ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আষাঢ় ১৪২৬, ২৫ জুন ২০১৯
bangla news

আহমদ ছফার প্রার্থনা : মানুষ ও নিসর্গ ০২

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১০-০৮-০৩ ৯:৩৮:৪৩ পিএম

বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের তিন যুগ চলিতেছে। প্রথম যুগে মহাকাব্য রচিত হইত মানুষের মুখে মুখে। সে যুগে প্রকৃতির ভিতর দিয়া আদম সন্তান নিরাকার প্রভুর লীলা সাঙ্গ করিত। দ্বিতীয় যুগের মহাকাব্য ট্রাজেডিধর্মী। মহাকাব্যের নায়ক হইত আখ্যানের পরাজিত সন্তান। আমাদের যুগে মহাকাব্যের নায়ক সামাজিক মানুষ।


বাংলা সাহিত্যে মহাকাব্যের তিন যুগ চলিতেছে। প্রথম যুগে মহাকাব্য রচিত হইত মানুষের মুখে মুখে। সে যুগে প্রকৃতির ভিতর দিয়া আদম সন্তান নিরাকার প্রভুর লীলা সাঙ্গ করিত। দ্বিতীয় যুগের মহাকাব্য ট্রাজেডিধর্মী। মহাকাব্যের নায়ক হইত আখ্যানের পরাজিত সন্তান। আমাদের যুগে মহাকাব্যের নায়ক সামাজিক মানুষ। এখনকার মহাকাব্য নিছক প্রভুর বন্দনা আর পরাজিতের ইতিহাস লিখিতেছে না, লিখিতেছে সামাজিক বান্দার ইতিহাস। যে বান্দা শ্রেণী-সংঘাতের ভিতর দিয়া প্রকৃতির মানুষ হইয়া উঠিতেছে। আহমদ ছফা আমাদের যুগেরই মহাকাব্যের কবি। তাহা কেমন?

‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’ কেতাবের সমালোচনায় ফরহাদ মজহার ছফাকে গণমানুষের কবি বলিয়া খ্যাতি দিয়াছেন। (মজহার ১৯৭৭) আর সলিমুল্লাহ খান বলিয়াছেন, ‘আহমদ ছফার কবিতাটি ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধের রক্তপান করে জন্ম নিয়েছে।’ (খান ১৯৭৭) আহমাদ মাযহারও ‘আহমদ ছফার মহাকাব্যিক অভিযাত্রা’ রচনায় এমন ইঙ্গিত দিয়াছেন। (মাযহার ২০০১)

সকলে জানেন, বাঙালির জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম ১৯৭১ সনে স্বাধীনতার জন্ম দিয়াছে। রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে। তাহা হইলে স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণ এখনো পরাধীন কেন?
কেন জনগণের জাতীয় মুক্তি ঘটে নাই তাহার কারণ বিস্তর। তবে ছফা তাহার প্রণীত ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’, ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’, ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রভৃতি বহিতে তাহারই তত্ত্ব-তালাশ করিয়াছেন। পঁচাত্তরে প্রকাশিত কেতাব ‘জল্লাদ সময়’ সেই স্যা বহন করিতেছে। কোনও সমাজের অন্তঃস্থিত মানুষের চিন্তাপ্রবাহ কী তাহা না দেখিবার কালকে আমরা বলিতেছি ‘জল্লাদ সময়’। এই সময় মানুষকে আততায়ী হইতে বাধ্য করিতেছে। কবির বয়ানে:

