়ে বললাম, কোথায় যাব? উনি বললেন, এই সামনে। মতিঝিলের দিকে যেতে বাঁ হাতে যে-দোতলা বাড়িতে তিনি আমাকে উঠালেন সেটা প্রাক্তন মন্ত্রী টি আলী সাহেবের বাড়ি, স্থানীয় আইবির অফিস।


সারাটা দিন এই বাড়িতে আইবির এসপি ও অন্যান্য কর্মকর্তা আমার ইন্টারভিউ শুরু করলেন। এবং তাঁরা আমার চোদ্দপুরুষের খতিয়ান খাতায় লিখে রাখলেন।
বেলা ১১টার দিকে আমাকে ইন্টারোগেশনের ফাঁকে নাস্তা দেয়া হলো একগাদা ডালপুরি আর কড়া মিষ্টির চা। এই কাছের দোকানটা প্রেসক্লাবের পরিচিত। বিকালে দুটোর পর আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
সেই কারাগারেও যেতে আমার দেরি হলো ঘণ্টাখানেক। তারপর আমার সেই এলাকার নাজির জমাদার আমাকে নিয়ে গেল।

আমাকে ওঠানো হলো ২নং খাতায়, অর্থাৎ ২নং ওয়ার্ডে। জেলে ব্রিটিশ আমল থেকে কতগুলো শব্দ প্রচলিত আছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে খাতা। এই খাতা লম্বা দোতলা বিল্ডিঙের নিচের তলা। মোটা লোহার নেট হচ্ছে তার দরজা। এই বিল্ডিঙের চারদিক দিয়ে জেলের প্রধান দেয়ালের অভ্যন্তরে দ্বিতীয় দেয়াল অর্থাৎ জেলখানার  বিভিন্ন ওয়ার্ড বা খাতা, সেল এলাকা অথবা পৃথক পৃথক সেল। জেলখানার অভ্যন্তরেই অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। যেমন ২০ নম্বর সেল, নতুন সেল এলাকা,৬ নং সেল, কনডেম, ২৬ নম্বর সেল, ফাঁসির আসামিদের সেল-- সবই পৃথক পৃথক। তারই ফাঁকে রয়েছে মাঝখানে একটি দেয়ালের ভেতর পৃথক ধরনের একটি সেল এলাকা যা পাগলদের জন্য নির্দিষ্ট। তার ওপর বিরাট দোতলা আছে কয়েকশো বা হাজার উপযুক্ত বন্দিকে রাখা হয়। তারা হাজতি। এরা কোর্টে এখনও সাজা পায়নি। এদের খাদ্য কম দেয়া হয়। এদের কোনো কাজ নেই, সেজন্য খাদ্য কম দেয়া হয়। এরা প্রায়ই পুলিশের বন্ধ গাড়িতে কোর্টে হাজিরা দেয়। জেলের ভেতরে এদের যেহেতু বিচার হয়নি সেজন্য কোনো কর্মে নিযুক্ত করা হয় না। দুর্ধর্ষ ডাকাতির ভিন্ন একাকী সেল আছে, আইসোলেটেড। মাঝে মাঝে জীবন্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের এই সমস্ত সেলে অঘোষিতভাবে রাখা হয়।

কতগুলো সেলকে বলা হয় অ্যাসোসিয়েশন সেল, যেমন ২০ নম্বর সেল, নতুন কুড়ি সেল এলাকা। তেমনি একটা এলাকা খুবই বিখ্যাত আমাদের ২নং খাতা। এই খাতায় বিল্ডিঙের নিচের তলায় আমরা ১৬-২০ জন পর্যন্ত থাকতে পারতাম। আমাদের এলাকাটা অভ্যন্তরীণ দেয়াল দিয়ে ঘেরা, ৫-৬ জন ‘ফালতু’ আমাদের ওয়ার্ডে রান্না করা চা আদান-প্রদান ও বাগান করার জন্য দেয়া হতো। ফালতু অর্থ এখানে অতিরিক্ত অর্থাৎ এরা সিকিউরিটি নয়। এরা দীর্ঘদিন সাজাপ্রাপ্ত শান্ত প্রকৃতির লোক বলে রেকর্ড আছে। তার ওপর প্রতি সপ্তাহে ২-৩ দিন একজন জেল ক্রিমিনাল আমাদের দাড়ি কাটার জন্য নাপিতের ভূমিকায় আসত। প্রকৃতপক্ষে আমাদের দাড়ি কাটা, ধোপায় কাপড় ধোয়া, অফিসে যাওয়া-আসা, অফিসারকে খবর দেয়া এবং সেল এলাকার পাহারার জন্য সর্বক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়োগ করা হতো। যারা আমাদের দেখাশোন করত ও রান্নায় নিযুক্ত থাকত তারা রাতেও একই ওয়ার্ডে আমাদের সঙ্গে থাকত। এরাও সিকিউরিটি হয়ে যেত। তবে এদের রেকর্ড জেলে ভালো ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে এবং এদের শাস্তিও প্রায় শেষ, ২-১ বছর বাকি থাকে। ডেপুটি জেলার, জমাদার--এদের ঘুস দিয়ে অনেক সময় সিকিউরিটি এলাকায় কাজ করার সুযোগ নিত তারা। এই সমস্ত কর্মচারী আমাদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করত। খেতে পারত পেট পুরে।
 
এসব ছাড়া বিশেষ করে ঢাকা জেলে ফাঁসির আসামিদের জন্য পৃথক বিশেষ সেল রয়েছে। তাদের ফাঁসির এলাকাও পৃথক এলাকা। আমরা জেলের অভ্যন্তরস্থ বিভিন্ন এলাকা বা ওয়ার্ড সম্পর্কে জেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই সব জানতাম। এবং সবার শেষে যে-ওয়ার্ডটি আছে পৃথকভাবে সেটি হচ্ছে মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট সেল অঞ্চলÑএদের মধ্যে কেউ সাজাপ্রাপ্ত, কেউ অভিযুক্ত, কেউ স্মাগলার, কেউ পারিবারিক কলহের শিকার।

ব্রিটিশ আমলে জেলের বাসিন্দাদের জন্য প্রাত্যহিক খোরাক নির্দিষ্ট ছিল বারো আনা। পাকিস্তান আমলে কিছুটা বেড়েছিল তাতে দুপুরে একটা তরকারি ও সকালবেলা লম্বা (পাতলা) খিচুড়ি ছাড়া কিছুই পাওয়া যেত না। এমন একজনকেও পাইনি আমরা যিনি কোনোদিন পেটপুরে খেতে পেয়েছেন। তবে, সে-এলাকার সিকিউরিটির খাদ্যের ব্যাপারে জেল কর্তৃপক্ষ অনেকটা সতর্কতা নিতেন। ষাট সালের দিকে আমরা জেলে থাকতেই জেলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে একটা বাজার তৈরি হচ্ছিল। দুর্নীতিপরায়ণ অফিসাররা ধনী বন্দিদের জন্য জেলে মাঝামাঝি অঞ্চলে মাছ-মাংস প্রায়ই বিক্রি করত। আমরা এ-বেআইনি বাজারকে বলতাম ‘লান্ডি কোটাল’ অর্থাৎ সীমান্তপ্রদেশে খাইবার গিরিপথের দিকে যাওয়ার পথে যে-ট্যাক্সবিহীন বাজার বসে সেই বাজারের নাম লান্ডি কোটাল। সরকারের ট্যাক্স নেই বলে সব চোরাচালানকৃত দ্রব্যের মূল্য অর্ধেক। জেলখানার লান্ডি কোটাল দামে ছিল অতিরিক্ত। যে-সমস্ত স্মাগলার বা ব্যাংক লুটেরা জেলে থাকত। আমাদের সময় তাদের বদৌলতে মাঝে মাঝে রুই মাছের পেটি আর ইলিশ মাছের ভাজা অদৃশ্য স্থান থেকে আসত। এই সমস্ত স্মাগলার বা ব্যাংক লুটেরাদের কাছে আমাদের অনিচ্ছার কোনো মূল্য ছিল না। জেলের সামগ্রিক এই পরিবেশে গাঁজা, দামি সিগারেট ও বিড়ির প্রাচুর্য ছিল তখন।
কিন্তু কারো যদি জেলে কোনো শাস্তি হয়ে যায় তবে খুবই কড়াকড়ি চলে। যেমন আমার, জেলে থেকেও ছয় মাস নিঃসঙ্গ জেল হয়েছিল। জেলে নিয়োজিত ডাক্তার মকবুলকে একবার আমি ক্ষুব্ধ হয়ে জেলে নির্মিত স্যান্ডেল দিয়ে পিটিয়েছিলাম। বিধান অনুযায়ী জেল কর্তৃপক্ষ জেলগেটে আমার বিচার করেছিল।

এলএমএফ ডাক্তার মকবুল তখন ঢাকা জেলের ডাক্তার। তার ওপর ঢাকার সিভিল সার্জন কর্তৃত্ব করেন। এই সিভিল সার্জন বিধান অনুযায়ী জেলের ব্যাপারে ক্ষমতাবান ব্যক্তি-- এমনকি তিনি বিশেষ প্রয়োজনে কোনো রোগীকে মুক্তির জন্যও অনুমোদন দিতে পারেন। তিনি ১৫ দিন ১ মাসে একবার করে নিরাপত্তা বন্দিদের নিজে এসে ভিজিট করেন। এবং রোগের বিষয়ে যে-কোনো ওষুধ দিতে পারেন এবং অন্য হাসপাতালে ট্রান্সফারের নির্দেশ দিতে পারেন। সে-মাসের গোড়ার দিকে ঢাকার সিভিল সার্জন (সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের জামাতা) আমাদের দেখতে এসেছিলেন। তিনি সবাইকে বিশেষ খাদ্য দিলেন এবং নিজেই ভালো করে পরীক্ষা করলেন। কারণ তখন আমাদের তিন বছর হয়ে গেছে।সে-সময় আমাদের ওয়ার্ডে একজন গুরুতর রোগী ছিলেন, আমাদের বন্ধু বিনোদ দাসগুপ্ত। তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতর বিধায় তিনটা ওষুধ তিনি বাইরে থেকে কেনার রিকমেন্ড করেন। এই ওষুধ কেনার দায়িত্ব পড়ে জেল ডাক্তার মকবুলের ওপর। মকবুল ডাক্তার সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি এবং হিন্দুবিদ্বেষী ও সামরিক সরকারের পক্ষের লোক। হিন্দু বিনোদের চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি উদাসীন হয়ে গেলেন এবং পনেরো দিনব্যাপী কোনো ওষুধ ক্রয় করেননি। বিনোদের অবস্থা আরও অবনতির দিকে এবং তিনি বিছানাতেই থাকেন। এই অবস্থায় আমরা সবাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। একদিন ডাক্তার মকবুল রুটিন অনুযায়ী আমাদের ওয়ার্ডে নিরাপত্তা বন্দিদের দেখতে এসেছিলেন। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম-- বিনোদকে ওষুধ দিচ্ছেন না কেন? ডাক্তার প্রথমে আমার কথায় কান দেননি। পরে বললেন-- সময় হলে দেব। বললামÑপনেরো দিনেও সময় কেন হয়নি? তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন, এবং বললেনÑএটা আপনার বিষয় নয়। আপনি আপনার সিটে যান। আমি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলাম। তিনিও ক্রুদ্ধ। ওষুধ না দিয়ে যে তিনি অপরাধ করেছেন এটা তিনি জানেন। আমি ক্ষিপ্ত হয়ে জেলখানায় তৈরি স্যান্ডেল দিয়ে মকবুল ডাক্তারকে আক্রমণ করলাম এবং চিৎকার করে বললাম-- এখনই তোমাকে ওষুধ দিতে হবে। ডাক্তার ভাবলেন, পরিকল্পনা করে তাঁকে আঘাত করা হচ্ছে। সিকিউরিটি বন্দিরা তাঁকে হত্যা করবে। তাঁকে পেটানোর সময় তাঁর সাহায্যকারী (ফালতু) ঘর থেকে পালাল। আমাদের মুরুব্বি ফণীদা (ফণী মজুমদার), শহীদুল্লা কায়সার, মোহাম্মদ সুলতান, সন্তোষ গুপ্ত ত্বরিত এসে আমাকে ধরে ফেলল এবং মকবুল ডাক্তারকে আমার হাত থেকে ছাড়িয়ে দিল। আমি দারুণ ক্ষিপ্ত। মোহাম্মদ সুলতান বুদ্ধি করে আমদের পাহারাদার জেল সেপাইয়ের হাত থেকে বাঁশিটা ছিনিয়ে নিয়ে গেল-- যাতে পাগলাঘণ্টা না বাজে এবং বাঁশি না বাজে। মকবুল ডাক্তার তার স্টেথো আমাদের ওয়ার্ডে ফেলেই দৌড়ে পালিয়ে গেল ওয়ার্ড ত্যাগ করে।

আমার এ-আক্রমণে পাহারাদার পুলিশ বাঁশি বাজালে জেলে সে-সময় পাগলাঘণ্টা পড়তে পারত। কিন্তু সুলতানের বুদ্ধিতে এই ঘণ্টার আশঙ্কা রইল না। সমগ্র জেলখানায় কথা ছড়িয়ে গেল, আরও বড় আকারে সিকিউরিটি এলাকায় বিদ্রোহ হয়েছে বলে প্রচারিত হলো। আসলে তা নয়। সে-যাত্রায় ঘটনার সমাপ্তি ওখানেই।

জেল কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে একটি রেগুলার কেস করতে পারত। কিন্তু তারা জানে, সিকিউরিটি প্রিজনাররা কেবল এ-ঘটনার সাক্ষী। কেস হলে কেউ সাক্ষ্য দেবে না। সুতরাং আমাকে শাস্তি দেয়ার দ্বিতীয় পন্থা হচ্ছে জেল-বিচার। সে-বিধান অনুযায়ী জেলগেটে ডিআইজিকে নিয়ে এক ধরনের বিধানমাফিক কোর্ট করে তারা-তারাই আমার বিচার করে। এই বিচারে আমার ছয় মাস নির্জন কারাবাস হয়। এই একাকী জেলের শাস্তি যে কী কঠিন তা আমি এখনও উপলব্ধি করি। আমাকে তিন দিন পর জেলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কুড়ি নম্বর সেলে একাকী বন্দি করে রাখা হলো।

এখানে আমি এমনই নিঃসঙ্গ যে একটি কাকও নেই। জেল থেকে দূরবর্তী অঞ্চলে মাঝে মাঝে একটা বেড়াল দেখতে পাই দেয়ালের ওপর। কোনো সাধারণ কয়েদিও আমার সেলের সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা করে না। তিন বেলা খাদ্য আমাদের দুই নম্বর খাতা থেকে নাজির জমাদারের নেতৃত্বে দিয়ে যাওয়া হয়। রাতের খাবার আসে বিকাল ৪টায়। আমি থাকি লকআপ করা সেলে চব্বিশ ঘণ্টা। এর মধ্যেই বাথরুমের ব্যবস্থা। দিন ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত আমার সেলের ভেতরে বিছানায় রোদ আসে। ফ্যানহীন অবস্থায় উত্তপ্ত পরিবেশে দোজখের আগুনে পুড়তে থাকি। রাত ৯টার খাদ্য বিকাল ৪টায় আসে। প্রায়ই রাতে এই শীতল খাবার খাই না। ৬ মাসব্যাপী আমার চিঠিপত্র বন্ধ। এই ৬ মাস সময় কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ বন্ধ। এমনকি প্রতি মাসের আইবিও আমার সঙ্গে ৬ মাস দেখা করেনি। একটা বেড়ালকে মাঝেমধ্যে আমার সেলের সামনে দিয়ে চলে যেতে দেখতাম। আমাকে জেল লাইব্রেরি কিংবা কোনো বন্ধুর কাছ থেকে বই দেয়া হতো না। আমার কোনো চিঠিপত্র জেলে এলেও আমার কাছে পৌঁছত না। তিন হাত চওড়া জেল-দরজার ভেতরে আমার ছিল পায়চারি।

[চলবে]


বাংলাদেশ সময় ১৪৪২, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১২

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa
cache_14 2012-02-23 03:54:04