ঢাকা, বুধবার, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ০৫ আগস্ট ২০২০, ১৪ জিলহজ ১৪৪১

শিল্প-সাহিত্য

জুয়েল মোস্তাফিজের একগুচ্ছ কবিতা

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১১-০৭-০৮ ০৫:২১:৩৯ পিএম
জুয়েল মোস্তাফিজের একগুচ্ছ কবিতা

দমের কালি

এক

গলিত মাংসের ভেতর যেন ডুবে যাচ্ছিল পৃথিবীর গলা; আর নামগুলো ছিল জীবনের অতিরিক্ত অলঙ্কার। দমের সাথে ফাঁসির কাঠের লড়াই দেখে মনে হয়েছিল জীবন এক ফোটা কড়া মদ! ওই প্রথম মৃতগামির প্রতি জগতের প্রকৃত হিংসা দেখেছিলাম, নিশ্বাসের অবাধ ভঙ্গিমার ভেতর কোনো পাখি ছিল না।

কেবল মৃত্যুর ভেতর উড়ছিলো লাল লাল মোরগ; মোরগের গলা আছে এই বিশ্বাসের ভেতর বাস করছিল এক দামড়া হাসি। আর বিশ্বাসেরই তাড়া খেয়ে ফাঁসির কাঠে শুয়েছিল আবিশ্বাসের ঘোড়া। অথচ দমের কালে সাত কামের সূর্য কোনো দিন বলেনি, বুক একটা চওড়া কাঠ; তার ওপর দাঁড়িয়ে যারা ফাঁসিতে ঝুলে তাদের কোনো গলা থাকে না।

সম্ভবত প্রকৃত প্রাণের কোনো দাঁত থাকতে নেই, যাদের কপালে সময় আছে তাদের সোজা হতে নেই, ফাঁসির পিঠের ওপর আমার পায়ের ছাপে দেখেছিলাম অপরাধের কেঁপে ওঠা কলিজা; আর কিছুতেই ঠাহর করতে পারছিলাম না; দমের তামাসায় আলতামাখা মাছি কিভাবে কাঁদে? হাতের সাথে বুকের অপরাধ যেন পোকা লাগা কল্যাণের মাংস; দেখলাম শেষ দেখতে কেমন? শেষের মগজ ছত্রিশ ফুটার বাঁশি। এবং এভাবেই দেখা হয়েছিল অপরাধ কত অসহায়, পৃথিবী যাকে ঘরে তোলেনি, ফাঁসির কাঠের অপর পৃষ্ঠা তাকে বুকে তুলে নিল...

দুই
আমার মৃত্যুর সঙ্গে কাঠের চোখের একটা মিল ছিল, ততক্ষণে  আমি আমার জিহ্বার অর্ধেক অংশ খেতে পেরেছিলাম, আপন দেহ খাওয়ার ছায়া পড়েছিল কাঠের চোখে, আর আমার ফাঁসির কাঠখানা খেয়েছিল তার অপর চোখের ফল। অনুভব করছিলাম, এই যে আমার দেহ; দেহের ওপর লেগে থাকা চোখের দুটি পাকা জাম ফল কখনো খাওয়া হলো না...

তখন সময় ছিল দ্বিপত্রী বীজ, মুহূর্তেই ভাগ হয়ে গেল, আর অমনি আমার বাম পায়ের মুখ ফুটলো, পায়ের কথা বলা দেখে জল্লাদখানার বাতাস হয়ে গেল লাল লাল দুধ। ওই লাল দুধ দেখে আমার ডান পা ফাঁসির কাঠকে বলেছিল- ‘বলো না, যমের আহ্লাদ দেখতে কেমন? তারপর কাঠের গায়ে সাতবার মোচড় পড়েছিল, আমার ওজনে কাঠের ওজনের পাল্লা ভেঙ্গেছিল, দেখলাম, পৃথিবীর বেঁচে থাকা মানুষের মাথা ফাটা ফাটা কতবেল, আর সবাই যে যার কতবেল গাছ; সেসব গাছের দেহ আমার দাঁড়িয়ে থাকা কাঠ। এরপর আমার মাথায় আসে যমটুপি; কাঠের মাথায় আসে যমের আহ্লাদ, সেই আহ্লাদের ভেতর শেষবারে মতো শুনেছিলাম, জীবন একটা লবন মাখা ব্লেড, প্রাণে থেকে যতবার হেঁটেছি ততবার কেটেছে জগতের স্নায়ু...

তিন
আমার খেতে ইচ্ছে হয়েছিল আমারই পিঠের মধ্যভাগ, কারণ মৃত্যু এমন একটা পথ ছিল যার কোনো প্রান্ত ছিলো না। আর ফাঁসির কাঠের দিয়ে তাকিয়ে বুঝে উঠতে পারছিলাম না ডুবে যাওয়া কি জিনিস? কেবল দেখতে পাচ্ছিলাম ক্লান্ত উটের তলপেট, আর বাঘের মগজ ভেদ করে ওঠা একটা পেন্সিল। কাঠ বলছিল আমার সত্তর কর্নারে তাকাও, আমি তাকানোর পদ্ধতি মনে করতে পারছিলাম না। আর এই জন্য মৃত্যুর পূর্বক্ষণে দেখতে পাইনি কীভাবে দমের ভেতর দেহ ডুবে, দেহের ভেতর ডুবে মরে দম!
আমার ফাঁসির কাঠ ছিলো আমার কপালের মতো চওড়া, সে একসাথে ঘুমের ভেতর স্বপ্ন আর ফাঁসির মঞ্চে মার্বেল খেলতে পারতো। ফাঁসির কাঠ আমার মরণ ভার গ্রহনের আগে অনেক শিশুর মন টেনে টেনে বড় করেছিল। তার ভেতর আমি আমার জন্মগ্রহণের দৃশ্য দেখেছিলাম। আপন জন্মের দৃশ্য আর আপন মৃত্যুর দৃশ্য দেখার সময় আমার প্রাণের তলপেটে তীব্র ক্ষুধা লেগেছিল, আর ফাঁসির কাঠ আমাকে বলেছিল, কেবল পিঠের মধ্যভাগের সাথে জগতের গরল নালার কোনো সংযোগ নেই।