খড়গ্ হস্তে নৃত্য কর জল্লাদ সময়
তোমার সুস্থির হওয়া বড় প্রয়োজন
সকলে বিশদ জানে তবু হয় অন্ধকারে খুন
অস্ত্রহীন তাই কেউ বিনা খুনে দায়ভাগী হয়।
কেন্দ্রহীন হে সময় ছিন্ন ডানা রাসীর মত
শরীরে গড়িয়ে চল একটানা নীতিহীন বলে
তোমার রথের চাকা ঠেকে দেখ কোন্ রসাতলে।
মূল্যের বৃক্ষের মূলে অহরহ হানছ আঘাত।
সময়ের জানু চিরে বেরিয়েছ জারজ সময়
টাট্কা মনুষ্য প্রাণ মনে কর খেলার পুতুল
ইচ্ছেমত ভাঙ্গ তুমি মর্জিমত বসাও মাশুল
তোমার গর্ভের পাপে বঙ্গদেশে জেগেছ প্রলয়।
দাঁতাল জন্তুর মত গর্জমান নির্দয় সময়
তোমার আশ্রয়ে বাড়ে পুষ্ট হয় শূয়রের দল
যা পারে তছনছ করে দুঃখিনীর অন্তিম সম্বল
শোন না প্রজ্ঞার বাণী অনাচারে কর না সংশয়।
সূর্যালোকে পিঠ দেয়া আততায়ী লজ্জিত সময়
যা কিছু প্রকাশ্য তুমি বামহস্তে করছ গোপন
সমূহ ধ্বংসের বীজ গর্ভাশয়ে করেছ রোপণ
কিছু কিছু সত্য আছে কোনদিন লুকোবার নয়।
                      (ছফা ২০০৮[গ])


স্বাধীন দেশে গত চার দশকে কি গণতান্ত্রিক বাম কি অগণতান্ত্রিক বুর্জোয়া সকল দল ‘সঙ্কট’, ‘মহাসঙ্কট’ বলিয়া মাথা কুটিতেছে। মনে হইতেছে, গত চার দশকের ইতিহাস ‘সঙ্কটে’ খাবি খাইবার ইতিহাস। আমরা আর সঙ্কটের মাথায় পানি ঢালিব না। বিনীতভাবে বলিব: চিন্তা যখন গুছাইয়া কথা বলে তখন সংস্কৃতির বিপ্লব ঘটাইয়া থাকে। আমরা বিপ্লবের আলামত দেখিলাম শেখ মুহম্মদ সুলতানের ‘নিসর্গ ও মানুষ’ চিত্রকলায়, আহমদ ছফার একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা কাব্যে। তাহা হইলে বিপ্লব কি পদার্থ?

আহমদ ছফার সহিত শেখ মুহম্মদ সুলতানের সাক্ষাৎ সম্বন্ধের কারণ ব্যক্তি সুলতান কি? মোটেও নহে। সম্বন্ধের কারণ সুলতানের ‘নিসর্গ ও মানুষ’। কেননা ব্যক্তির বিকাশ মানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বিকাশ। ব্যক্তির সামাজিক চিন্তার বিকাশ মানে সংস্কৃতির বিপ্লব। বিপ্লব ধ্বংসের নরমুণ্ড নহে, বিপ্লব সংস্কৃতিরই পুনর্জন্মের ইতিহাস। জাগা যেমন ঘুমানোর উল্টা, বিপ্লবও ঠিক ধ্বংসের উল্টাপীঠ। সে সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন সামাজিক মালিকানা। সামাজিক বান্দার চিন্তার সহিত লড়াই করিবার যোগসূত্র ইহার সার। তবে সুলতান কাহাকে মানুষ বলিতেছেন?

সুলতানের মানুষ সেই ওয়াকিবহাল সংস্কৃতির নায়ক-নায়িকা কৃষক। যাঁহারা নিসর্গের জমিনে প্রাণের পুনর্জন্ম ঘটাইতেছেন। তাঁহাদের উৎপাদনের লীলা ভবিষ্যৎ বীজের। আহমদ ছফা ইহাকেই বলিতেছেন ‘আগাম ভাব’। শুদ্ধ ইহা নহে। আছে পরের কথা। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় ‘কৃষক’ বলিলে ‘ভূস্বামী’, ‘বর্গাচাষী’, ‘খেতমজুর’ নাম পদের কথা আসে। ভূস্বামী কে? যে কৃষকের শত্রু। বড় প্রাণী যেমতি ছোট প্রাণীকে ভোগদখল করিয়া থাকে ঠিক ভূস্বামীও কৃষককে তাহাই করে। বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ রচনায় বলিতেছেন,

‘জমিদার প্রকৃতপে কৃষকদের উদরস্থ করেন না বটে। তবে যাহা করেন তাহা অপো হৃদয়ের শোণিত পান করা দয়ার কাজ।’ (উদ্ধৃত, মজুমদার ১৯৯৫: ১১)

প্রকৃত প্রস্তাবে ভূস্বামীই বড় পুঁজির মালিক। দোসরা বর্গাচাষী কে? বর্গাচাষী সেই, হাতে যাহার ক্ষুদ্র পুঁজি। তবে ইহারা ভূমিহীন। নির্দিষ্ট সময় জমি বন্ধক রাখিয়া ফসল ফলায়। আর খেতমজুর তাহারাই যাহাদের হাতে পুঁজিও নাই, জমিও নাই। তাহাদের পুঁজির নাম নিখাদ শ্রম। আমরা ইহাতে দেখিলাম, অতিকায় মানুষ আর ঊনমানুষের ফারাক। আর দেখিলাম শোষণের চক্রব্যূহ। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার বৈষম্যের বলে (ভূ)স্বামীরা এইভাবে কৃষকের হৃদয়-শোণিত পান করিতেছে।

সুলতানের কৃষক ওরফে মানুষ ঊনমানুষ বা অতিকায় মানুষ নহে। বাস্তব সমাজ সম্পর্কের সহজ মানুষ। সুলতানের ছবিতে কি নারী কি পুরুষ সকলেই উৎপাদিত ফসলের সমবিহারে মাতিয়া আছেন। পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের ঊনমানুষ কিংবা অতিকায় মানুষের কবরের উপর তাঁহারা নতুন ফসল উৎপাদনে মত্ত। ইহাতে ভূস্বামীও নাই বর্গাচাষীও নাই। সামাজিক মালিকানায় সকলেই কৃষক ওরফে মানুষ। যাহা জাঁ জাক রুসোর সরল আদিমতাকে ছাড়িয়া সহজ মানুষ হইয়া উঠিয়াছে। এহেন বিপ্লবকেই আমরা বলিতেছি সাংস্কৃতিক বিপ্লব। জারি থাকা দরকার, পুঁজিবাদী সমাজের শোষণের প্রতীক ‘কঙ্কালসার মানুষ’। আর বিপ্লব সাধিত সমাজের প্রতীক ‘বীর্যবান পেশীর কৃষক’। এহেন কৃষকই একত্রে লড়াই-সংগ্রাম করিতেছে। আর করিতেছে জীবনের সাধনা। ছফার সহিত সুলতানের সম্বন্ধের কারণ ইহা নয় কি? ছফার ‘প্রবীণ বট’ সুলতানের ছায়া নহে। তাহার কীর্তির সমান তরাল কায়া। দুই মনীষীর নায়ক-নায়িকা সমান সমাজের সমান অংশীদার। ছফার প্রার্থনায়:

নিয়ে চলো আমাকে সেই বিজ্ঞ কিষাণের জীবনের একেবারে একান্তে
যারা বোঝে আলোছায়ার রহস্য
নদীর গতিধারার সঙ্গে যাদের দীর্ঘ পরিচয়
আকাশে পূর্বে রামধনু দেখলে যারা বন্যার
আশংকায় শঙ্কিত হয়
ধূসর জলবাহী মেঘ দেখে বোঝে
ফুটি ফাটা মাঠে যন্ত্রণা অবসান,
নামবে বৃষ্টি অঝোর ধারায়।
হেমন্তের সোনার মতো কান্তিমান রোদে
গ্রাম সুন্দরীর ভুবন ভোলানো রূপ দেখে তৃষিত নয়নে।
বনের মর্মরে পূর্বপুরুষের পদধ্বনি কান পেতে শোনে
পাহাড়ে পাহাড়ে প্রহত আওয়াজে দূরস্মৃতি
শ্রবণে মায়ালোকের যাদু রচনা করে।
আর্যত্বের গৌরবে স্ফীত নয় যাদের নাসারন্ধ্র
ইরান তুরানের স্বপ্ন হানা দিয়ে মনে তরঙ্গ জাগায় না যাদের
আভিজাত্যের অভিজ্ঞান লিখিত নেই যাদের ঠিকুজিতে
সেই জারুল পলাশ আশ শ্যাওড়ার আত্মীয়
খেয়ালি নিসর্গের স্বভাবজ সন্তান।
                   (ছফা ২০০০: ২৪Ñ২৫)


গত চার দশকের বাংলাদেশি কবিতায় পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক কবিদের অনুকরণে শ্লোকের মাতম চলিতেছে। কে কেমন পশ্চিমবঙ্গের কবিতার উঞ্ছবৃত্তি করিতে পারিতেছে তাহাই যেন এখনো সাহিত্য বিচারের মাপকাঠি। অবশ্য রাষ্ট্র বা দেশের হিসাব করিলে পশ্চিমবঙ্গের সহিত বাংলাদেশের সাহিত্যের তুলনা চলিতে পারে না। হয়তো বাংলাদেশের সাহিত্যের তুলনা চলিতে পারে গোটা ভারতবর্ষের সাহিত্যের সহিত। বাঙালি মুসলমান লেখকদের সঙ্কটটা এইখানেই- তাহারা নিজেদের মানুষ ভাবিতে অভ্যস্ত নহে। কারণ বাঙালি মুসলমান লেখকদের সঙ্কট নমশূদ্র ভাবাপন্ন মনেরই সঙ্কট।

ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজে নমশূদ্রের জন্য বেদ পড়া তো দূরের কথা, বেদ শোনাও ছিল পাপের সামিল। সাব্যস্তর দাসে পরিণত হওয়া বা বাঙালি মুসলমানের এই সঙ্কট ছফা হাড়ে হাড়ে টের পাইয়াছিলেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সঙ্কটখানি খানিক চিহ্নিত করিয়াছেন। ‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়’ রচনায় তাঁহার মত:

আমরা মুসলমানকে যখন আহ্বান করিয়াছি তখন তাহাকে কাজ উদ্ধারের সহায় বলিয়া ডাকিয়াছি, আপনা বলিয়া ডাকি নাই। যদি কখনো দেখি তাহাকে কাজের জন্য দরকার নাই তবে তাহাকে অনাবশ্যক বলিয়া পিছনে ঠেলিতে বাধিব না। (ঠাকুর ১৯৬৮: ৯১)

রবি ঠাকুরের কথা হক কথা। কি হিন্দু কি মুসলমান সকলেই মানিবেন। জাতিতে জাতিতে ভাবের ভাব সমান না হইলে সাম্প্রদায়িকতার ভেদবুদ্ধি থাকিয়া যাইতে বাধ্য। কিন্তু বাঙালি সমাজে যে ‘ব্যবহারজীবী শ্রেণী’ গড়িয়া উঠিয়াছে ইহারাই সাম্প্রদায়িকতার গোড়া নয় কি? কবি আরো বলিতেছেন:

স্বাতন্ত্র্য-অনুভূতির অভাবটা একটা অ-ভাব মাত্র, ইহা ভাবাত্মক নহে। অর্থাৎ আমাদের মধ্যে সত্যকার অভেদ ছিল বলিয়াই যে ভেদ সম্বন্ধে আমরা অচেতন ছিলাম তাহা নহে, আমাদের মধ্যে প্রাণশক্তির অভাব ঘটিয়াছিল বলিয়াই একটা নিশ্চেতনায় আমাদিগকে অভিভূত করিয়াছিল। (ঠাকুর ১৯৬৮: ৯২)

এখন আর অভিভূত হইবার কাল নাই। অভাবের ভাব নয়, ভাবের অভাব পূর্ণ করিয়া ভেদ ঘুচাইবার কাল। সেই কঠিন পথ সন্ধানের দরজা ছফা খানিকটা খুলিয়া দিয়াছেন ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ রচনায়।
সৃজনের দিক হইতে যাহা সহজ তাহা সাধ্য হইতে পারে না। কিন্তু যাহা কঠিন তাহাকে সহজ করিয়া সৃজনের মর্ম করিয়া তুলিতে পারিলে শিল্প কিংবা সাহিত্যের অর্থগৌরব ঘটে। অর্থগৌরবের দিক হইতে সুলতানের শিল্পকর্ম, ছফার অনবদ্য মহাকাব্যখানি নানাভাবে জাতি হইয়া উঠিয়াছে। তাই ছফার কবিতার ভাষা সাধু। আধুনিক বাংলা কবিতার ভাষা যেইখানে বালির উপর ইষ্টক খণ্ড বসাইতেছে, সেইখানে ছফার কবিতার ভাষা মাটির সৌধ তৈয়ার করিতেছে। আধুনিক বাংলা কবিতার ভাষা যেইখানে বিচ্ছিন্নতার পদে পা কাটিতেছে, ছফা সেইখানে করিতেছে ভাওয়াইয়া গানের রাষ্ট্র। এহেন বাসনার  উপাসনাই তো জাতীয় সাহিত্যের লক্ষণ। কি বাঙালি মুসলমান কি বাঙালি হিন্দু সকল মানুষ তাহাতে মনুষ্য-সাধনার অর্থগৌরব করিবেন। আজ যেমন আমরা করিতেছি। ভবিষ্যৎও করিবে। একদিন নহে। তবে অনেকদিন।


রচনার মাথায় আমরা ছফা প্রণীত ‘কৈফিয়ত’ কবিতাখানি স্থাপন করিয়াছি। ইহাতে কবিতা করিবার কৈফিয়ত যত না ফুটিয়াছে, তাহার চাইতে বেশি ফুটিয়াছে কবির সামাজিক চালচরিত্র। খোসা ছাড়ানো পেঁয়াজ যেইভাবে চোখকে বিদ্ধ করে, তদ্রূপ কবির প্রতি বুর্জোয়া সমাজের করুণা-নিষিক্ত কাহিনীর বয়ান। বলা যায়, খানিক নেত্রসিক্তও বটে। ছফার কবিতায় পাত্র হিসাবে কবি ‘ঊনমানুষ’ বলিয়া সাব্যস্ত হইয়াছে। তাহা হইলে কবি কে?

কেহ কেহ কহেন কবি মানে ভাবের গুরু। কেহ কেহ বলেন সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি। নানাজনের এহেন কথায় হয়তো কবিগৌরব জন্মিবার পারে। না, পারাই স্বভাব। কিন্তু অ-ভাব আছে অন্যখানে। সেথায় নহে, এথায়। তো নবডোরে বাঁধিব: মানুষ মাত্র কবি, কবি মাত্রই মানুষ নহে। কেননা মানুষ ভাবের কাছে ‘কবি’ ভাবখানা ‘ঊন’ উপসর্গজাত। জগৎ সংসারে আদম সন্তান ‘মানুষ’ হইবার বাসনায় ঊনত্ব ভরাট করিতে সৃজনে মন দেয়। শুদ্ধ মন দিলেই তাহা পূর্ণ হইবে না, সৃজনসিদ্ধ করিয়া তবে অপরের মন লইতেও হইবে। মন দিয়া মন লওয়াকে আমরা বলিতেছি মানুষের ধর্মে পৌঁছা। কবি সেই ভাবধর্মে পৌঁছিলেই জগতে  সে ‘মানুষ’ সাব্যস্ত হয়। ফলে মানুষ মাত্রই কবি। কবি মাত্রই ঊন।

সমাজে অনেকে ‘কবি’ হয়েন বটে, তাঁহারা মানুষ হইয়া উঠিতে পারেন না। কবির ঊনত্ব সাধনাই তাঁহাদের আখেরি সাধনা। তাই আমরা আহমদ ছফার নামের আগায় ‘কবি’ উপাধিখানি সাঁটিলাম না। তুলিলাম মা জননীর রক্তরঙের বসনখানির কথা:

তসবিহ্ মালার মতন গোটা গোটা
মাগো তোমার চোখের জলের ফোঁটা
দরদরিয়ে শঙ্খ নদের বেগে
রেখায় রেখায় মেঘলা আনন ভাসায়
সোঁদর বনের বাঘিনী মা
তুমি কেন গর্জে ওঠ না!
মরার হাড়ে চমক লাগে
জোয়ার খেলে জলে
ঘনিয়ে আসে রাঙা নাটক
সময় ওঠে দুলে
মা জননী রক্তরঙের
বসনখানি কেন পরো না?
        (ছফা ২০০৮[খ])


[সপ্তম আহমদ ছফা স্মৃতি বক্তৃতা হিসাবে পঠিত,
১৬ শ্রাবণ ১৪১৬]


সহায়

১.    সলিমুল্লাহ খান, ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা ॥ আহমদ ছফা’, উত্তরাধিকার (বাংলা একাডেমীর সাহিত্য পত্রিকা), এপ্রিলÑমে ১৯৭৭।
২.    গ. স. গ্রাৎসিয়নস্কি গয়রহ, রাজনৈতিক মতবাদের ইতিহাস, দ্বিতীয় খ-: আধুনিক কাল, ননী ভৌমিক অনূদিত (মস্কো: প্রগতি প্রকাশন, ১৯৮৭)।
৩.    আহমদ ছফা, ‘কৈফিয়ত’, দুঃখের দিনের দোহা, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, আহমদ ছফা রচনাবলি, ৬ষ্ঠ খ- (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮[ক]), পৃ. ৫১৭Ñ১৯।
৪.    ÑÑ, ‘জন্মভূমি’, জল্লাদ সময়, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, আহমদ ছফা রচনাবলি, ৭ম খ- (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮[খ]), পৃ. ৫০৩Ñ০৪।
৫.    --, ‘জল্লাদ সময়’, জল্লাদ সময়, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, আহমদ ছফা রচনাবলি, ৭ম খ- (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮[গ]) পৃ. ৫০৯Ñ১০।
৬.   --, ‘অবয়ের সংজ্ঞা’, আমার কথা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: উত্তরণ, ২০০২), পৃ. ১১Ñ১২।
৭.    --, একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা (ঢাকা: সমাবেশ, ২০০০); বর্তমান সঙ্কলনে সংবর্ধনা আকারে পুনর্মুদ্রিত।
৮.   --, আহমদ ছফা বললেন... (সাক্ষাৎকার সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসু), ব্রাত্য রাইসু সম্পাদিত (ঢাকা: র‌্যামন, ১৯৯৬)।
৯.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য’, সাহিত্য (কলিকাতা: বিশ্বভারতী, ১৪১১)।
১০.    --, ‘পাকিস্তান কেন’ (আদি নাম ‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়’), সরদার ফজলুল করিম সম্পাদিত, পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৬৮)।*
১১.    ফরহাদ মজহার, ‘নিজের মানুষের জন্য কবিতা’, প্রস্তাব (ঢাকা: বুক সোসাইটি, ১৯৭৭); বর্তমান সঙ্কলনে পুনর্মুদ্রিত।
১২.    দিব্যজ্যোতি মজুমদার সম্পাদিত, পশ্চিমবঙ্গ (পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশিত পত্রিকা), বঙ্কিম সংখ্যা, বর্ষ ২৯ সংখ্যা ১৪Ñ১৯, ১৯৯৫।
১৩.    আহমাদ মাযহার, ‘আহমদ ছফার মহাকাব্যিক অভিযাত্রা’, কিছুধ্বনি (আনওয়ার আহমদ সম্পাদিত), বর্ষ ৩৬ সংখ্যা ২, আগস্ট ২০০১; বর্তমান সঙ্কলনে পুনর্মুদ্রিত।
১৪.    হায়দার আকবর খান রনো, ফরাসি বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লব (ঢাকা: তরফদার প্রকাশনী, ২০০৭)।
১৫.    লাও-ৎস, তাও তে চিং: লাও-ৎস কথিত জীবনবাদ, অমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর অনূদিত (কলিকাতা: সাহিত্য আকাদেমি, ২০০৭)।

১৬.  Roland Barthes, Mythologies, trans. Annette Lavers  (London: Vintage, 2000).

১৭.  Amilcar Cabral, Revolution in Guinea: An African People’s Struggle (London, 1969).

১৮.  G. W. F. Hegel, Phenomenology of Spirit, trans. A. V. Miller, reprint (New Delhi: Oxford University Press, 1977).

* সরদার ফজলুল করিম সম্পাদিত বহিতে ‘পাকিস্তান কেন’ শিরোনামে লেখাখানি ছাপা হয়। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনার নাম ‘হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়’।

        ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Alexa
cache_14 2010-08-03 21:38:43