চার
salvador

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফাঁসির কাঠে দাঁড়িয়ে নিজের মৃত্যুকে সন্দেহ হয়েছিল, আর দেখছিলাম ভুঁয়া পোকারা যতবার হাসছে ততবার তিতা হয়ে উঠছে মৃত্যুর নিমপাতা। আমি পায়ে পায়ে খুঁজছিলাম কাঠের বুক আর অমনি চোখের ভেতর সাত দরজার কপাট লেগে গেল। প্রথম কপাটের দৃশ্য ছিল ভীষণ এলোমেলো- কমে যাচ্ছে যমজ পুকুরে পানি আর ওই পুকুরের মাছগুলো খেয়ে ফেলছে নিজেদের সাঁতার; পানির সঙ্গে বদল হচ্ছে মাছের কাটা। সপ্তম কপাটের দৃশ্যের সাথে কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না, নিশ্বাস কোন ধরনের তামাক? আমার ভীষণ নিশ্বাসের নেশা পেয়েছিল, আর শেষবারের মতো ইচ্ছে হয়েছিল নিজের মাথাটা খুলে একবার ফুটবল খেলি। দেখলাম ফাঁসির কাঠ চওড়া হতে হতে বড় একটা মাঠ হয়ে গেল; আমি নিজের মাথার পিছে পিছে মুহূর্তেই সহস্রকাল দৌড়ালাম, আর মনে হলো ম্যানিলার গোল পোস্টে মাথায় উৎকৃষ্ট ফুটবল...

 পাঁচ
আলোগুলো হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে জমা হলো জল্লাদখানার তিন কোণায়; ওরা আমার যৌবনের কাছে বয়স চেয়েছিল, আর আমি ‘ভেতর’ ব্যাপারটি নিয়ে পড়েছিলাম বিপাকে, মনে করতে পারছিলাম না এতদিন কোন অক্ষর দিয়ে নিজের নাম লিখেছি। মুখের বর্ণমালায় কখনো কি লেখা হয়েছে কোনো নাম? মানুষের মুখ কি কোনো বর্ণমালা? আমি জল্লাদের মুখের পাশে আমার মুখ বসিয়ে একটি নাম লেখার চেষ্টা করছিলাম আর অমনি কাঠের অন্তর আমাকে বলেছিল- নামে জন্ম নামে মৃত্যু দেহ তাহলে কে?

দেহের সন্ধানে আমি আলোর কাছে বয়স ফেরত চেয়েছিলাম, আর অমনি দেহ থেকে আমার নাম উপড়ে ফেলেছিল এক জীবন শিকারি। আমি দিব্যি দেখতে পাচ্ছিলাম হরিণের হাসিও এক ধরনের মাংস; সত্য শব্দের ভেতর যে বর্ণ লুকিয়েছিল অপরাধী শব্দের ভেতর ওই একই বর্ণ খেলছিল গোলক ধাঁধার খেলা। ওই খেলায় যোগ দিয়ে আমার নামের অক্ষর আমায় দিয়েছিল ফাঁকি আর আমি ফাঁসির কাঠের দিকে চেয়ে চেয়ে বুঝেছিলাম দেহ আসলে কে?

ছয়
আমার মুখ ছিলো পৃথিবীর গোপন মদের পেয়ালা; আর ফাঁসির মঞ্চ হতে আত্মার দূরত্ব ছিলো একাত্তর কদম। ফাঁসির দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রতিটি কদমের ফাঁকে ফাঁকে জন্ম নিচ্ছল এক একটা ঘুঘু। কুমারির বুকের ছাতা ভেঙ্গে উড়ে আসা ওই ঘুঘুগুলোর চোখে যত নেশা দেখেছি তত মনে হয়েছে জীবন একটা মদের বোতল! যতবার ঝাঁকুনি ততবার উপচে পড়ে দমের কালি...

ফাঁসির পিড়িতে বসে মনপাগলের বাটা হলুদ মেখেছি একা একা; দেখেছি মনপাগলের গলায় একটা পিতলের ঘড়ি পৃথিবীতে বাষ্প ছড়াচ্ছে আর দমের ষাড় বার বার ছিঁড়ে খাচ্ছে নিম গাছের ছাল। আমি দমের চুল ধরে কেঁদেছি, দমের ঠোটে দম লাগিয়ে পান করেছি জন্মের শরাব। দেখলাম প্রান্তরে দুটি গুহা; একটি পরিচয়হীন গাভি; কালো কালো দুধের স্রোত; অসময় এসে দাঁড়িয়ে আছে মস্তকের গোয়াল ঘরে...আর অমনি ধোকা ফলের গাছ থেকে খুলে পড়েছে অসংখ্য চন্দ্রগ্রহণ...

juwel


 জুয়েল মোস্তাফিজ
 কবি, গদ্যকার

 

বাংলাদেশ সময় ১৬৪০, জুলাই ০৮, ২০১১

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa